৫.নারীরা হচ্ছে অত্যাচারিত মানুষদের মধ্যে একমাত্র দল, যারা খুব ঘনিষ্ঠভাবে নিজেদের অত্যাচারকারীর সঙ্গে বাস করে। নারীবাদীরা যুগে যুগে অনেক কথা বলেছেন, ইতিহাসে যার খুব কমই উল্লেখ আছে। পুব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ সব অঞ্চলের পুরুষেরা চরিত্রগতভাবে এক এবং অভিন্ন। নারীবাদীরা যে অঞ্চল থেকে যে কথাই বলুন, সব অঞ্চলের নারীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে তা মেলে।
পুরুষেরা তাদের দুর্বলতার জন্য ক্ষমা চায়, নারীরা চায় তাদের সবলতার জন্য। পশ্চিমের নারীরা বলেছেন এ কথা। পুবের নারীরা কি জানে না তা!
পুরুষের জন্য সবল হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়। নারীর জন্য ঠিক উল্টোটি। নারীকে দুর্বল হওয়া মানায়, নারী সবল হলে এটা তার গুণ নয়, দোষ। এই হল সমাজ, যেখানে আমরা বাস করি। নারীকে বলা হয় পিসফুল আর প্যাসিভ। এটা নাকি নারীর জন্মগত। না, ওসব নারীর জন্মগত নয়। নারী সম্পূর্ণ মানুষ, এটিই কেবল নারীই জন্মগত, অন্য কিছু নয়। নিজে আমি মানসিকভাবে খুব সবল, অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর, এবং নৈতিকভাবে স্বাধীন মানুষ। এটি, এই ঘটনাটি, পুরুষের কিছুতেই পছন্দ নয়। পুরুষ চায় নারীকে দুর্বলরূপে দেখতে। পুরুষ নারীকে হাতের মুঠোয় চেপে, পায়ের তলায় পিষে যে আনন্দ পায়, সে আনন্দ অন্য কিছুতে পায় না।
ব্যক্তিগত জীবনে পুরুষের আধিপত্য আমি বরদাস্ত করতে রাজি নই বলে একা থাকি। নারী যদি নিজেকে কষ্ট দিতে না চায়, তবে সে নারীবাদী। আর নারীবাদী হলে নিজের জন্য ঘর খুব জরুরি। সেই কতকাল আগে ১৯২৮ সালে ভার্জিনিয়া উলফ লিখেছিলেন খুব জরুরি একটি বই, ‘এ রুম অব ওয়ানস য়োন’, নিজের জন্য একটি ঘর। নিজের জন্য ঘরের প্রয়োজন সব নারীর। পশ্চিমের নারীরা নিজের জন্য ঘরের ব্যবস্থা করে নিয়েছে। সমাজ এখন তাদের আর জুজুর ভয় দেখায় না। কিন্তু সমাজের রক্তচোখ এই ভারতবর্ষের মেয়েদের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যে মেয়েরা সিঁটিয়ে আছে ভয়ে, এত ভয়ে যে নির্যাতনকারী পেষণকারী অসভ্য নির্লজ্জ নিষ্ঠুর পুরুষদের বিপক্ষে মুখ খুলতে পারে না। এদের সরিয়ে তো দিতেই পারে না নিজের চৌহদ্দি থেকে, বরং আদরে আহ্লাদে মাথায় তুলে রাখে, জীবনভর পোষে।
যেদিন থেকে আমি একা বাস করছি, সেদিন থেকে আমার জীবনের মূল্য আমি টের পেয়েছি। পুরুষের সঙ্গে বাস করলে টের পেতাম না। পুরুষের জীবনই প্রধান হয়ে উঠতো। এ সমাজে নারীর জীবন পুরুষের জীবনের তুলনায় মূল্যহীন, অর্থহীন। অত্যাচারীর সঙ্গে বাস করলে নারী তার জীবনের মূল্য অনুধাবন করার সুযোগ সময় কোনওটাই পাবে না। নারীকে তো দিনভর ব্যস্ত থাকতে হয় পুরুষ-সেবায়, পুরুষ-দেহতৃপ্তিতে, পুরুষ-মনোরঞ্জনে।
আমি কেন একা থাকি? এর উত্তরে আমি বলবো, কারণ আমি ম্যাসোকিস্ট নই। আমি ভুগতে চাই না। পুরুষ পায়ের তলায় আমাকে সুযোগ পেলেই পিষুক, চাই না। বাইরে পিষছে, পিষতে চাইছে। যেন ঘরে তা না হয়। কোনও সম্পর্কের ছুতোয় যেন তা না হয়। একত্রবাসের মতো তথাকথিত রোমান্টিক জীবনের ছুতোয় যেন না হয়।
লিজ উইনস্টেড, উত্তর আমেরিকার এক মেয়ে বলেছিল, ‘I think, therefore I’m single.’ এর পর কি আরও বুঝিয়ে বলার দরকার, কেন মেয়েদের একা থাকা প্রয়োজন?ঘটে বোধবুদ্ধি কিছু থাকলে নারী কি পুরুষের সঙ্গে বাস করে? ন্যাড়া কি বেলতলা যায়।
সেইসব ঈদ
বাংলাদেশে ঈদ হচ্ছে। দেশটা খুব দূরের দেশ এখন। চাইলেও যেতে পারবো না দেশটায়। হাত বাড়ালেও দেশটাকে ছুঁতে পারবো না। দেশটা থেকেও নেই। কুড়ি বছর হলো দেশে নেই আমি। কুড়ি বছর হলো, ঈদের কোনও উৎসব দেখিনি। অনেক সময় ঈদ চলে গেলে শুনেছি ঈদ এসেছিল।নির্বাসিত জীবনের ঝুটঝামেলা মেটাতেই বছর গড়িয়েছে। দেশের আনন্দ-উৎসবের খবরের চেয়ে বেশি পাই দেশের দুঃখ-দুর্দশার খবর।
বেশ ক’দিন যাবৎ বাঙালি বন্ধুদের ফেসবুকে গরুর ছবি দেখছি। গরুগুলো দেখতে ডেনমার্ক বা অস্ট্রেলিয়ার গরুর মতো। দেশে থাকাকালীন এত মাংসল গরু দেখিনি। শুনেছি এদের নাকি হরমোন খাইয়ে বড় করা হচ্ছে, দেখতে যেন নাদুস নুদুস হয়। অতিরিক্ত হরমোন শরীরে যায় বলে মেয়েরা বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছে যাচ্ছে দ্রুত। শৈশব বলে কিছু আর থাকছে না মেয়েদের। এ এক সমস্যা বটে। আমার ছোটবেলায় গরুরা অনেক শীর্ণ ছিল। গরু কিনে বাড়ির উঠোনে বেঁধে রাখা হতো। খড় আর লবণ পানি খেতে দিতেন বাবা। গরু যখন লেজ নেড়ে নেড়ে খেতো, দেখতে খুব ভালো লাগতো আমার।
শীতের সময় মা গরুর পিঠে কম্বল দিয়ে দিতেন। গরুর যত্ন যদিও বাবা মা দু’জনই করতেন, তারপরও কখনও আমার মনে হতো না সেই যত্ন যথেষ্ট। সারারাত আমার ঘুম আসতো না, আমরা দিব্যি মশারির নিচে, আর ওদিকে বেচারা গরু কিনা পড়ে আছে উঠোনে, ওকে যে মশা কামড়াচ্ছে, তার কী হবে! গরুকে একবার একটা মশারি দেবার প্রস্তাব করেছিলাম, মা মশারি দেননি, কিন্তু উঠোনে ধুপ জ্বালিয়ে মশা দূর করার ব্যবস্থা করেছিলেন। ভোরবেলা ছুটে যেতাম গরুকে দেখতে। দেখতাম বড় বড় কাজলকালো চোখদুটোয় জল।গরুর গলায়,পেটে, পিঠে আদর করে দিতাম। যেন নতুন অতিথি এসেছে বাড়িতে। এখন থেকে অতিথিকে আর কোনও কষ্ট সইতে হবে না, মশার কামড় থেকে বাঁচতে নতুন মশারিও মিলবে, এমন প্রতিশ্রুতি দিতাম।
