পারভেজকে আমি জানাই, একজন কার্টুন এঁকেছিলো বলে মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা বিশ্ব জুড়ে তাণ্ডব করেছে। এখন কার্টুন অাঁকার একটি দিবসই বানানো হয়েছে, ওই দিবসে লক্ষ লক্ষ লোক কার্টুন অাঁকে নেটে। করলে এভাবেই প্রতিবাদ করতে হয়। এখন কার্টুন অনেকটা ওদের কাছেও গা-সওয়া হয়ে গেছে। বাকস্বাধীনতা মেনে নিতে ঠিক এটাই করতে হয়। একসময় ক্রিশ্চান ধর্মের সমালোচনা করলে মেরে ফেলা হতো। এখন ওই ধর্মের সমালোচনা করা ইটকাঠপাথরের সমালোচনা করার মতো। সমালোচনা করতে করতেই সমালোচনাটাকে সহনীয় করে তোলা যায়। আমার বইয়ে ইসলাম সম্পর্কে সামান্য প্রশ্ন পেয়েছিল বলে নব্বই দশকের শুরুতে বাংলাদেশ জুড়ে সন্ত্রাস করেছিল মৌলবাদীরা। ওরা সবসময় ছুতো খোঁজে নিজেদের অপশক্তির বাহার দেখাবার। সরকার ওদের বিরুদ্ধে সেদিন কোনও টুঁ শব্দ না করে বরং আমাকে শাস্তি দিয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল, আমাকে দেশ থেকে তাড়িয়েছিল। আমাকে শাস্তি দিয়ে সন্ত্রাসীদের সম্মানিত করেছিল সরকার। অপশক্তির তেজ শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। তখন যদি মানুষ প্রতিবাদ করতো, তখন যদি আমার পাশে কয়েকশ’ মানুষও দাঁড়াতো, তাহলে কিন্তু আমাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার এবং, দেশটাকে মৌলবাদীদের হাতে তুলে দেওয়ার সাহস সরকারের হতো না। এভাবেই তলিয়ে যায় দেশ। প্রগতিশীলদের স্বার্থপরতা, ভয়, আপোস, এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ না করাই তলিয়ে যাওয়ার কারণ। আজ মৌলবাদীরা আগের চেয়ে সংখ্যায় অনেক বেশি, দেশের সর্বনাশ আগের চেয়ে বেশি করছে, আগের চেয়ে শতগুণ বেশি তাদের ক্ষমতা। এটি হতো না, যদি প্রগতিশীলরা আমার মতোই মুখ খুলতো, প্রতিবাদ করতো। এটি হতো না, যদি আরিফের মতো আর সবাই কার্টুন অাঁকতো দেশে। আরিফ একা এঁকেছিল বলে ওকে জেল খাটতে হয়েছিল, আমি একা বলেছিলাম বলে আমার মাথার দাম ঘোষণা হয়েছে, নির্বাসিত জীবনযাপন করতে হচ্ছে দীর্ঘ কুড়ি বছর। অন্যরাও যদি মুখ বুজে না থাকতো, তাহলে মৌলবাদীরা পিছু হটতো। জানতো তারা একের সঙ্গে পারলেও অনেকের সঙ্গে পারবে না। অনেককে জেলে ভরা যায় না, অনেককে কোপানো যায় না, অনেককে নির্বাসন দেওয়া যায় না। যখন অনেকের মুখ খোলার কথা, তখন পারভেজ হুডভয় অনেককে বলছেন মুখ বন্ধ করতে। তিনি বাকস্বাধীনতা মানে কী, এখনও জানেন না। এবারের কনফারেন্সে আমি যার সাহসী বাক্য শুনবো বলে বসেছিলাম, সেই পারভেজ হুডভয় আমাকে খুব হতাশ করেছেন।
সূত্রঃ দৈনিক বাংলাদেশ-প্রতিদিন, ৬ অক্টোবর, ২০১৪
লতিফ সিদ্দিকী এবং মানুষের ধর্মানুভূতি
এ কেমন ব্যাপার, আমাদের ভদ্র হতে হবে, সুবোধ হতে হবে, পরিমিতিবোধ থাকতে হবে, যা কিছুই করি যুক্তি থাকতে হবে এবং তাদের, ধর্মে যাদের বিশ্বাস আছে,বোধ শোধ কিছু না থাকলেও চলবে, তাদের কাজে যুক্তির ‘য’-ও না থাকলে চলবে, তাদের উগ্র হলে ক্ষতি নেই, যে কারও মাথার দাম ঘোষণা করার অধিকার তাদের আছে, বর্বর এবং খুনী হওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু আমাদের সেই অধিকার নেই, আমাদের বলতে আমি ধর্মমুক্তদের কথা বলছি। ঈশ্বরে বিশ্বাস করা লোকেরা ঈশ্বরে বিশ্বাস না করা লোকদের চেয়ে সব সমাজেই বেশি সুযোগ সুবিধে পায়।
এতদিনে সবাই নিশ্চয়ই জেনে গেছেন বাংলাদেশের তথ্য এবং টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী ঠিক কী বলেছিলেন নিউইয়র্কে। তিনি যা বলেছিলেন, তা বলার কারণে তাঁর মন্ত্রীত্ব চলে গেছে। শুধু তাই নয়, তার বিরুদ্ধে মৌলবাদীদের মিছিল বেরিয়েছে রাস্তায়। তাঁর ফাঁসির দাবি করা হচ্ছে। তাঁর মাথার দাম পাঁচ লক্ষ টাকা ঘোষণা করা হয়েছে। নানা মহল থেকে তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাঁকে নাকি আর ঢুকতে দেওয়া হবে না দেশে। মিডিয়াও নানা কায়দায় তাকে অপদস্থ করছে। কিন্তু কী অপরাধ তিনি করেছেন? এটা ঠিক যে নবীর নাম বলার পর লতিফ সিদ্দিকী ‘নবীর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক’বাক্যটি উচ্চারণ করেননি। শান্তি বর্ষণের আশীর্বাদ না করলেও নবীর ওপর শান্তি বর্ষণ না হওয়ার কোনও কারণ নেই। আল্লাহতায়ালা তাঁর ওপর নিশ্চয়ই শান্তি বর্ষণ করবেন। তিনি স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার পরম বন্ধু এবং প্রেরিত পুরুষ। মুশকিল হল, অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান কোরান এবং হাদিস সম্পর্কে খুব কম জানেন এবং ইসলামের ইতিহাসও তাদের পড়া নেই।
বাংলাদেশের নব্বই বা তারও বেশিরভাগ মানুষ মুসলিম। অধিকাংশই বাবা মা যেহেতু মুসলিম সেকারণেই মুসলিম,কিছু মুসলিম ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে মুসলিম, স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন অথবা বাধ্য হয়ে গ্রহণ করেছেন। এই মুসলিমদের মধ্যে অনেকেই দাবি করছেন লতিফ সিদ্দিকী ‘মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিতে’ আঘাত দিয়েছেন। মুসলিমদের বলতে সব মুসলিম অথবা মুসলিমের সমষ্টি, অথবা মুসলিম গোষ্ঠী বোঝানো হচ্ছে। অনুভূতি কিন্তু ব্যক্তির থাকে, সমষ্টির কোনও অনুভূতি থাকে না, গোষ্ঠীর অনুভূতি বলেও কিছু নেই। বলা যেতে পারে, লতিফ সিদ্দিকীর কথায় কিছু ব্যক্তির অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে।
একজন ব্যক্তির যে কেবল ধর্মীয় অনুভূতিই থাকে তা নয়, নানা রকম অনুভূতিই থাকে। অন্য কোনও অনুভূতিতে আঘাত লাগলে তারা এত মারমুখী হন না, যত হন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগলে। প্রশ্ন করা যেতেই পারে, ধর্মীয় অনুভূতিই কি তবে অন্যান্য সব অনুভূতির মধ্যে সবচেয়ে ভঙ্গুর এবং বিপজ্জনক অনুভূতি, যেটি সহজেই ভাঙে, এবং যেটি ভাঙলে যে কেউ সভ্যতার স্তম্ভগুলোকে- গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাক স্বাধীনতাকে ভেঙে ফেলার অধিকার রাখে? মানুষের সুরক্ষার ব্যবস্থা না থাকলেও ইসলামকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা আছে প্রতিটি দেশেই। আজ ইসলাম নিয়ে কোনও প্রশ্ন করলেই মৃত্যুদণ্ড, ফাঁসি, জবাই হয়ে যাওয়া, যাবজ্জীবন, দেশান্তর, হেনস্থা ইত্যাদি অবধারিত।
