যদি আগুন থাকতে থাকতে স্পর্শ না করো,
যদি না তাপাও শরীর,
না পোড়াও,
না ভাঙো,
উন্মাদ না করো
তবে আর এসো না,
দূর থেকে হয় না সব।
কাছে এসে হাতে হাত রেখে,
চোখে চোখ রেখে,
আগুনে আগুন রেখে বলতে হয় ভালোবাসি।
কিছু প্রশ্ন। কিছু উত্তর।
কলকাতার একটা সাহিত্য পত্রিকা থেকে আজ দীর্ঘদিন যাবৎ একটা সাক্ষাৎকার চাওয়া হচ্ছে। দেব দেব করে আজও দেওয়া হয়নি। আজ দুয়ার খুলেই প্রশ্নোত্তর দিচ্ছি।
১. প্রায় দু বছর আগে একটি সাহিত্য পত্রিকার জন্য আপনার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তখন আপনার কণ্ঠে অভিমান আর ক্ষোভ অতিমাত্রায় লক্ষ্য করেছিলাম। এখন কি অবস্থা কিছুটা পাল্টেছে?
উত্তর : কী নিয়ে অভিমান করেছিলাম বা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলাম, তা তো বলবেন মশাই! আমার অভিমান, ক্ষোভ, রাগ ইত্যাদির পেছনে বড় কোনও কারণ থাকে। এমনিতে আমি খুব হাসিখুশি মানুষ, ছোটখাটো ভুলত্রুটিগুলোর জন্য মানুষকে নিরন্তর ক্ষমা করে দিই। তার মানে এই নয় যে, কারও কোনও ভয়ংকর বদমাইশি দেখবো, আর না দেখার ভান করে অন্য দিকে চলে যাবো! অন্যায় যদি দেখি, রাগ করবো না? যেদিন কিছুতেই কিছু আসবে যাবে না আমার, ক্ষোভ টোভ মরে ভূত হয়ে যাবে, রাগ করার মতো কিছু ঘটলেও রাগ করবো না, সেদিন বুঝবেন আমার মৃত্যু হয়েছে। এই যে ‘অতিমাত্রা’ শব্দটা ব্যবহার করলেন, সেটা আবার অদ্ভুত! ক্ষোভের মাত্রা কী করে মেপেছিলেন আপনি? ক্ষোভ ঠিক কতটা হলে মাত্রার মধ্যে থাকে, কতটা হলে থাকে না, সেটা বোঝাবে কে? এই মাত্রাটা মাপার দায়িত্বটা কার, বলুন তো! গজফিতেটা ঠিক কার কাছে থাকে? যে ক্ষোভ দেখায় নাকি যে ক্ষোভ দেখে? নাকি তৃতীয় কোনও ব্যক্তি? সমাজের সবাই আপনারা মাত্রা মাপার মাতব্বর হয়ে গেলে চলবে কী করে বলুন। মানুষকে একটু নিজের মতো নিজের মত প্রকাশ করতে দিন। আপনার মাথায় ডাণ্ডা যতক্ষণ না মারছি, অর্থাৎ ভায়োলেন্স যতক্ষণ না করছি, ততক্ষণ আমাকে সইতে শিখুন।
২. সেই সাক্ষাৎকারে আপনি একটি প্রসঙ্গ তুলেছিলেন যা তার আগে কেউ জানতো না। আরও বেশি মানুষের জানা উচিত বলেই আমি সেই প্রসঙ্গটি আর একবার এখানে উত্থাপন করতে চাই। আপনি জানিয়েছিলেন যে আপনি যে শুধু মুসলিম মৌলবাদ বিরোধী তা নয়, আপনি সমস্ত ধরনের মৌলবাদের বিরোধী। যে কারণে গুজরাত দাঙ্গার পর পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু মৌলবাদ বিরোধী যে সংগঠন তৈরি হয় তাতে আপনি এককালীন বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলেন। আপনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন এই বলে যে শঙ্খ ঘোষ সব কিছু জানা সত্ত্বেও কেন এই কথা প্রকাশ্যে জানাননি। শঙ্ঘ ঘোষ পরে একটি চিঠিতে আপনার কথা স্বীকার করে জানিয়েছিলেন যে আপনি নিজেই ওই কথা প্রকাশ্যে জানাতে নিষেধ করেছিলেন। এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?
উত্তর : আমি সব ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদ বিরোধী সেটা আমার বই পড়লেই জানা যায়। এমন নয় যে আপনাকে দেওয়া গত সাক্ষাৎকারে ওই কথাটা আমি প্রথম জানিয়েছি।
এই ক্ষোভের কথাই তাহলে বলছিলেন! শুনুন, শঙ্খ ঘোষকে আমি বলেছিলাম যে, আমি যে টাকা দিলাম গুজরাতের উদ্বাস্তু মুসলমানদের জন্য, তা নিজের প্রচারের জন্য নয়, কিছু দান করে বড়াই করা আমি পছন্দ করি না। মানুষকে বরাবরই আমি নিভৃতেই সাহায্য করি, ঢোল পিটিয়ে করি না। শঙ্খ ঘোষকে বিনীতভাবে শুধু জানিয়েছিলাম, আমি ঢোলে বিশ্বাসী নই, আর ঢোলের শব্দও আমাকে একটু অপ্রতিভ করে। কিন্তু আমাকে যখন ‘মুসলিম বিরোধী’ অপবাদ দিয়ে হায়দারাবাদে শারীরিক আক্রমণ করা হলো, একটা বীভৎস মৃত্যু আমার প্রায় ছুঁই ছুঁই দূরত্বে ছিল, সেদিনই কলকাতায় ফিরে এলে আমাকে যখন ঘরবন্দি করলো সরকার, পার্ক সার্কাসের রাস্তায় কিছু পকেটমার নেমেছিল বলে মুসলিম বিরোধী অজুহাত তুলে যখন আমাকে রাজ্যছাড়া করলো, আর দিলি্লতেও আমাকে যখন নিরাপদ বাড়ির নাম করে একই রকম গৃহবন্দি করা হয়েছিল, প্রতিদিন চাপ দেওয়া হচ্ছিল দেশ ছাড়ার জন্য, মুসলমানরা রৈ রৈ করে ধেয়ে এসে আমাকে প্রায় ছিঁড়ে খেয়ে ফেলে এমন যখন রাজনৈতিক অবস্থা, সামনে মৃত্যু আর নির্বাসন, যে কোনওটিকে যখন আমার বেছে নিতে হবে, তখন শঙ্খ ঘোষ চুপচাপ বসে সবই দেখছিলেন, সবই জানছিলেন, শুধু একবার মুখ ফুটে কোথাও একবারের জন্য বলেননি যে, মুসলিমবিরোধী বলে যা প্রচার হচ্ছে আমার বিরুদ্ধে, তা সত্য নয়। শঙ্খ ঘোষ চুপ করে থাকাই শ্রেয় মনে করেছিলেন। দান করে নাম কেনার প্রচার, আর নির্বাসন বা মৃত্যু থেকে আমাকে বাঁচানোর প্রয়োজনে একটা সত্য প্রচার- এই দুই প্রচারের মধ্যের তফাতটা শঙ্খ ঘোষ জানেন না আমি বিশ্বাস করি না।
শঙ্খ ঘোষ সত্যকে সেদিন প্রকাশ করলে জানি না কতটা লাভ হতো। হয়তো খড়কুটোর মতোই মূল্যহীন হতো তাঁর বিবৃতি। তবে যেহেতু ওই দুঃসময়ে আমি হতাশার অতলে ডুবছিলাম, প্রাণপণে কিছু খড়কুটোই খুঁজছিলাম অাঁকড়ে বাঁচার জন্য।
যা হয়ে গেছে হয়ে গেছে। ছাড়ুন ওসব পুরোনো কথা। আমাকে পশ্চিমবঙ্গে থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। পুরো ভারতবর্ষ থেকেও বের করে দেওয়া হয়েছিলো। কয়েক বছর পর আবার অনুমতি পেয়েছি বটে দিলি্লতে থাকার, তবে পায়ের তলার মাটি এখনও বড় নড়বড়ে।
৩. আপনার বিড়াল মিনুকে নিয়ে চূর্ণী গাঙ্গুলী ছবি বানাচ্ছেন। যা আসলে আপনার জীবনের একটা অংশ। আপনার জীবন নিয়ে সরাসরি ছবি করলে অসুবিধে হতে পারে মনে করেই কি তা না করে মিনুকে নিয়ে ছবি করার কথা ভেবেছেন চূর্ণী?
