মানি আর না মানি, আমরা আমাদের শৈশব-কৈশোরকে সারা জীবন সঙ্গে নিয়ে বেড়াই। বড় হই, কিন্তু বড় হই না। নানির বাড়িতে পিঁড়ি পেতে বসে বা মেঝেয় মাদুর বিছিয়ে যে খাবারগুলো খেতাম, সেগুলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাবার এখনও। মাটির চুলোয় ফুঁকনি ফুঁকে শুকনো ডাল পাতা জ্বালিয়ে মা যা রান্না করতো, সেই রান্নাই এখন অবধি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রান্না। আজকালকার অত্যাধুনিক ইলেকট্রিক স্টোভে, ওভেনে, গ্যাসে রান্না করা খাবার খেয়েছি, কিছুই মা’র ওই মাটির চুলোর রান্নাকে ডিঙোতে পারেনি। এ কি মা’কে ভালোবাসি বলে বলি? না, মা’কে কোথায় আর ভালোবাসলাম! মা তো ভালোবাসা না পেতে না পেতেই একদিন চিরকালের জন্য চলে গেল। বড় অভিমান ছিল মা’র। একটা কী ভীষণ দুঃখের জীবনই না কাটিয়েছে মা। আমার বোনটাও। অনেকটা মায়ের মতোই জীবন ওর। বোনটা দেখতে মায়ের মতো নয়, আমি দেখতে অবিকল মা। কিন্তু আমার জীবনটা মায়ের জীবনের চেয়ে অন্যরকম। সংসারে দুঃখ কষ্ট সওয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছি আমি, কিন্তু মা যেমন নিজেকে বাঁচাতে পারেনি, বোনটাও পারেনি।
মা’র নানারকম গুণ ছিল, কিন্তু মা’র গুণগুলোকে কখনো গুণ বলে মনে হতো না। মা বলেই সম্ভবত। মা’দের আমরা মা বলে মনে করি, ঠিক মানুষ বলে মনে করি না। মা’দের গুণগুলো দেখি, কিন্তু না দেখার মতো করে দেখি। রান্না ছাড়াও নানির অসাধারণ সব গুণ আছে। কিন্তু ক’জন নানিকে সেসব বলেছে, নানির ছেলেমেয়েরা কেউ কি তার প্রশংসা করেছে কখনও! আমার মনে হয় না। মা যে বেঁচে থাকতে তার অজস্র গুণের জন্য একটিও প্রশংসা বাক্য শোনেনি সে আমি জানি। মা না হয় আজ আর নেই। নানি তো আছে। যে নানির রান্না করা বোয়াল মাছের ঝোলের মতো ঝোল না হলে বড়দা বোয়াল মাছ খায় না, সেই নানিকে ক’দিন বড়দা দেখতে গেছে? এক শহরেই তো থাকে! ক’দিন নানির শিয়রে বসে পুরোনো দিনের গল্প করেছে? সম্ভবত একদিনও নয়। যদি গিয়ে থাকে কখনও, নিজের কোনও স্বার্থে গিয়েছে। নানি হয়তো আর বেশিদিন নেই। দেশ থেকে ফোন এলে বুক কাঁপে এই বুঝি শুনবো নানি আর নেই। আমাদের ছোটবেলাটা নানির বাড়িতে কেটেছে। বড়দাকে যখন জন্ম দিয়েছিল মা, মা তখন অল্প বয়সী কিশোরী বা এক রকম শিশুই। মা’র পক্ষে একা ছেলে বড় করা সম্ভব ছিল না। নানি সাহায্য করতো। এখন বড়দার সময় নেই নানির কাছে যাওয়ার। আমি যদি দেশে থাকতাম, আমি নিশ্চয়ই নানিকে খুব ঘন ঘন দেখতে যেতাম। মানুষের থাকা আর না থাকার মধ্যে পার্থক্যটা আমি খুব ভালো করে জানি এখন। মা ছিল, মা নেই। বাবা ছিল, বাবাও নেই। পর পর বেশ কিছু খালা মামা, যাদের কাছে ছোটবেলায় মানুষ হয়েছি, চলে গেছে। নানি এখনও আছে। হীরের মতো বেঁচে আছে। যতদিন নানি আছে, তার থাকার উৎসবটা তো হওয়া চাই! সারা জীবন কেবল দিয়েছে নানি, নানিকে দেবার কেউ নেই। মেয়েদের জীবনটা যেন কেবল দিতে দিতে নিঃস্ব হওয়ার জন্যই, নিঃস্ব হতে হতে মরে যাওয়ার জন্যই। যেন কিছু পাওয়ার জন্য নয়। নানির মস্তিস্ক এখনো সতেজ, এখনও স্মৃতিশক্তি ভালো। কিন্তু হলে কী হবে, বাড়ি ভর্তি মানুষ, শুধু নানির ঘরটায় কারও আনাগোনা নেই। সবাই অপেক্ষা করছে নানির মৃত্যুর। মানুষ উদার হতে পারে ঠিক, তার চেয়ে শতগুণ বেশি নিষ্ঠুর হতে পারে।
নির্বাসন আমাকে আমার সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। নানির ঋণ শোধ করতে দিচ্ছে না। মা বাবার ঋণও শোধ করতে দেয়নি। যাদের ভালোবাসি, তাদের সবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে আমাকে নির্বাসন, আমার সেই শৈশব-কৈশোরের জীবন থেকে লক্ষ যোজন দূরে। যেন ভুলে যাই সব। কিন্তু আমি তো ভুলতে কাউকে পারি না। ছোট যে একটা বেলি ফুলের গাছ ছিল উঠোনে, সেটাকেও তো আজও ভুলতে পারিনি।
এতদিনে ভারতে সভ্য আইন
নারীনিগ্রহ ছিল সকালে ঘুম থেকে ওঠার মতো, উঠে পেচ্ছাব করার মতো, দাঁত মাজার মতো, চা খাওয়ার মতো। নারীনিগ্রহ ছিল পাড়ার দোকান থেকে হাফ প্যাক সিগারেট কেনার মতো, প্রতিদিনকার বাসে চড়ার মতো, আপিস যাওয়ার মতো। ছিল লাঞ্চের পর একটু ঝিমিয়ে নেওয়ার মতো। ছিল রকের আড্ডার মতো, তালুতে খৈনি ডলে দু চিমটি মুখে দেওয়ার মতো। ছিল সন্ধ্যের দু পেগের মতো। টিভিতে ক্রিকেট দেখার মতো। রাতে খেয়ে দেয়ে ঢেঁকুর তুলে কুঁচকি চুলকোতে চুলকোতে বিছানায় যাওয়ার মতো। নারীনিগ্রহ ছিল এমনই নিরীহ, এমনই নগণ্য। এমনই নিত্যনৈমিত্তিক, এমনই নরমাল।
হঠাৎ করে কিসের মধ্যে কী? কী আবার, পান্তা ভাতে ঘি!
কী, গঞ্জে আইনবাবু এয়েচেন। আইনবাবু এখন চোখ রাঙিয়ে মানুষকে শাসাচ্ছেন, দুষ্টুমি করবি তো মরবি। এই দুষ্টের দেশে বলা নেই কওয়া নেই লালচক্ষুর ছড়ি ঘোরানো! আইনবাবুকে দেখে পুং-জনতা ত্রিশূল হাতে বেরিয়ে পড়েছে, লাল পতাকা ঝুলিয়ে যৌন-অনশনে নেমে গেছে। আইনবাবুকে গঞ্জ থেকে না খেদিয়ে কেউ অন্ন মুখে দেবে না। হিংসের হিশহিশ শব্দ চারদিকে। সভ্যভব্য দেখতে লোকেরা তো নাক কুঁচকে বলেই যাচ্ছে, ‘আইন করে কিসসু হবে না, যে আইনের প্রয়োগ কস্মিনকালেও হবে না, সেই আইন প্রণয়ন করে আইনকেই হাসির বস্তু বানানো হলো।’ কোনও কোনও পুরুষ আবার দাঁত খিঁচিয়ে বলছে, ‘আইন তো নয়, যেন ফতোয়া।’ কেউ বলছে, আধুনিক সমাজে যত কম বাধানিষেধ জারি করা যায়, ততই মঙ্গল। সমাজ চলবে তার অভ্যন্তরীণ সংশোধনের তাগিদে। বাইরের হুকুমে নয়।
