তবে বয়স হওয়ার আগেই আমার লেখা শুধু দাদাদের পত্রিকায় নয়, শহরের, এমনকী শহরের বাইরের লিটল ম্যাগাজিনে ছাপা হতে শুরু করলো, এমনকী জাতীয় পত্রিকায় ছাপা হলো বেশ কিছু। আর বয়স হওয়ার আগেই, যখনও বাড়ির চৌকাঠ আমার ডিঙোনো নিষেধ, কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা আর প্রকাশনা দুটোই শুরু করলাম। তখন সবে সতোরো আমি।
সেই যে লেখার শুরু। আজও চলছে সেই লেখা। মাঝখানে গেল মেডিক্যাল কলেজের কঠিন পড়াশোনা, হাসপাতালের চাকরি—লেখার গতি কমেছে, কিন্তু লেখা ছাড়িনি। কেন ছাড়িনি, ছাড়তে পারিনি বলেই ছাড়িনি। কারণ যে কথা মনে আনাগোনা করে, সে কথা অন্য আর কোনও কিছু করে প্রকাশ করতে আমি পারিনা। আমি না জানি গান গাইতে, না জানি নাচতে। আমি না পারি নাটক করতে, না পারি ভালো ছবি আঁকতে। শুধু লেখাটাই জানি। লেখাতেই বলতে পারি কী বলতে চাইছি। যা লিখে বোঝাতে পারি, তা বলে বোঝাতে পারি না। বলতে গেলে সব তালগোল পাকিয়ে যায়।
মনে কী এমন কথা আমার যা প্রকাশ করতেই হবে? না, মনে নতুন কোনও বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নেই, গ্রহ নক্ষত্র আবিস্কারের গোপন কোনও পরিকল্পনাও উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে না। খুব সাধারণ কিছু কথা মনে, না বললে আর সব মেয়ের মতো চিরকালই কথাগুলো বুকের ভেতর পুষে রাখতে হবে। সাধারণ কথা, আমি কী চাই, কী না চাই, আমার কী ভালো লাগে, কী ভালো লাগে না, এসব। পুরুষেরা বলে। বেশির ভাগ মেয়েরাই বলে না, কারণ মেয়েদের অত কথা বলতে নেই, অত চাওয়া থাকতে নেই, অত নিজস্বতা থাকতে নেই, অন্যের ভালোয় মেয়েদের ভালো।
কিন্তু যেহেতু আমি বিশ্বাস করি না মেয়ে বলে আমি কিছুটা ‘কম মানুষ’, যেহেতু বিশ্বাস করি না অধিকার বা স্বাধীনতা আমার কিছুটা কম হলেও চলে, তাই বলি, তাই লিখি, সময় সময় চেঁচাই। লিখি কেবল আমার জন্য নয়, লিখি তাদের জন্যই বেশি, যাদের জানতে দেওয়া হয় না কতটা অধিকার তাদের আছে নিজের জীবনটা নিজের পছন্দমতো যাপন করার। লিখে সেই মেয়েদের, সেই মানুষদের স্থবির জীবনে যদি সামান্যও তরঙ্গ তুলতে পারি, তবেই আমার লেখা সার্থক। সার্থক হই বলেই আর যা কিছুই ছাড়তে পারি, লেখাটা পারি না।
বোয়াল মাছের গল্প
সেদিন বোয়াল মাছ কিনলাম। বোয়াল মাছ হয় আমি খুবই কম কিনেছি জীবনে অথবা প্রথম কিনলাম। খাইনি তা নয়। ছোটবেলায় খেয়েছি। বাবা কিনতো। বোয়াল নামটা আমার পছন্দ হত না বলে খেতে তেমন ইচ্ছে করতো না। স্বাদটাও খুব কিছু আহামরি ছিল না। বড়বেলায় তাই আর শখ করে বোয়াল কিনিনি। কিন্তু সেদিন বোয়ালটা কিনলাম সম্ভবত এই কারণে যে ছোটদা কিছুদিন আগে বোয়ালের গল্প বলছিল। বলছিল, সপ্তা-দু’-সপ্তা আগে নাকি দেশের বাড়িতে বোয়াল রান্না হয়েছিল, কারণ বড়দা’র খুব বোয়ালের মাথা খাওয়ার শখ হয়েছিল। খেতে গিয়ে বড়দা চেঁচামেচি করেছে, কী, রান্না ভালো হয়নি। পরদিন আবারও বোয়াল রান্না হল, বড়দা সেদিনও রাগ করলো। বড়দা’র এক কথা, ঝোলটা শুধু ঘন নয়, একটু আঠা আঠাও হতে হবে, নানি রান্না করলে ঠিক যেমন হতো। এখন নানি কী করে রান্না করতো তা বৌদি বা বাড়িতে আর যারা রান্না করে, তাদের জানার কোনও কারণ নেই। আর ঠিক ওরকম আঠা আঠা ঝোল যতক্ষণ না হচ্ছে ততক্ষণ বড়দা ভাত মুখে দেবে না। এর নাম কী? স্মৃতিকাতরতা? পাগলামো? যে নামেই ডাকি না কেন, ভেতরে ভেতরে বুঝি, আমারও হয় এমন। বড়দা রাগ করতে পারে, আবদার করতে পারে, তার বাড়ি ভর্তি লোক। আমার তো সেরকম নয়। গোটা বাড়িতে আমি একা। কুড়ি বছর আগে, দেশ ছেড়ে, দেশের মানুষজন ছেড়ে, যখন সম্পূর্ণ একটা নতুন পরিবেশের মধ্যে এসে পড়েছিলাম, আমাকে একা বাজার করতে হতো, একা রান্না করতে হতো, অথচ রান্নাটাই কোনওদিন আমার শেখা হয়নি দেশে। সেই সময় কাঁচা হাতে রান্না করতাম, শুধু লক্ষ্য রাখতাম, মা’র রান্নার মতো হচ্ছে কী না। মা’র রান্নায় যে স্বাদ হতো, আমার রান্নায় সেই স্বাদ না আসা পর্যন্ত নিজের রান্নাকে কোনওদিন ভালো রান্না বলিনি। সেই যে শুরু হয়েছিল, এখনও তাই চলছে। ছোটবোনের বেলাতেও দেখেছি ওই একই, রান্না যদি করে, মা’র মতো রান্না তার করা চাই। আমার চেয়ে ঢের বেশি ও জানে মা’র স্বাদের কাছাকাছি স্বাদ আনতে। ওর বাড়িতে ক’দিন থাকলে ওজন আমার দু’তিন কিলো বাড়বেই। জিভে কী করে এত কাল আগের স্বাদটা লেগে থাকে জানি না। আসলে জিভের ব্যাপার তো নয়, এ মস্তিস্কের ব্যাপার। মস্তিস্কের স্মৃতিকোষগুলোয় কী করে যে সব গাঁথা হয়ে থাকে। বড়দার ওই আঠা আঠা ঝোলের বোয়াল মাছের মাথা খাওয়ার ছেলেমানুষী আবদারকে ঠিক দোষ দিতে পারি না। সেদিন বোয়াল কিনে আমিও তো ঠিক ওই আঠা আঠা ঝোলটাই বানাতে চেষ্টা করেছি।
ছোটবেলায় যে কত রকমের মাছ খেতাম। সব মাছের নাম মনেও নেই। ভালো লাগতো ইলিশ চিংড়ি কই রুই মাগুর খেতে। চিংড়িকে অবশ্য মাছ বলা যাবে না, কিন্তু চিংড়ি মাছ নয়, ভাবলে কেমন যেন দুঃখ লাগে। রুই ছিল তখন মাছের রাজা। এখন যেমন বারোয়ারী হয়ে গেছে, তেমন ছিল না। সত্যি বলতে, গত কয়েক বছর যে মাছকে আমি সচেতনভাবে এড়িয়ে চলি, সে হলো রুই। কলকাতায় থাকাকালীন রুইএর ওপর এই অনীহাটা আমার জন্ম নিয়েছে। যেদিকে যাই, যেখানে তাকাই, শুধু রুই, রুই আর রুই। খেতে খেতে রুইয়ের স্বাদ একসময় বিচ্ছিরি লাগতে শুরু করলো। মনে হতে লাগলো যেন ঘাস খাচ্ছি। কলকাতায় যদুবাজার, গড়িয়াহাট, আর মানিকতলা থেকে কত রকমের যে মাছ কিনতাম আমি। এত বিচিত্র মাছ দেশের বাজারেও হয়তো দেখিনি। অবশ্য দেশের বাজারে কদিন আর গেছি। আমাদের সময় মেয়েদের মাছের বাজারে যাওয়ার চল ছিল না। মাগুর নামটা যদিও আমার ভালো লাগে না, মুগুর মুগুর লাগে শুনতে, কিন্তু খেতে ভালো লাগতো, বিশেষ করে মা যখন ধনে পাতা আর টমেটো দিয়ে মাছের পাতলা ঝোল করতো। একবার কী একটা কবিতায় আমি মাগুর মাছের নাম উল্লেখ করেছিলাম, তাই নিয়ে কিছু কবি নাক সিঁটকেছিল। কবিতায় মাগুর কেন আসবে, ইলিশ আসতে পারে, চিতল আসতে পারে। মাগুর শব্দটা নাকি কবিতাকে নষ্ট করে দেয়। ওদের কথায় আমি কিন্তু আমার ওই কবিতা থেকে মাগুর মাছ বাদ দিইনি। ভেটকি শব্দটা বড় বিচ্ছিরি লাগতো। কলকাতায় তাই ভেটকি আমি প্রথম প্রথম একেবারেই কিনতাম না। রেস্তোরাঁয় আর বন্ধুদের বাড়িতে খেতে খেতে একসময় টনক নড়লো, বাহ, এ তো বেশ সুস্বাদু মাছ হে। এরপর থেকে ভেটকি কেনা শুরু হলো আমার। এখনও কিনি। কলকাতার লোকেরা, খুব অবাক হতাম, রূপচাঁদা মাছকে কেন পমফ্রেট বলে। ফরাসি ভাষায় আলুভাজাকে পমফ্রেট বলে। পমফ্রেট নামটা কোত্থেকে এলো হদিস করতে গিয়ে দেখলাম, এসেছে প্যামফ্লেট থেকে। পর্তুগিজ ভাষায় কোনও কোনও মাছকে প্যামো বলে। সেই প্যামোটাই সম্ভবত উৎস। পমফ্রেট সমুদ্রের মাছ। সমুদ্রের মাছ, জানি না কেন, নদী আর পুকুরের মাছের মতো সুস্বাদু হয় না। নাকি মিঠেপানির মাছ খেতে খেতে আমাদের জিভটাই মিঠে মিঠে হয়ে গেছে! রূপচাঁদা নামটা আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু সমুদ্রের মাছ বলেই হয়তো খেতে কখনই খুব ভালো লাগেনি। ঠিক মনে নেই মা কী করে রূপচাঁদা রান্না করতো। ভাজতো বোধহয়। ভাজলে অবশ্য অনেক বিস্বাদ জিনিসেও স্বাদ চলে আসে।
