শার্লি আবদোর কার্টুনিস্টদের মেরে ফেলেছে ইসলামি সন্ত্রাসীরা, এই খবর পাওয়ার পর থেকে আমি শোকস্তব্ধ বসে রয়েছি। আমার কেবল মনে হচ্ছে, ঠিক এভাবে একদিন আমাকেও মেরে ফেলবে ওরা। আমি হয়তো কোনও কবিতা বা উপন্যাস লিখতে থাকবো, আর অতর্কিতে আমার ঘরেও ঢুকে ওরা আমাকে জবাই করবে, নয়তো মাথা লক্ষ্য করে গুলি করবে, ‘আল্লাহু আকবর’ বলতে বলতে। কেবলই মনে হচ্ছে, প্যারিসের মতো শহরে নিরাপত্তারক্ষী থাকার পরও যদি খুনের ঘটনা ঘটে যায়, তাহলে দিল্লিতে না ঘটার কোনও তো কারণ নেই। যত দুশ্চিন্তাই করি না কেন, আমার লেখা কিন্তু বন্ধ হবে না। ঠিক যেভাবে শার্লি আবদোর কার্টুনের মতো কার্টুন আঁকাও বন্ধ হবে না।
পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবীদের বেশিরভাগই বেশিরভাগ সময় মুসলিমদের পক্ষ নিয়ে কথা বলেন, যতই সন্ত্রাস মুসলিমরা করুক না কেন। পাশ্চাত্যের লিবারেল ট্রাডিশান রক্ষা করাটা তাঁদের দায়িত্ব বলেই মনে করেন। মুসলিমরা সংখ্যালঘু বলে আফগানিস্তানে, ফিলিস্তিনে, ইরাকের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে মুসলিমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে, সম্ভবত একটা সহানুভূতি কাজ করে। শার্লি আবদোর বুদ্ধিজীবীরা এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। ওঁরা কিন্তু কারও সঙ্গে আপস করেননি। কোনও রাজনীতিবিদ, কোনও ধর্মগুরু, কোনও পয়গম্বর- কারও সঙ্গেই নয়। ক্রিশ্চান ধর্ম বা ইহুদিধর্ম নিয়ে যেমন কটাক্ষ করেছেন, ইসলাম ধর্ম নিয়েও করেছেন। মাঝে মাঝে কার্টুন শিল্পীরা যিশু, মুসা এবং অন্যান্য পয়গম্বর নিয়ে কৌতুক করতেন, ইসলামের পয়গম্বর নিয়েও করতেন। বেশ বুদ্ধিদীপ্ত সেসব কৌতুক।
জানি প্রচুর লোক আজ শার্লি আবদোর পক্ষে দাঁড়াবে। তারা খুনিদের দিকে নিন্দা ছুড়বে এবং বলবে খুনিদের ইসলাম সত্যিকারের ইসলাম নয়। সত্যিকার ইসলাম কোনও বিধর্মীকে বা নাস্তিককে খুনের ইন্ধন জোগায় না। ইসলাম শান্তির ধর্ম ইত্যাদি। কেউ কিন্তু বলবে না, কোরানের সুরা আল বাকারা, আল নিসা, আল আনফাল, আল তওবা এরকম অনেক সুরায় ইসলামে-অবিশ্বাসীদের কতল করার কথা বলা হয়েছে। যেখানে মুসলিমদের উপদেশ দেওয়া হয়েছে বিধর্মীদের হত্যা করার জন্য। অনেক হাদিসও বলেছে একই কথা। মুসলিম হওয়ার শর্ত কোরানে অর্থাৎ আল্লাহর বাণীতে নিঃশর্ত বিশ্বাস।
ইসলামের ইতিহাস বলে ইসলামের পয়গম্বর প্রচুর যুদ্ধ করেছেন। আরবের বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠীর লোককে তখন ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হতো। বানুকোরাইজা নামের এক ইহুদি গোষ্ঠীর আটশ পুরুষকে হত্যা করা হয়েছিল, শুধু তারা মুসলিম ছিল না বলে। এখনও পয়গম্বরের কিছু অনুসারী তার পদাঙ্ক আক্ষরিক অর্থে অনুসরণ করতে চায়। অন্যান্য ধর্মের মতো ইসলামের অর্থ যুগোপযোগীভাবে বিবর্তিত হয়নি। অনেকের মনেই ইসলাম রয়ে গেছে ১৪০০ বছর আগের ইসলামের মতোই। মুহম্মদের অনুসারীরা সত্যিকার ইসলামে বিশ্বাস করে, তারা বিশ্বাস করে পুরো পৃথিবীতে তারা সত্যিকার ইসলামি সাম্রাজ্য তৈরি করবে, যে সাম্রাজ্যে সত্যিকার মুসলিম ছাড়া আর কারোর ঠাঁই নেই। তারা বিশ্বাস করে, ইসলাম নিয়ে যে মানুষই কটাক্ষ করবে, তাদের মেরে ফেলার অধিকার তাদের আছে। আজ পৃথিবীতে সন্ত্রাস করে বেড়াচ্ছে আল কায়দা, আইসিস, বোকো হারাম, আল শাবাব ইত্যাদি সন্ত্রাসী দল। এদের সবারই আদর্শ এক এবং অভিন্ন। যেন তাদের পথই সত্যিকার ইসলামের পথ।
ইসলামি মৌলবাদী কোনও ছোটখাটো সমস্যা নয়। এই বড় সমস্যার সমাধান করতে হলে আগে মূলে যেতে হবে। মত প্রকাশের অধিকারের বাণী শুনিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। সন্ত্রাসীরা কী মন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, কী মন্ত্র তাদের শেখাচ্ছে অস্ত্র হাতে নিতে, মানুষ খুন করতে, জানতে হবে।
আমার মনে হয়, যতদিন ইসলামকে এভাবে ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া হবে, ততদিন সন্ত্রাস থাকবে।
নির্বাসিত একটি ছবির নাম
চূর্ণী গাঙ্গুলীর ‘নির্বাসিত’ আমার জীবনের কোনও এক সময়ের কোনও এক ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। চূর্ণীর প্রথম ছবি এটি। চূর্ণী মূলত অভিনেত্রী। অসাধারণ অভিনয় করেন। কৌশিক গাঙ্গুলীর ছবিতে প্রচুর করেছেন অভিনয়। এমন প্রতিভাময়ী ব্যক্তিত্ব ঠিক ঠিকই আমার ওপর একটা ছবি বানিয়ে ফেললেন, যখন অন্য অনেকে বানাচ্ছি বানাচ্ছি করেও আজ অবধি কিছুই বানাতে পারেননি। এ অবধি কম লোকতো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অনুমতিপত্রে সই নিয়ে যান নি! কিন্তু কেউ এখনও শুরুই করতে পারেননি কোনও ছবি। না আমাকে নিয়ে, না আমার গল্প নিয়ে।
‘ব্যাগ ফিল্মস’ নামের একটা কোম্পানি আমার ‘ফরাসি প্রেমিক’ উপন্যাসটির চলচ্চিত্র সত্ত্ব কিনেছে প্রায় দশ বছর আগে। দশ বছর ‘ব্যাগ ফিল্মস’ আর যোগাযোগ করেনি। ভারতের বিখ্যাত মুভি কোম্পানি ইউটিভিও আমার আত্মজীবনীভিত্তিক ছবি করতে চেয়েছে। কেউ একজন চিত্রনাট্য লেখার কাজও শুরু করেছিল। পরে ওদেরও আর কোনও খবর নেই।
বোম্বের নামী পরিচালক মহেশ ভাট দু’হাজার সালে ঘোষণা দিয়েছিলেন আমার জীবন নিয়ে ছবি বানাবেন। তিনিও তাঁর ওই ইচ্ছে থেকে কবেই একদিন আলগোছে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। এখনও আমার কাছে পড়ে আছে নিমন্ত্রণ আর ফেরার চলচ্চিত্র সত্ত্ব বিক্রির টাকা। সৌরভ দে, প্রেমাংশু রায়রা চিত্রনাট্য লিখে কাস্টিংও ঠিক করে ফেলেছিলেন। সৌরভ তো বোম্বে থেকে নিয়ে এসেছিলেন নায়ক, নায়িকাকে নিয়ে মহড়াও শুরু করেছিলেন। কাপে প্লেটে ‘নিমন্ত্রণ’ লিখে বিলিয়েওছিলেন। প্রেমাংশু তো রুনা লায়লাকে দিয়ে গানও পর্যন্ত রেকর্ড করিয়ে নিয়েছিলেন। লোকেশন দেখতে গিয়েও টাকা খরচ হয়েছে। এত টাকা খরচ করেও প্রযোজক ছবি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর কারণ ‘তসলিমা’।
