আর প্রামাণিক নিয়ে সুবেশ চৌধুরী লিখলেন
তুই আমার বাজার ছেঁচা
সাত রাজার এক মানিক,
তুই আমার লক্ষ্মীপ্যাঁচা,
তুই আমার পরামানিক।
এখানেই শেষ নয় সুবেশ চৌধুরীর বইয়ে আরও অনেক অমূল্য পদ্য রয়েছে, যেমন,
ধান গাছে ধান হয়, পান গাছে পান
বর্ষায় জল হয় খালে আসে বান,
শীতকালে লোজন বেয়াই-বেয়ান।
০৪. উপসংহার
এই গল্পের শেষে শুধু দুটি ঘটনা বলা প্রয়োজন।
প্রথম ঘটনা হল, সরকার সুবেশ চৌধুরীর বইটি অনুমোদন করেননি। কবিতায় লেখা সরকারের পছন্দ নয়, তা ছাড়া সরস করতে গিয়ে সুবেশবাবু চাষির মুখে হাসি বইটি খুব হালকা করে ফেলেছেন।
দ্বিতীয় ঘটনা খুবই বিস্ময়কর। সরকারের কাছ থেকে পাণ্ডুলিপি ফেরত নিয়ে সুবেশবাবু বইটি তার পুরনো প্রকাশককে ছাপতে দিয়েছিলেন। বই ছেপে প্রকাশক তো বটেই সুরেশবাবুও অবাক। বইটি রাতারাতি বেস্ট সেলার হয়ে গেছে। আগে তার কোনও বই সব সুদ্ধ চারশো-পাঁচশো বিক্রি হত, এখন সপ্তাহে পাঁচশো বিক্রি হচ্ছে।
লোকের হাতে হাতে চাষির মুখে হাসি বইটি ঘুরছে, তাদের মুখে ঘুরছে ছড়া,
ওই দেখো আখ গাছ, গাছে গাছে রস
প্রতিটি গাছেতে তাই ঝুলিছে কলস।
চিকিৎসা
একটা দশহাজারি বড় গল্পের বায়না পেয়েছিলাম। চমৎকার প্লট ফেঁদে বসেছিলাম, একাধিক চনমনে রমণী, উপযুক্ত লম্পট নায়ক, হাতুড়ে ডাক্তার-কাম-গোয়েন্দা, এমনকী একজন বিনোদন দালাল সমেত বিদেশি কুকুর রীতিমতো জমজমাট কাহিনি।
কিন্তু, সত্যি বলছি, একদিন রাত বারোটায় তিন হাজার শব্দের মাথায় ফ্যাসাদে পড়ে গেলাম। ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা কেমন বেঁকে গেল, তর্জনী চিনচিন করতে লাগল। শুধু তাই নয়, হাতের তালু কনকন করতে লাগল, কবজি টনটন করতে লাগল। অবশ্য ভুল হতে পারে, কাকে কী বলে জানি না, কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, এমনও হতে পারে হাতের তালু চিনচিন করছিল, কবজি কনকন করছিল, তর্জনী টনটন করছিল।
তখন কিন্তু ফ্লো এসে গিয়েছিল, কিন্তু নিতান্ত অপারগ হয়ে আলো নিভিয়ে, খাতা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আঙুল ফুলে কলাগাছ; হাত ফুলে ঢোল। এবং অসহ্য ব্যথা। দরজার ছিটকিনি খুলতে পারছি না। কনুই-কবজি ঘুরিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে পারছি না। মাথার ওপরে হাত তুলে গেঞ্জি খুলতে গিয়ে চোখে জল আসছে। যদি হঠাৎ কোনও কারণে পুলিশ, গোয়েন্দা কিংবা দুষ্কৃতী আমাকে পিস্তল দেখিয়ে হ্যান্ডস আপ করতে বলে গুলি খেয়ে প্রাণ। গেলেও হাত মাথার ওপরে তুলতে পারব না।
বাড়িতে, পাড়ায়, অফিসে সবাই খুব সহানুভূতিপ্রবণ এবং উপদেশপরায়ণ হয়ে উঠলেন। আমাদের কাজের মেয়ে বাসনা বলল, একটা ঠিকমতো সূচ নিলেই সেরে যাবে। সূচ মানে ইঞ্জেকশন, তবে ঠিকমতো ইঞ্জেকশনটা যে কী সেটা সে জানে না। আমার স্ত্রী মিনতি দেবী বললেন, মোটা কমাতে হবে। ফ্যাট বেড়ে গিয়ে এরকম হয়েছে। আমার জন্যে এই একটি সর্বরোগহর দাওয়াই তাঁর আছে। কিন্তু রাতারাতি রোগা হব কী ভাবে? তত দিন এই যন্ত্রণা সহ্য করা অসম্ভব।
আমার ছোটভাই বিজন একটু মমতাপ্রবণ। সে আমার দুর্দশা দেখে বলল, রসুন, কালোজিরে দিয়ে সরষের তেল গরম করে একটু মালিশ করে দিলে আরাম হবে। স্বভাবত অলস বিজন সেদিন সকালে অফিস যাওয়ার আগে চেতলায় গিয়ে কাঠের ঘানির সরষের খাঁটি তেল কিনে আনল। তারপর সেটা রসুন আর কালোজিরে দিয়ে গরম করে আমার হাত মালিশ করতে এল।
ভ্রাতৃযুদ্ধের অসামান্য বর্ণনা রামায়ণ-মহাভারতে আছে। সুন্দ-উপসুন্দ, বালি-সুগ্রীব, পাণ্ডব-কৌরবের কাহিনী সর্বজনবিদিত। সুতরাং নির্ভয়ে বলতে পারি, সেদিন বিজন তেল মালিশ শুরু করার স্পিলট সেকেন্ড অর্থাৎ ভগ্নাতিভগ্ন অনুপলের মধ্যে, গরম তেল, হাতের মালিশ ইত্যাদির আধিভৌতিক স্পর্শে আমার সংবেদনশীল দেহ, এক্ষেত্রে ডান হাত, পাগল হয়ে গেল।
আমি এক ঝাপটা দিয়ে গরম তেলের বাটি ফেলে দিতে চেষ্টা করলাম। তার পর বিজনকে বাঁ হাতে একটা চড় মারলাম। ছোটভাইকে চড় মারায় কোনও দোষ নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে একটু দেরি হয়ে গেল। বিজনকে শেষবার চড় মেরেছিলাম উনিশশো পঞ্চাশ সালে। অঙ্ক আর ইংরেজিতে ফেল করেছিল বলে।
বিজনও সঙ্গে সঙ্গে চুয়াল্লিশ বছর আগের অত্যাচারের শোধ নিয়েছিল, ভাল ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়ের মতো সেই ঝাপটায় পড়ে যাওয়া গরম তেলের বাটি শূন্য থেকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল।
পায়ের পাতা থেকে মাথার ব্রহ্মতালু পর্যন্ত শরীরের যে সমস্ত আটকা জায়গা সেখানে বৃষ্টি বিন্দুর মতো ছিটোতে ছিটোতে জ্বালাতে জ্বালাতে সেই গরম তেলের বাটি এসে পড়ল আমার খাটের পিছনে। আমার যন্ত্রণার সঙ্গে জ্বালা যুক্ত হল।
ভালমানুষ বিজন একটু পরে আত্মস্থ হয়ে আমার সেই উষ্ণ তৈল চর্চিত মুখাবয়বে শ্বেতচন্দন ঘষে এনে প্রলেপ লাগিয়ে অফিস গেল।
এই শত্ৰুপুরী বসবাসের অযোগ্য এই বিবেচনায় আমিও অফিসে গেলাম গেঞ্জিহীন হাফহাতা বুকখোলা জামা পরে ফুল্লহস্ত এবং চন্দনচর্চিত বদন নিয়ে।
একই সঙ্গে মুখ পোড়া এবং হাত ফোলা লোক কদাচিৎ দেখা যায়। সুতরাং আমার কাজের জায়গার লোকেরা আমাকে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল, অনেকেই অবশ্য নিরাপদ দূরত্ব থেকে। বোধহয় তাদের কারও কারও ধারণা হয়েছিল, আমি কামড়ে টামড়ে দিতে পারি।
