এবং সঙ্গে সঙ্গে ওপরের চারলাইন পদ্য লিখে ফেললেন। প্রথমে ওই দেখো আখ গাছ, না লিখে, যা দেখেছিলেন সেই অনুযায়ী ওই দেখো খেজুর গাছ লিখেছিলেন কিন্তু খেজুর গাছ লিখলে ছন্দ ঠিক থাকে না, কানে লাগে তাই খেজুর কেটে আখ করে দিয়েছেন। এদিকে তাঁর স্পষ্ট কোনও ধারণাই নেই যে আখ গাছে চড়া যায় না। কলকাতার রাস্তাতেই যে ঘণ্টা বাজিয়ে আখ। পেষাই কল দিয়ে টুকরো টুকরো আখ ঘেঁচে আখের রস গেলাসে করে বিক্রি হয় সে বিষয়ে তিনি মোটেই ওয়াকিবহাল নন।
তা, সুবেশ চৌধুরী এই কবিতাটিই আলোচ্য বইয়ের জন্য প্রথমে রচনা করেন। যদিও এ কবিতা দিয়ে অবশ্যই বই শুরু হবে না।
কবিতাটি লিখে অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে সরকারি অনুদান অধিকর্তা ড. ব্রহ্মলাল ব্রহ্মচারীকে সুবেশ। চৌধুরী ফোনযোগে কবিতাটি শোনান। ড. ব্রহ্মচারী পাড়াগ্রামে বড় হয়েছেন। তিনি আখগাছে রসের। কলস শুনে হকচকিয়ে গেলেন।
সুবেশবাবুকে সংশোধন করতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ তার খেয়াল হল, বইটা তো হাসির বই, গ্রামের লোকেরা এসব পড়লে যথেষ্টই হাসবে।
সুতরাং ব্রহ্মচারীসাহেব সুবেশবাবুকে বাহবা দিয়ে বললেন, চমৎকার হয়েছে। লিখে যান। বইটির একটা চটকদার নাম দিন।
খুবই উৎসাহিত হয়ে সুবেশ চৌধুরী বললেন, নাম ঠিক করেই রেখেছি, চাষির মুখে হাসি, কেমন নাম হয়েছে, বলুন তো?
প্রস্তাবিত বইয়ের নাম শুনে চমৎকৃত হয়ে গেলেন ড. ব্রহ্মচারী, তিনি কবুল করলেন, অসামান্য। আপনি চালিয়ে যান সুবেশবাবু। তবে মনে রাখবেন শুধু রস আর গুড় নয়, গ্রামের লোকজন। কামার কুমোর, ধোপানাপিত, চাষি-ভাগচাষি সকলের কথাই বলতে হবে। বলতে হবে। গোরু বাছুর, হাঁস-মুরগির কথাও। খরা বন্যার কথাও বলবেন।
সুবেশবাবু বললেন, আপনি বলছেন কী? একটা ছোটো বইতে এত বিষয়?
সব অল্প অল্প করে ছুঁয়ে যান। বলে ব্রহ্মচারী সাহেব ফোন নামিয়ে রাখলেন।
গ্রাম্যজীবন সম্পর্কে সম্যক অভিজ্ঞতা না থাকলেও ড. ব্রহ্মচারীর উৎসাহে প্রচণ্ড মনোবল পেলেন সুবেশবাবু।
কবিতা খুব ভাল আসে না সুবেশ চৌধুরীর। প্রথম যৌবনে বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে কিছু কিছু প্রেম-ভালবাসা, বিরহ-মিলনের কাব্য রচনা করেছিলেন।
আমার এ কুল, ও কুল দুকুল গেছে।
এখন বুকলতলায় বসে আছি।
অথবা,
সখী আমার, সখী সোনা
তোমায় আমি ভুলব না
এই জাতীয় সব এলেবেলে নাকি সুরের, এলোমেলো ছন্দের কবিতা কিছু লিখেছিলেন। কিন্তু চাষির মুখে হাসি বইতে তো এসব ন্যাকামি ভরা ছিচকাঁদুনে পদ্য দিলে চলবে না, এ বইয়ের পদ্যে যেন গ্রামজীবনের চিত্রটি সরস হয়ে ফুটে ওঠে।
সুবেশবাবু প্রাণ-মন দিয়ে সেই চেষ্টাই করতে লাগলেন।
০৩. চেষ্টার ফসল
নানা রকম বিষয়ে নানা ভাবে চেষ্টা করতে করতে হঠাৎ সুবেশবাবুর শিবরাম চক্রবর্তীর কথা মনে পড়ল।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়েরও প্রকৃতি প্রেম ছিল বহু খ্যাত। বিভূতিভূষণের প্রকৃতি প্রেম নিয়ে শিবরাম লিখেছিলেন, প্রকৃতি রসিকের রসিক প্রকৃতি। সেই গল্পে শিবরামের কায়দায় রবীন্দ্রনাথের গানকে অল্প মোচড় দিয়ে একেবারে অন্য চেহারা দেওয়া হয়েছিল, এখনও একটু মনে আছে সুবেশ চৌধুরীর,
সীমের মাঝে অসীম তুমি
বাজাও আপন সুর..
সত্যি সামান্য তরকারির সীম রবীন্দ্রনাথের গান আর শিবরামের কারসাজিতে নতুন মহিমা পেয়েছিল।
সুবেশ চৌধুরী জানেন এত ক্ষমতা তার নেই। তিনি রবীন্দ্র পরবর্তী কবিদের ধরতে গেলেন, প্রথমেই জীবনানন্দ দাশ, বনলতা সেন আর রূপসী বাংলা মিলিয়ে তিনি লিখলেন,
…হাজার বছর ধরে আমি মাছ ধরিতেছি বাংলার জলে
বারাসত পার হয়ে বসিরহাটের পথে বনগাঁর বিলে
মাছ ধরে, মাছ খেয়ে চলে যায় কাক আর চিলে
আমিও তাদের সাথে মাছ ধরি…
কিন্তু কিছুটা লেখার আরও বারকয়েক চেষ্টা করার পর স্থিতধী সুবেশ চৌধুরী বুঝতে পারলেন, ব্যাপারটা মোটেই জুতসই হচ্ছে না। এসব ইয়ার্কি হয়তো পাঠক খাবে না। বাধ্য হয়ে এবার তিনি নিজের লাইনে এগোতে লাগলেন।
ব্রহ্মচারী সাহেব পরামর্শ দিয়েছিলেন, গ্রামের লোকজন যথা ধোপা-নাপিত এই সব নিয়ে লিখতে। সুবেশবাবু বুদ্ধি করে ধোপা না লিখে রজক লিখলেন, নাপিত না লিখে প্রামাণিক লিখলেন।
কুমোর এবং কামারকে নিয়েও লিখলেন,
(ক) তুমি ভাই কুমোর,
তোমার নাই গুমোর।
(খ) ছুরি বানায়, কঁচি বানায়,
কামার মশাই হাঁপর চালায়।
কবে যেন কোথায় শুনেছিলেন সুবেশবাবু, বোধহয় বাজার করতে গিয়ে, তরকারির দোকানে অকালের সজনে কিনতে গিয়ে যে, এগুলো সজনে নয় নজনে।
নজনে, নজনে আবার কী? অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলেন সুবেশবাবু।
তখন দোকানদার তাকে বুঝিয়ে বলেছিল, সজনে আর নজনে প্রায় একই। তবে সজনে শুধু শীতের শেষে বসন্তকালে হয়, আর নজনে সারা বছর ধরে ফলে।
এ সম্পর্কেও পদ্য লিখে ফেললেন, সুবেশবাবু,
সজনে নাকি নজনে?
ওরে তোরা খোঁজ নে।
এসব যাই হোক, কয়েকটি অমোঘ পদ্য রচনা করেছিলেন সুবেশ চৌধুরী চাষির মুখে হাসি বইটির জন্য।
সবগুলোর কথা বলার জায়গা নেই। আগে রজক এবং প্রামাণিক মহাশয়দের নিয়ে লেখা ছড়া দুটির কথা সেরে নিই।
যোগীন সরকারের হাসিখুশির স্টাইলে রজক মশাইকে সুবেশবাবু বললেন,
রজক মশাই, রজক মশাই
কাপড় যদি চাও
ফরসা করে কাঁচতে হবে।
কুঁড়েমি ভুলে যাও।
