দুঃখের বিষয় আমার এখনকার অফিসের লোকেরা আমার সম্পর্কে সম্যক জানেন না। এখানে আমি মাত্র কয়েকদিন আগে এসেছি এবং সেই জন্যেই এই রকম দৈহিক অবস্থাতেও, নিতান্ত নতুন কাজ বলে অফিসে এসেছি।
আমার পাশের ঘরেই বসেন রসরাজবাবু। মাত্র এই কয়েকদিনে ভদ্রলোককে বুঝে উঠতে পারিনি। তিনি আমার অবস্থা দেখে এবং সব শুনে পরামর্শ দিলেন আদা-চা খেতে।
এই জায়গায় আমি এসেছি মাত্র দিন দশেক আগে। মনে পড়ল গত দশদিনে একদিন আমার পেটের গোলমাল, আরেকদিন সর্দিজ্বরের মতো হয়েছিল। আসলে শরীরটা কিছুকাল জুতসই যাচ্ছে না। সে যা হোক, পেট ব্যথায় এবং জ্বরে, আগের দুবারই তিনি আদা-চা খেতে বলেছিলেন।
একটু পরেই এলেন আমাদের অফিসের কেয়ারটেকার। যৌবনে তিনি মল্লবীর ছিলেন। তাঁদের বীরের বংশ। অবিভক্ত বাংলায় তার জ্যাঠা নোয়াখালিশী হয়েছিলেন; তার মাসতুতো বোন বেদান গার্লস স্কুলের বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পরপর তিন বছর কলসমাথায় দৌড়ে প্রথম হয়েছে। তিনি নিজে সকালবেলায় এখনও খালি পেটে ছয় গেলাস জল খেতে পারেন।
এই রকম শক্তিমান লোকের নাম কোনও এক অজ্ঞাত কারণে নুলোবাবু। নুলোবাবু আমার ঘরে ঢুকে অল্প কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর হঠাৎ ডান-বা দুই হাত ফুল স্পিড পাখার মতো ঘোরাতে লাগলেন। তার যে হাত ফোলা-ফাপা নয় বোধ হয় সেটাই প্রমাণ করতে চাইলেন। একটু পরে হস্তঘূর্ণন থেকে বিরত হয়ে তিনি জানালেন যে, তিনি ইচ্ছে করলে এরকম ঘন্টার পর ঘণ্টা করে যেতে পারেন।
শুনে চমৎকৃত হলাম এবং এবার তিনি বললেন, আপনি যদি আপনার দুটো হাত এভাবে ঘোরান, অন্তত কয়েক মিনিট তা হলে ফোলা ব্যথা কিছুই থাকবে না।
আমি বললাম, কিন্তু আমি তো যন্ত্রণায় হাত তুলতেই পারছি না। ঘোরাব কী করে? তিনি বললেন, ডান হাতে যখন যন্ত্রণা ওই হাতটা আপাতত বাদ থাক। বাঁ হাত ঘোরালেও কাজ হবে। বাঁ হাতের টানে ডান হাতের ব্যথা-ফোলা উপশম হবে।
অনুরোধে লোকে চেঁকি গেলে, আমি বাঁ হাত ঘোরালাম। প্রথমবার পাক দিয়ে হাতটা যেই মাথার ওপরে শূন্যে তুলেছি নামানোর মুখে হঠাৎ বাঁ কাঁধে একটা খট করে শব্দ হল। বাঁ কাধ থেকে একটা তুমুল যন্ত্রণা ঘাড় বেয়ে ব্রহ্মতালুর দিকে উঠতে গিয়ে আমার নিরেট ঘিলুতে বাধা পেয়ে বিপুল বেগে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এল। মাথা ঝিমঝিম করে অজ্ঞান হয়ে গেলাম।
দণ্ডায়মান হয়ে হস্তঘূর্ণন ক্রিয়ায় রত হয়েছিলুম। ভাগ্য ভাল নুলোবাবু খুব কাছেই সামনাসামনি দাঁড়িয়েছিলেন, চোখে অন্ধকার দেখে যখন শিকড়বিচ্ছিন্ন কলাগাছের মতো পতনোন্মুখ হয়েছিলাম তিনিই তাঁর বলিষ্ঠ বাহুর আকর্ষণে আমাকে রক্ষা করলেন।
কিন্তু শেষ রক্ষা হল না।
সেই যে রহস্যময় খট শব্দ হয়েছিল আমার বাঁ কাঁধে। তার পরবর্তী ব্যথা-যন্ত্রণা পূর্ণতা পেলে কিছুক্ষণের মধ্যে। ডান হাতের মতোই বাঁ হাত ফুলে উঠল এবং সমপরিমাণ যন্ত্রণা হতে লাগল।
অফিসে আর বসে থাকা সম্ভব হল না। কোনও রকমে বেরিয়ে পড়লাম।
খবরের কাগজে এক বেদনাহর চিকিৎসা ব্যবস্থার সচিত্র বিজ্ঞাপন পড়েছিলাম। জায়গাটা কাছেই, কোনও চেষ্টা না করেই খুঁজে পেলাম।
পাশের একটা গলির মধ্যে খঞ্জ ও পঙ্গু ব্যক্তিদের যাতায়াত আগে লক্ষ করেছি। আজ অনুমানে সেই গলির মধ্যে ঢুকে দেখলাম, ঠিকই এসেছি।
চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রবেশ করে, আশি টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ঘণ্টা দেড়েক আমারই মতো অষ্টাবক্র যন্ত্রণাকাতর কয়েকজন রোগী-রোগিনীর সঙ্গে ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করার পর অবশেষে আমার ডাক পড়ল, আমার পালা এল।
চেম্বারের মধ্যে ফিকে নীল আলো জ্বলছে। একটা ঘোরানো চেয়ারে সাদা অ্যাপ্রন পড়া মধ্যবয়সি, স্থূলোদর চিকিৎসক মহোদয় বসে রয়েছেন। তাঁর সামনে একটি সোফা, যাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলে কোচ বা কৌচ। ডাক্তারবাবু অঙ্গুলি নির্দেশ করে আমাকে ওই সোফায় শায়িত হতে বললেন। জুতো, কোট, টাই খুলে আমি শুয়ে পড়লাম।
এবার ডাক্তারবাবু একটা ঘণ্টা বাজালেন। অন্তরাল থেকে নার্সের পোশাক পরা এক শক্তসমর্থ মহিলা একটা রবারের হাতুড়ি হাতে বেরিয়ে এলেন এবং তারপর পায়ের গোড়ালি থেকে ঘাড় পর্যন্ত নির্মমভাবে সেই মহিলা আমাকে সেই রবারের হাতুড়ি দিয়ে পেটাতে লাগলেন। অবশেষে একটি মোক্ষম আঘাত মাথার চাঁদিতে করলেন। আমার মাথাটা একটু ফাঁকা, ঢিলে তবলার মতো একটা প্রায় অব্যক্ত চাপা কান্নার মতো শব্দ বেরল, আমি আবার সংজ্ঞাহীন হলাম।
শারীরিক যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার আগে ছিল না।
কিন্তু সত্যিই আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। সেই বেদনাদায়ক কাহিনি এই হালকা হাসির রচনায় টেনে আনা অনুচিত হবে। সরাসরি পরবর্তী অভিজ্ঞতার কথা বলি।
অফিস যাওয়া স্থগিত রইল। বাসায় বসে পরিচিত যন্ত্রণাহর মলম লাগাতে লাগালাম দূরদর্শনের বিজ্ঞাপন দেখে। কয়েকদিন ছয় ঘণ্টা অন্তর দুটো করে দারুণ ট্যাবলেট খেতে লাগলাম। এ ওষুধগুলো আসলে খাঁটি বিষ। চোখ লাল, কান ভোঁ-ভোঁ, মাথা ঝিমঝিম ইত্যাদি নতুন উপসর্গ দেখা দিল।
অতঃপর গরম জলে স্নান, হটওয়াটার ব্যাগ এই সবের আশ্রয় নিলাম। কিন্তু কোনও সুরাহা হল। ব্যথা-যন্ত্রণা প্রায় একই রকম রয়ে গেল। তবে কোথাও বাঁধা-ধরা ব্যথা নয়। কখনও ডান হাতে তীব্র ব্যথা, কখনও বা বাঁ হাতে, কখনও কাঁধে, কখনও কনুইতে বা বাহুতে, সতত সঞ্চরমাণ, ভ্রাম্যমাণ ব্যথা। যথেষ্ট কষ্ট পেতে লাগলাম।
