তা করুক। এরকম খাতির তো কত লোকই পায়। কিন্তু সম্প্রতি সুবেশ চৌধুরী একটি সাহিত্যিক কাজের বরাত পেয়েছেন। সরকার থেকে তার কাছে অনুরোধ এসেছে বই লেখার জন্য।
বইটির উদ্দেশ্য অতি মহৎ। গ্রামের গরিব মানুষেরা নানা রকম দুঃখ কষ্টে দিন কাটান। আজকাল এঁদের মধ্যে অনেকে নৈশ বিদ্যালয়ে কিংবা বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্রে লেখাপড়া শিখেছেন। এই সব সদ্য শিক্ষিত মানুষের মুখে হাসি ফোঁটাতে হবে। তাদের জন্য সরস এবং প্রাঞ্জল ভাষায় হালকা চালে মজার বই লিখতে হবে।
অনেক টাকার কাজ। তার ওপরে সরকারি ব্যাপার। প্রায় কিছুই না ভেবে-চিন্তে এক কথায় এই প্রস্তাবে সুবেশবাবু রাজি হয়ে গেছেন। সতীদাহ থেকে আদিবাসী সমস্যা, বেকার জীবন থেকে শ্রমিক ধর্মঘট কত কিছুর ওপরে সারা জীবন ধরে ভারী ভারী, মর্মান্তিক উপন্যাস লিখেছেন সুবেশ চৌধুরী।
তাঁর রচিত ভাইয়ের রক্ত, গির্জায় আগুন, সাকার-নিরাকার বেকার ইত্যাদি বইতে তিনি তার মুনশিয়ানার স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রগতিশীলতার চূড়ান্ত দেখিয়ে ছেড়েছেন। তবে গ্রাম বা গ্রামের লোকদের নিয়ে কখনও কিছু লেখেননি।
সুবেশবাবুর সমস্যাটা বেশ কঠিন। তিনি জন্মেছেন কলকাতার কালীঘাটে। সেখানেই বড় হয়েছেন। অল্প কিছুদিন হল একটা ফ্ল্যাট কিনে হাজরা রোডে চলে এসেছেন।
সুবেশবাবু কলকাতার বাইরের প্রায় কিছুই জানেন না। ওই রেলগাড়িতে চড়ে যেতে যেতে জানলা দিয়ে দেখা ধানখেত, জলাজমি, তাল খেজুরের গাছ, মানুষজন, পাড়াগেঁয়ে বাড়িঘর এই সব। একবার বারাসতের কাছে একটা গ্রামে পিকনিকে গিয়ে খেতের আলপথ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে শামুকে পা কেটে রক্তারক্তি হয়ে যায়। এর চেয়েও মারাত্মক হয়েছিল পরে একবার।
সে বছর যে মাঠে পিকনিক হচ্ছিল তারই পাশে কড়াইশুটির খেত। মটরগাছের নধর, নরম লতায় তখন কড়াইশুটি সবে দানা বাঁধছে। আনমনে গোটাদুয়েক কড়াইশুটি ছিঁড়ে মুখে ফেলেছিলেন। কোথাও কিছু নেই হঠাৎ কোথা থেকে হা-রে-রে করে একটা মোটা বাঁশের লাঠি হাতে ষণ্ডা মতন একটা লোক তাড়া করে এল।
তারপর এই মারে কি সেই মারে। সেই দুর্দান্ত লোকটি যিনি নাকি ওই খেতের বর্গাদার, সুবেশবাবুর কলার চেপে ধরে বললেন, পুরো মাঠের মটরের দাম না দিলে তোমাকে এই খেতের মধ্যে পুঁতে রাখব।
পিকনিকের লোকেরা ছুটে এসে সুবেশকে উদ্ধারের চেষ্টা করে। তারা বলে, ইনি মাত্র দুটো কি তিনটে শুঁটি খেয়েছেন, তার জন্য পুরো মাঠের ফসলের দাম দিতে হবে?
ততক্ষণে ভিড় জমে গেছে। সবাই বর্গাদারের বন্ধু। তারা বলল, এ হল সর্বমঙ্গলা ঠাকুরানির দেবোত্তরের মাঠ। পুরো মাঠের ফসল এই ভদ্রলোক এঁটো করে দিয়েছেন। পুরো মাঠের ফসলের দামই দিতে হবে। না হলে ছাড়া হবে না।
সেদিনের বিড়ম্বনার কথা ভাবলে আজও সুবেশ চৌধুরী ঘেমে ওঠেন।
অথচ ভাগ্যের এমন পরিহাস যে এখন সেই গ্রামের বিষয়েই সুবেশবাবুকে লিখতে হচ্ছে।
তদুপরি সরস করে লিখতে হচ্ছে।
হাসি-ঠাট্টা, হাস্য-কৌতুক সুবেশবাবুর মোটেই পছন্দ নয়। তিনি যে খুব বেরসিক তা নন কিন্তু আজকের লেখার বাজারে মজা করে লিখলে কোনও সুবিধে হয় না।
আর তা ছাড়া সত্যিকথা হল এই যে মজার কথা লিখতে গেলে মনে, মাথায় ও কলমে যেরকম ঢেউ ওঠে সে ঢেউ সুবেশবাবু আয়ত্তে আনতে পারেন না।
কিন্তু একে সরকারি কাজ, অনেক টাকা। তার ওপরে এক বাক্যে রাজি হয়ে গেছেন। এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
তবে একটা জিনিস সিদ্ধান্ত নিলেন সুবেশবাবু। গ্রাম সম্বন্ধে নতুন করে কিছু জানার চেষ্টা করবেন না। ওপরে ওপরে যেটুকু জানেন তাই দিয়ে আলগোছে কাজ সারবেন।– এই তো তার সেই পুরস্কার বিজয়ী উপন্যাস বাঁশি কবে বাজবে সামনে রয়েছে, এখানে বাঁশি মানে কারখানার বাঁশি। শ্রমিক আন্দোলনের পটভূমিকায় লেখা, যে বিষয়ে তার জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা দুইয়েরই অভাব।
সুবেশবাবু ঠিক করলেন গ্রামের ব্যাপারটিও সেইরকম আলগা আলগা ভাবে ঘেঁবেন। আর ফঁকফোকর রেখে লিখতে গেলে কবিতা করে লেখাই ভাল।
তবে সবটা পদ্যে লেখা পোষাবে না সুবেশবাবুর পদ্য বিশেষ আসেও না গদ্য-পদ্য মিলিয়ে মিশিয়ে লিখে ফেলবেন। বাঁচোয়া এই যে সদ্য শিক্ষিতদের জন্য বইটি মাত্র চৌষট্টি পাতার, তার আবার অর্ধেক পৃষ্ঠা ছবি।
০২. কবিতায় গ্রাম
ওই দেখো আখ গাছ, গাছে গাছে রস
প্রতিটি গাছেতে তাই ঝুলিছে কলস
কলসকলস রস খাবেনা একাকী,
গুড় বানাবার জন্যে কিছু থাক বাকি।
সুবেশ চৌধুরী একবার শীতের সন্ধ্যায় গাড়ি করে ডায়মন্ডহারবার থেকে কলকাতায় ফিরবার পথে দেখেছিলেন গেছুরেরা খেজুর গাছ বেয়ে উঠছে। এই ভর সন্ধেবেলা এই লোকগুলো গাছে উঠছে কেন? এই প্রশ্ন করে ড্রাইভারের কাছ থেকে তিনি জবাব পেয়েছিলেন, ওরা খেজুরের রসের হাঁড়ি নামানোর জন্য গাছে উঠছে। রস খাবে, জ্বাল দিয়ে গুড় করবে।
খেজুরের রস? সুবেশের কিঞ্চিত বিস্ময়োচিত জিজ্ঞাসায় ড্রাইভার বলেছিল, ওই রস জ্বাল দিয়েই তো খেজুরের গুড় হয়।
একটু চিন্তা করে সুবেশবাবু আবার জানতে চান, তা হলে আখের গুড়?
ড্রাইভার বলেছিল, আখের গুড় হয় আখের রস দিয়ে, এ তো সোজা কথা। যেমন তাল গুড় হয় তালের রস দিয়ে।
অনেকদিন আগের এই ঘটনাটা মনের মধ্যে গেঁথে ছিল সুবেশবাবুর। এবার গ্রামীণ মানুষদের জন্য সরস সাহিত্য রচনা করতে গিয়ে এই রসের ব্যাপারটাই তার প্রথম মাথায় এল।
