কই, চা হতে এত দেরি হচ্ছে কেন? মজুমদার সাহেব চিৎকার করে স্ত্রীকে তাগাদা দিলেন।
সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ির নীচে শোনা গেল, দু কাপ বেশি। যেন কিছুই হয়নি এইরকম হাসিমুখে কালরাতের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ঘরে ঢুকলেন পরস্পরের কাঁধে হাত দিয়ে, যেন গলায় গলায় ভাব জয়দেব আর মহিমাময় এল। জয়ের পায়ের দিকে ধুতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অন্তর্হিত, কাঁধে জামার কলার বলতেও প্রায় কিছুই নেই, কলারের নীচে পিঠের দিকে আধাআধিভাবে ছেঁড়া, একটা ফালি তেকোনা নিশানের মতো উড়ছে। মহিমার তেমন মারাত্মক নয়, তার হাওয়াই শার্টের একটা হাতাই যা শুধু নেই আর খালি পা। তা ছাড়া দুজনেই ক্রমাগত চোখ পিটপিট করছে, দুজনেই চশমাধারী, কিন্তু আজ কারওর চোখেই চশমা নেই, উভয়েই উদ্ভান্ত-দর্শন।
কাল রাত্রির ঘটনায় দুজনেই যথেষ্ট লজ্জিত। ব্যাপারটা একেবারেই যে ছেলেমানুষি হয়ে গেছে এটা প্রায় আমরা একমত হলুম, মজুমদারসাহেব বাদে। মজুমদারসাহেব ওই ঘটনার মধ্যে শুভ্রচৈতন্য এবং মহৎ আত্মাভিমান বোধের আদর্শ আবিষ্কার করেছিলেন। সমস্ত বিষয়ে অনুধাবন করতে শ্রীমতী মজুমদারের বোধহয় একটু সময় লাগল। চা খেতে খেতে প্রথম কয়েক মিনিট তিনি স্থির হয়ে স্বীয় স্বামী এবং জয় ও মহিমাকে পর্যবেক্ষণ করলেন এবং তারপর উদাসদৃষ্টিতে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইলেন, মুখে কোথায় একটা অনির্দিষ্ট বঙ্কিম হাসি।
শেষে তোমাদের দুজনেরই চশমা হারাল? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
জয় বা মহিমা কিছু উত্তর দেওয়ার আগে মজুমদারসাহেব বললেন, কিন্তু জয়ের চোখে তো শেষ পর্যন্ত চশমা ছিল, মহিমারটাই তো হাজরা পার্কে হারাল।
জয় বলল, আমার তো ছিল চোখে যতদূর মনে পড়ে, তবে যা ব্যাপার, ভোরবেলা উঠে দেখছি না, বোধহয় সেইসময় কোথাও পড়ে গেছে। হাতে একটা পয়সা নেই, এখন চশমা তৈরি করি কী দিয়ে?
কী আর করা যেতে পারে!, মহিমা উদাসীন ভাবে জানাল, ওকাকু নামে সেই জার্মানসাহেব একটা ছবি নেবে বলেছিল, তা সে তো দিল্লি থেকে ফিরছে না, ততদিন অন্ধ হয়েই থাকতে হবে।
চোখে না দেখতে পেলে কি আপনাদের ছবি আঁকার খুব অসুবিধে হয়? হঠাৎ মজুমদারগৃহিণী প্রশ্ন করে বসলেন।
মজুমদারসাহেব ফোঁস করে উঠলেন, তুমি চুপ করো তো, এর মধ্যে তুমি আবার কথা বলছ কেন?
একটু পরে জয় উঠল। তার সঙ্গে মহিমাও উঠল। মিনিট দশেক পরে ফিরে এল একা মহিমা, এবার তার চোখে চশমা।
এ চশমা তুমি কোথায় পেলে? মজুমদারসাহেব লাফিয়ে উঠলেন।
মহিমা মৃদু হেসে বলল, আমার পকেটে ছিল, সিগারেট বের করতে গিয়ে দেখি রয়ে গেছে।
কিন্তু এ চশমা তো তোমার নয়। মজুমদারসাহেব বললেন।
মহিমা কেমন আমতা আমতা করতে লাগল, কিন্তু এটা তো আমারই বলে মনে হচ্ছে।
অসম্ভব। মজুমদারসাহেবের সাফ জবাব, তোমার চশমা কালো মোটা লাইব্রেরি ফ্রেমের, আমার সঙ্গে গিয়ে কিনেছিলে। এটা জয়ের।
তোমাদের দুজনের কি একই পাওয়ার চশমার? কী করে তোমার চোখে জয়ের চশমা লাগছে? আমি প্রশ্ন করি।
মহিমা প্রথম প্রশ্ন এড়িয়ে গেল, দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে যা বলল তার সারাংশ এইরকম: যখন চোখে চশমা থাকে তখন তো আর চশমা দেখতে পাই না, আর যখন থাকে না তখন তো চোখেই দেখতে পাই না। নিজের চশমা চেনা অসম্ভব।
এই যুক্তি অনস্বীকার্য, কিন্তু একই চশমা দুজনের হল কী করে?
মজুমদারসাহেব গৃহিণীকে বললেন, তুমি বাড়ি যাও, আমি আসছি। তারপর আমাকে বললেন, আপনি আসুন, মহিমাকে নিয়ে জয়ের ওখানে যাই, দেখি জয়ের চশমার কী হল?
ব্যাপারটা একটু বেশি গোলমেলে, কিন্তু আমাকেও উঠতে হল। জয়ের ওখানে গিয়ে দেখলুম সে খালিচোখেই পিটপিট করতে করতে ছবি আঁকছে।
এই চশমাটা কার? মহিমার চোখ থেকে চশমাটা খুলে জয়ের চোখের সামনে তুলে ধরলেন মজুমদারসাহেব।
কী করে বলি? যেন ঈশ্বর বিষয়ে কোনও প্রশ্ন করা হয়েছে এই রকম নির্লিপ্তভাবে ছবি আঁকতে আঁকতে জয় উত্তর দিল।
আশ্চর্য! মজুমদারসাহেব ভীষণ বিরক্তির সঙ্গে হাতের চশমাটা জানলা দিয়ে তিনতলার বাইরের আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিলেন।
তোমার খালি চোখে কোনও অসুবিধাই হচ্ছে না, আর এর অন্যের চশমা চোখে দিয়েও কোনও অসুবিধাই হচ্ছে না! যত সব বুজরুকি! এর পরে যদি কারওর চোখে চশমা দেখি চোখ গেলে দেব! মজুমদারসাহেব আমাকে সঙ্গে নিয়ে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে এলেন।
তারপর থেকে জয় আর মহিমা কারও চোখেই চশমা নেই। আর কী এক অজ্ঞাত কারণে দুজনেরই নতুন ছবিগুলি খুব সরল আর বোধ্য হয়ে উঠল এবং শেষ পর্যন্ত এতই সরল হয়ে গেল যে তারা ছবি আঁকা ছেড়ে দিতে বাধ্য হল।
চাষির মুখে হাসি
সুবেশ চৌধুরী সাধারণ লেখক নন। তিনি একজন বুদ্ধিজীবী লেখক। সমাজের প্রতি তিনি দায়বদ্ধ, তার দায়িত্ববোধ আছে। তার প্রতিটি লেখাই আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। হাসি মশকরার লেখা লিখে তিনি হাস্যাস্পদ হতে চান না।
সুবেশবাবুর প্রতিটি রচনাই গুরুগম্ভীর। জীবনের সমস্ত তিক্ততা তাঁর রচনার পাতায় ফুটে ওঠে। দুষ্ট লোকেরা বলে সুক্তো বা তেতো রাঁধতে গেলে মহার্ঘ সজনে ডাঁটা, উচ্ছে করলা এসব না কিনে সুবেশবাবুর বইয়ের একটি পৃষ্ঠা ছিঁড়ে রান্না করলেই চমৎকার তেতো হয়ে যাবে।
কিন্তু সুবেশবাবু নানা রকম পুরস্কার প্রাপ্ত, গণ্যমান্য লেখক। সাধারণ পাঠক তার লেখা পড়ুক না পড়ুক সাহিত্যের বড়কর্তারা তাকে খাতির করেন।
