জয় এবং মহিমা ক্রমশ গোপনতর তথ্য ফাসের দিকে উৎসাহ দেখাতে লাগল। জয় কেন প্রত্যেক দিন রাত্রি এগারোটায় বসুশ্রী সিনেমার উলটোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকে, তার মেজমামা কী এক কুখ্যাত মামলায় ছ বছর জেল খাটছে, তার ছোট বোন কেন প্রত্যেক সপ্তাহে বিরাটি যায়–সব। জানাজানি হয়ে গেল।
আর মহিমাই বা কী করে প্রাইজ পেয়েছিল, মহিমার পায়ে যে শৌখিন লেডিস চপ্পল রয়েছে, তার মালিকান যে কে, সেটাও আমাদের জানতে হল।
ইতিমধ্যে চৌমাথায় আমাদের চারদিকে ভিড় জমতে আরম্ভ করেছে। ঝগড়ার সুযোগে একটা ভিখিরি বেশ দু পয়সা কামানোর চেষ্টা করতে লাগল।
ঝগড়া করতে করতেই জয়দেব আর মহিমাময় মিনিট পনেরোর জন্যে হাজরা পার্কের পেছন দিকে চলে গেল। তখনও হাজরা পার্ক পাতাল রেলের গুদাম হয়নি। রাত আটটার পরে উত্তরের দিকটা একটা মুক্তবায়ু খাবারখানা হয়ে যেত। চেঁচামেচি করে গলা শুকিয়ে গিয়েছিল, একটু গলা। ভিজিয়ে তারা আবার ফিরে এল, ধীরে ধীরে রাত অনেক হয়ে গেল কিন্তু দুজনের মধ্যে হাজার চেষ্টা করেও ঝগড়া থামানো গেল না, আমরা তাদের পরিত্যাগ করতে বাধ্য হলুম। ততক্ষণে দর্শকদের ভিড় আবার বেশ বেড়ে গেছে। একটা অকর্মা গোছের ট্রাফিক-পুলিশ ভাঙা বাংলায় কয়েকবার ক্যায়া হোতা হ্যায়, রাত বারো বাজ গিয়া ইত্যাদি জানান দিয়ে দিয়ে অবশেষে উলটোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে রাস্তায় লাঠি ঠুকতে লাগল। আমি আর মল্লিকমশায় রাত বারোটায় ঝগড়া দেখবার জন্যে এত লোক কোথা থেকে জড়ো হয় এই বিষয়ে আলোচনা করতে করতে বাড়ির দিকে পা। বাড়ালাম।
শুধু মজুমদার সাহেব-ই রয়ে গেলেন। কোনওদিন কোনও কলহই তিনি অর্ধসমাপ্ত রেখে যাননি, আজও তার কোনও ব্যতিক্রম হল না। আমরা যেতে যেতে পিছন ফিরে দেখলাম মজুমদার সাহেব চৌমাথার পাশের রেলিং-এর ওপর বসে নির্বিকার সিগারেট টানছেন, নীচে ভিড়ের মধ্যে মহিমা আর জয়কে দেখা গেল না কিন্তু তাদের উচ্চ, অশ্রাব্য কণ্ঠস্বর বহুদূর পর্যন্ত আমাদের কর্ণগোচর হতে লাগল।
পরদিন নরমহাতের কড়ানাড়ায় ঘুম ভাঙল সাড়ে পাঁচটায়। একটু বিরক্ত হয়েই দরজা খুলেছিলাম। চার ঘণ্টাও ভাল করে ঘুমাইনি। খুলে দেখি মজুমদার-গৃহিণী, অসম্ভূত অলকদাম, নিশিজাগরণে লোহিতা-লোচনা, প্রায় বাড়ির পোশাকে বাইরে চলে এসেছেন, এই আমার বাড়ি পর্যন্ত। মজুমদার-গৃহিণী নিজের বাড়ি থেকে এগারো মাইল দূরের এক মেয়েকলেজের মর্নিং সেকশনে পড়ান, প্রতিদিন শেষরাত্রিতে গৃহত্যাগ করেন। সুতরাং এই ভোর সাড়ে পাঁচটা যে আমার মধ্যরাত্রি এতটা তিনি বোধহয় পূর্বে অনুমান করতে পারেননি।
সমস্ত বিরক্তি ঢেকে, আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, কী সৌভাগ্য, প্রভাতে উঠিয়া ও মুখ আসুন।ততক্ষণে বুঝতে পেরেছি মজুমদার সাহেব কাল রাত্রে বাড়ি ফেরেননি।
কিঞ্চিৎ শঙ্কা, কিঞ্চিৎ লজ্জাও বোধহয় মৃদু হাসির সঙ্গে মিশিয়ে একটা মোটামুটি সুসেব্য মিস্টার তৈরি করলেন মজুমদার-গৃহিণী, আপনার বন্ধু কাল রাত্রে আপনার এখানে ছিলেন না?
আমি আমতা আমতা করে উত্তর দিতে যাচ্ছি, এমন সময় প্রায় উদভ্রান্তের মতো মজুমদার সাহেব ঘরে ঢুকলেন। ঢুকেই কাল রাত্রের গৃহে অনুপস্থিতির জন্যে বিন্দুমাত্র লজ্জিত না হয়ে উলটে গৃহিণীকে ধরলেন, তুমি এই সাতসকালে বাড়িতে তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়েছ, আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে! আমার কয়েক মাস আগের এক শীতের রাত্রির কথা মনে পড়ল। মজুমদার সাহেব যেদিন বাড়ির চাবি পকেটে করে আমার ঘরে রাত্রে থেকে গিয়েছিলেন, সেদিন মজুমদার-গৃহিণী কী করেছিলেন?
কিন্তু আজ একটা দাম্পত্য কলহ প্রায় আমার ঘরের মধ্যেই লেগে গেল। আমি মধ্যে পড়ে মজুমদার-গৃহিণীকে বিরত করতে চেষ্টা করলুম, চাকরটা আবার নিরুদ্দেশ, সকালবেলায় বাড়িতে অতিথি এসেছেন, একটু চা খান, কেটলি স্টোভ সবই তো কোথায় আছে জানেন, দয়া করে একটু করে নিন।
এইসব মুহূর্তে মজুমদার সাহেবের পত্নীপ্রেম দেখবার মতো, আমার স্ত্রী কেন আপনার বাড়িতে চা করবে? ভদ্রতা করতে হয় নিজে চা করে খাওয়ান!
আমি আজকাল আর এসব কথায় অপমানিত হই না। চুপ করে রইলাম।
মজুমদার-গৃহিণী উঠে পাশের ঘরে চা করতে গেলেন। আমি মজুমদার সাহেবকে গতরাত্রের ঘটনা জিজ্ঞাসা করলাম। কিছুক্ষণ ফোঁস ফোঁস করে, তারপরে তিনি মুখ খুললেন, বিস্তৃত বিবরণ দিলেন সমস্ত ঘটনার। মজুমদার সাহেবের কথা শুনতে শুনতে এতক্ষণে লক্ষ করে দেখলাম ওঁর শরীরের উপর দিয়ে গতকাল রাত্রে যেন দুর্দান্ত তাণ্ডব বয়ে গেছে। ধুতির কোঁচা শতচ্ছিন্ন, কানের নীচে রক্তবর্ণ আঘাতের চিহ্ন, বাঁহাতের দুটো আঙুলে রক্তমাখা ন্যাকড়ার ফালি জড়ানো।
রাত একটার পর জয় আর মহিমা দুজনেই যেন ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তখন আর মুখে মুখে নয়, হাতে হাতে। বিটের জমাদারের মুখ-চেনা ছিল মজুমদারের, তাই থানা পুলিশ হয়নি। দুবার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে মজুমদার সাহেব আহত হয়েছেন। একবার মহিমা ধাক্কা দিয়ে পার্কের রেলিং-এ ফেলে দেয়, পরের বার রাস্তার এক পাগলা ভিখিরির গায়ে। সেই পাগলা ভিখিরিটাকে আমরা সবাই চিনি, নিরীহ ঠান্ডা মেজাজের। কিন্তু হঠাৎ আচমকা ঘুম ভেহে যাওয়ায় সে লাফিয়ে উঠে রাস্তা থেকে একটা ভাঙা বাঁশের টুকরো কুড়িয়ে তিনজনকেই বেধড়ক আক্রমণ করে। এতেই অবশ্য গোলমালের ফয়সালা হয়ে যায়। সেটা রাত তিনটের সময়। তারপর এতরাত্রে আমাকে আর বিরক্ত করবেন না স্থির করে মজুমদার একা পায়ে হেঁটে আহত ক্লান্ত অবস্থায় বাড়ি পৌঁছে দেখেন দুয়ার বন্ধ।
