জগদম্বা চেঁচামেচি থামিয়ে তাদের কী বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগে শোভনলালবাবু বললেন, আমার বাড়ি থেকে শঙ্খ, কাসর, ঘণ্টা এইসব পুজোর জিনিস চুরি গেছে।
জগদম্বা দেবীর হাত দিয়ে তখনও টপটপ করে রক্ত ঝরছে। একে বেড়ালের কামড় তার ওপরে শোভনলালবাবুর এই মিথ্যা ভাষণ, ধার দিয়ে চুরি হয়েছে বলে, তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। নাতির হাত ধরে ধুপ ধুপ করে বাড়ি ফিরে গেলেন।
আধঘণ্টার মধ্যে ভোম্বা একটা থলেতে করে শঙ্খ, ঘণ্টা, চন্দনপাটা সব ফেরত দিয়ে গেল। জানলার মাথায় বসে আকাশবাণী সব পর্যবেক্ষণ করছিল, শোভনলালবাবু জিনিসগুলো সব মিলিয়ে নিলেন। এর মধ্যে পাড়ায় কী করে রটে গেল যে মহান উত্তমর্ণ শোভনলালবাবুর পোষ বেড়ালের মাথা খারাপ হয়ে গেছে, সে লোককে কামড়াতে শুরু করেছে। শোভনলালবাবুর কাছ থেকে কিছু নিয়ে যারা ফেরত দেয়নি, বেছে বেছে তাদেরই নাকি কামড়াচ্ছে।
বিকেল নাগাদ লম্বা লাইন পড়ে গেল। এত জিনিস লোকে ধার নিয়েছিল শোভনলালবাবুর মনেই ছিল না। পেতলের গামলা, কাঁসার বাটি, অ্যালুমিনিয়ামের কড়াই, স্টিলের থালা, বেতের চেয়ার, কাঠের টুল থেকে শুরু করে এক কেজি চাল, এক কাপ চিনি-তালিকা বাড়িয়ে লাভ নেই।
এমনকী শেষের দিকে নমিতা এসে শ্বশুরের ধার নেওয়া ঘাসকাটার কল ফেরত দিয়ে গেল। শোভনলালবাবু ভেবেছিলেন, নমিতা বুঝি থার্মোমিটারটা আবার চাইতে এসেছে। কিন্তু তা নয়। মৌরলার জ্বর ছেড়ে গেছে, ওটা আর দরকার হবে না। নমিতার সঙ্গে তাদের কাজের মেয়ে ঘাসকলটা নিয়ে এসেছে।
শুধু নির্মলাদেবীই ব্যতিক্রম। তিনি চলন্তিকা ফেরত দিতে এলেন না। কোনও দিন আসবেন কি, কে জানে?
» চশমা
এ কাহিনি জয়দেব ও মহিমাময়ের অল্প বয়েসের। তখনও তারা মদ্যপ হিসেবে এত বিখ্যাত হয়নি। সন্ধ্যাবেলা হাজরার মোড়ে আমাদের একটা আড্ডা ছিল, সেখানে প্রতি সন্ধ্যায় এদিক ওদিক থেকে মদ খেয়ে এসে ঝামেলা বাধাত। তখন তাদের নবীন যৌবন। তাদের দুজনেরই মাথায় ঢুকে গিয়েছিল যে, ছবি আঁকা ছবি এঁকে নাম করা সবচেয়ে সোজা এবং তার আনুষঙ্গিক হিসেবে প্রয়োজন রং, তুলি, ক্যানভাস এবং মদ্যপান।
মহিমা একটু বেশি, জয় একটু কম, কিন্তু দুজনেই অতিমাত্রায় আধুনিক। মহিমার যে-ছবিটি বিশেষ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল, সেটি আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। বিরাট ক্যানভাসে হলুদ রং মাখানো, নীচে তিনটে কালো দাগ পাশাপাশি! লাহিড়ি অবশ্য বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, এগুলি হল পাপবোধ। জয় তর্ক করেছিল, তাহলে লাইনগুলো উত্তর-দক্ষিণে না হয়ে পুবে-পশ্চিমে হওয়া উচিত ছিল। এই তর্ক কোথায় শেষ হত বলা যায় না, যদি না মজুমদারসাহেব যথাসময়ে অংশগ্রহণ। করতেন। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা পিকাসোতে পৌঁছে গেলুম। দক্ষিণ ফ্রান্সের এক মাঝারি জেলায় পিকাসো নামের চার রকম বানান হয়। পিকাসোর পিসেমশায় কলকাতায় ফ্রেঞ্চ ব্যাঙ্কে দেড় বছর কাজ করেছিলেন, কিন্তু তার কলকাতার টিকটিকি দেখলে গা কেমন ঘুলিয়ে উঠত, বাধ্য হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁকে কলকাতা ছেড়ে যেতে হয়। দু-একবার মল্লিকমশায় কীসব প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মল্লিকমশায় দৈনিক আজ্ঞায় আসতে পারেন না, তাই বোধহয় কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে তাই চুপ করে রইলেন।
কিন্তু কথায় কথায় মহিমা আর জয় খুব চটে গেল, চটে গেল বললে কম বলা হয়, ভয়ংকর ক্ষেপে গেল বলা উচিত। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, জয়ের একটা বাজে অভ্যাস আছে, মদ ছাড়াও সন্ধ্যাবেলায় একটু গাঁজা খায়, রাতের দিকে চোখ লাল থাকে, একটু ব্যোম-ব্যোম ভাব যাকে বলে। মহিমা ঠিক সেরকম নয় তবে সে কদাচিৎ স্নান করে। অনেকে বলে মাসে একদিন, মজুমদার সাহেবের মতে বছরে একদিন, সে-ও সেই দোল-পূর্ণিমার দিন গায়ের রং ভোলার জন্যে। মোট কথা, দুজনেই একটু তিরিক্ষি মেজাজের। বিশেষত সন্ধ্যার পরে।
ঝগড়াটা লেগেছিল মজুমদার সাহেবের সঙ্গে। গঞ্জিকাসেবী বা মদোমাতাল তিনি কাউকে ভয় পেয়ে তর্কে রেহাই দেবেন, এমন পাত্র নন। আমি আর মল্লিকমশায় মৃদু মৃদু হাসছিলাম।
ঘরের মেঝেতে জল যেমন গড়ায়, সেইরকম ঝগড়া গড়াতে লাগল। কখনও খুব দ্রুতগতিতে, তারপর কোথাও কিছু নেই একটু থমকে, কিছুক্ষণ আবার চুপচাপ, তারপর দুদিকে কেটে ছড়িয়ে পড়ল। একটা দিক খুব চিকন হয়ে ফুরিয়ে গেল, মজুমদারসাহেব বনাম জয় হঠাৎ সেখান থেকে একটা ধারা বেরিয়ে আলের মূল ধারার সঙ্গে জুড়ে তরতর করে পাহাড়ি নদীর মতো ঝগড়া চলল জয় আর মহিমার মূল নায়কদের মধ্যে।
আধঘণ্টার মধ্যে জয় সম্বন্ধে আমরা এমন সব তথ্য শুনতে পেলাম মহিমার মুখে, আর মহিমা সম্বন্ধে জয়ের মুখে, যা ভাবাই যায় না। বহু গোপন তথ্য ফাস হয়ে গেল, দুজনের মধ্যেকার অনেক নিবিড় ষড়যন্ত্র। জয়ের যে গৃহপালিত কুকুর ছবিটার আমি খুব প্রশংসা করি আসলে সেটা নাকি আমাকে নিয়েই আঁকা। (এতদিন পরে মনে পড়ছে, কুকুরটাকে দেখে আমার কেমন মায়া হয়েছিল, কেমন যেন চেনা চেনা মনে হয়েছিল, কোথায় যেন অনেকবার দেখেছি, এখন কারণটা বোঝা গেল।)
অন্যদিকে জয়ের মুখে জানা গেল মহিমার পাপবোধ ছবিটা নাকি মল্লিকমশায়ের চরিত্র নিয়ে আঁকা। হলদে রং আর তিনটে কালো দাগের কী অর্থ তা এবার বেরুল। তিনটে কালো দাগ তিনটি মহিলাকে বোঝাচ্ছে, আর তারা প্রত্যেকেই আমাদের অতিপরিচিতা। তাদের সঙ্গে শান্তশিষ্ট, রসিকপ্রকৃতির মল্লিকমশায়ের এমন সরস সম্পর্ক থাকতে পারে আমরা কখনও ভাবতেই পারিনি।
