কিন্তু এই মুহূর্তে শোভন কুটিরের দরজায় দাঁড়িয়ে শোভনলাল জগদম্বার চিন্তা থেকে বিরত হয়েছেন। এখন ভাবছেন নমিতার এত দেরি হচ্ছে কেন, জ্বর দেখতে কতক্ষণ সময় লাগতে পারে?
একটা দুশ্চিন্তাও শোভনলালবাবুর মাথায় দেখা দিয়েছে, নমিতার শ্বশুর ভূদেব দস্তিদার যদি জানতে পারেন যে তাঁর বাড়িতে একটা থার্মোমিটার ঢুকেছে সেটা কিছুতেই বেরোতে দেবেন না, সেটা তাঁর ধর্মই নয়।
ভূদেব দস্তিদার ধার নেননি এমন কোনও দ্রব্য পৃথিবীতে নেই। শতরঞ্জি, ঝুলঝাড়ু, কাঠের মই, বড় বালতি, চায়ের পেয়ালা, পঞ্জিকা এমনকী ঘাস কাটার কল পর্যন্ত ভূদেববাবু শোভন কুটির থেকে কখনও না কখনও ধার নিয়েছেন এবং তারপর আর ফেরত দেননি।
শোভনলালবাবু ভূদেববাবুর ধার রহস্য সম্পর্কে চিন্তা করে কোনও কূল পান না, কখনওই পাননি। ভূদেববাবুর বাড়িতে এক চিলতে বাগান নেই, ঘাস নেই। ঘাসকাটা কল তার কী কাজে লাগছে শোভনবাবু কিছুই অনুমান করতে পারেন না।
একবার নমিতাকে জিজ্ঞাসা করায় সে অবশ্য অদ্ভুত একটা উত্তর দিয়েছিল। তার শ্বশুরমশায় নাকি ছাদের ওপর ঘাসকাটা কল চালান।
নমিতার কাছে শোভনবাবু জানতে চেয়েছিলেন, তোমরা কি ছাদে মাটি ফেলে ঘাসের চাষ করেছ? নমিতা সেদিন শোভন কুটিরে এসেছিল মৌরলাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। মৌরলাকে হস্তগত করে এ প্রশ্নের কোনও জবাব না দিয়ে সেদিন চলে গিয়েছিল।
আজ নমিতার কাছে ছাদে ঘাসকাটা কলের ব্যবহারের ব্যাপারটা বুঝতে হবে। কিন্তু থার্মোমিটার নিয়ে নমিতা আসছে কোথায়?
এদিকে বাড়ির মধ্য থেকে বুড়ো হুলো বেড়ালটা রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। শোভনলালবাবুর পায়ে ঘুর ঘুর করছে আর পিঠ ঘষছে। রেডিয়োর মতো ঘরঘর শব্দ করে বলে এ বেড়ালটার নাম আকাশবাণী।
শোভন কুটিরে প্রাণী বলতে মোট দুজন। শোভনলালবাবু আর আকাশবাণী। শোভনলাল দীর্ঘদিন বিপত্নীক। দুই ছেলে দুজনেই বাইরে। বড়টি দিল্লিতে চাকরি করে। ছোটটি বিদেশে পড়ায়। দুজনেরই ঘরসংসার আছে, কদাচিৎ বুড়ো বাপের কাছে আসতে পারে। তার একই মেয়ে, সেও বিয়ে হয়ে শিলিগুড়িতে শ্বশুরবাড়িতে রয়েছে।
নমিতার দেরি দেখে কী করবেন ভেবে উঠতে পারছিলেন না শোভনবাবু। নিজেই এগিয়ে যাবেন নাকি থার্মোমিটারটা উদ্ধার করতে, এইরকম ভাবছিলেন।
এমন সময় নমিতাকে তাদের বাড়ির দরজায় দেখা গেল। সে এদিকেই আসছে।
একটু আগে তার মুখে যেমন একটা চিন্তিত কালচে ভাব দেখা গিয়েছিল এখন সেটা কেটে গেছে। বেশ হাসিমুখ।
নমিতা থার্মোমিটারটা হাতে করে নিয়ে এসেছে। সে এসে প্রসন্ন কণ্ঠে বলল, জ্বরটা একদম কমে গেছে। প্রায় ছেড়েই গেছে বলা যায়। প্রথমবারে থার্মোমিটার দেখে বিশ্বাসই হল না। তাই একটু সময় পরে আবার দেখলাম, আরও কম। এখন তো মেয়ে ঘামছে, জ্বর ছাড়ল বলে।
আকাশবাণী বেড়ালটা নমিতাকে চেনে, খুবই পছন্দ করে। নমিতাদের বাড়িতে গেলে তাকে নমিতা মৌরলার উদ্বৃত্ত দুধ, কখনও বা দুয়েক টুকরো মাছের কাটা খেতে দেয়। এখন রাস্তায় নমিতাকে দেখে আকাশবাণী তার ঘরঘরানি আরও বাড়িয়ে দিল, তার পায়ে মাথা ঘষতে লাগল।
নমিতার কাছ থেকে থার্মোমিটারটা ফেরত নিয়ে শোভনলাল তার পুরনো কৌতূহলের সূত্র ধরে নমিতাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি সেদিন বলছিলে না, তোমার শ্বশুর মশায় ছাদে ঘাসকাটা কল ব্যবহার করেন। তোমাদের ছাদে কি ঘাস আছে? ভূদেববাবু ছাদে ঘাসকাটা কল দিয়ে কী করেন? নমিতা বলতে যাচ্ছিল যে তার শ্বশুরমশায় ছাদে ঘাস কাটেন না, ওটা ছাদের ওপর চালান কাক, চিল, পায়রাকে ভয় দেখানোর জন্যে, যখন আমসত্ত্ব কি ডালের বড়ি, চাল কি ডাল ছাদে রোদে দেওয়া হয়।
কিন্তু সে কিছু বলার আগেই পথের ওপাশে দেখা গেল জগদম্বাবাহিনী এই দিকেই আসছে।
জগদম্বাবাহিনী অর্থাৎ স্বয়ং জগদম্বা দেবী এবং তাঁর সেই অশিষ্ট নাতি, যার নাম ভোম্বা।
তখন আকাশবাণী নমিতার পায়ে পিঠ ঘষছে।
জগদম্বা দেবীর নাতি ভোম্বা ছুটে এসে বেড়ালটাকে কোলে তুলে বলল, ঠাকুমা, এই বেড়ালটা।
আকাশবাণীর ভোম্বাকে খুব পছন্দ হয়নি। ভোম্বার আলিঙ্গনে আবদ্ধ অবস্থায় সে ফোঁস করে উঠল। ভোম্বা তাকে আরও চেপে ধরল।
নমিতা জগদম্বা দেবীকে ভালই চেনে। তার আশঙ্কা হল আকাশবাণী বোধহয় জগদম্বার বাসায় গিয়ে কিছু চুরি-টুরি করে খেয়েছে। তাই নালিশ করতে এসেছেন।
শোভনলালবাবু অবশ্য জানেন যে আকাশবাণী অন্য বাড়িতে গিয়ে চুরি করে খাওয়ার বেড়াল নয়। বাড়িতে তার যথেষ্ট খাবার আছে, তা ছাড়া অন্য বাড়িতে সে কদাচিৎ যায়।
কিন্তু জগদম্বা যা বললেন তা শুনে নমিতা ও শোভনলালবাবু দুজনেই বিস্মিত হয়ে গেলেন। জগদম্বা দেবীর বাসায় খুব ইঁদুর হয়েছে, তিনি এই বেড়ালটাকে এক সপ্তাহের জন্য ধার নিতে চান। দুবেলা ভোম্বা এ বাড়িতে এসে খাইয়ে-দাইয়ে নিয়ে যাবে। তা ছাড়া সারাদিন আর রাতের বেলা জগদম্বা দেবীর বাসায় কাটাবে। সবগুলো ইঁদুর মারা হয়ে গেলে তিনি নিজে এসে বেড়াল ফেরত দিয়ে যাবেন।
জগদম্বার কথা শুনতে শুনতে আকাশবাণী ফাঁচ ফাঁচ করছিল। সে কী বুঝতে পারল কে জানে, হঠাৎ ভোম্বার কোল থেকে মুখ বাড়িয়ে জগদম্বা দেবীর হাত কামড়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে রক্তারক্তি কাণ্ড।
এর পরের ঘটনা বিস্তারিত বলার প্রয়োজন নেই। জগদম্বা নাতিকে নিয়ে দ্বৈত আর্তনাদে পাড়া মাথায় করে তুললেন। লোকজনের ভিড় হয়ে গেল। প্রায় থানা-পুলিশ হয়ে যায় আর কী। সুযোগ বুঝে মোড়ের দিক থেকে দুজন হোমগার্ডও এগিয়ে এল।
