থার্মোমিটার নিয়ে বাড়িতে ফিরে যেতে যেতে মৌরলার মা দেখল শোভনলালবাবুর বাইরের ঘরের দেয়ালে বড় সাইনবোর্ড, সুকুমার রায় থেকে বেমালুম চুরি করে এই নোটিশটি তিনি দিয়েছেন,
কেঁদে কেঁদে হেসে হেসে
ভুগে ভুগে কেশে কেশে
দেশে দেশে ভেসে ভেসে
এত ভাল বেসে বেসে
টাকা মেরে পালালি শেষে!..
দেয়ালের এই নোটিশ তথা বিজ্ঞাপন দেখে নমিতা একটু থমকিয়ে দাঁড়াল। মৌরলাকে শোভনলালবাবু খুব ভালবাসেন, আন্তরিক স্নেহ করেন। মৌরলা অনবরতই এ বাড়িতে, যে বাড়ির নাম শোভন কুটির, যাতায়াত করে। তার পিছু পিছু নমিতাকেও প্রায়শই যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু নমিতা এই নোটিশ তথা বিজ্ঞপ্তি এই দেয়ালে এর আগে কখনও দেখেনি।
নমিতাকে থমকিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে দেখে, সুবুদ্ধি শোভনলালবাবু প্রশ্ন করলেন, কী হল?
নমিতা কিছু না বলে নোটিশ বোর্ডটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে দেখে শোভনলাল বললেন, ওই বিজ্ঞাপন তোমার জন্যে নয়। তুমি তাড়াতাড়ি গিয়ে মৌরলার জ্বর দেখে সঙ্গে সঙ্গে থার্মোমিটারটা ফেরত নিয়ে এস। আমি এই সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছি।
নমিতা তখনও থমকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বিশেষ করে এই কথা শোনার পরে সে আরও গোলমালে পড়ে গেছে। থার্মোমিটারটা রেখে যাবে কিনা সে ভাবছিল।
কিন্তু সেটা খুব খারাপ দেখাবে। বুড়ো মানুষেরা একটু গোলমেলে হয়। নমিতার শ্বশুরমশায়, মানে মৌরলার ঠাকুরদাও খুব গোলমেলে। একটু মানিয়ে চলতে হয়।
নমিতা থার্মোমিটার নিয়ে বেরিয়ে যেতে শোভনলালবাবু নিজের বাড়ির সদর দরজার বাইরে রাস্তার ওপরে এসে দাঁড়ালেন। তার দৃষ্টি নমিতার দিকে। কখন নমিতা মেয়ের জ্বর দেখে। থার্মোমিটার ফেরত নিয়ে আসবে, তার কাছ থেকে সেই থার্মোমিটার উদ্ধার করে বাড়িতে ঢুকে ওষুধের বাক্সে সেটা আবার ঢুকিয়ে রাখবেন, এই মুহূর্তে শোভনলালবাবুর সেটাই একমাত্র চিন্তা।
শোভনলালের এই দুশ্চিন্তার মূলে অবশ্য ঘনিষ্ঠ কারণ একটা আছে। নমিতার শ্বশুর ভূদেবচন্দ্র দস্তিদার যেকোনও জিনিস ধার করায় এক্সপার্ট এবং ধার করে ফেরত না দেওয়ায় আরও বেশি এক্সপার্ট।
ভূদেববাবুর কাছে কী কী জিনিস পাওনা আছে তার একটা তালিকা মনে মনে মুখস্থ আছে শোভনলালবাবুর।
শুধু ভূদেববাবুর কাছে কী পাওনা আছে তা নয়, দূরে-কাছের বহুজনের কাছে তার যা পাওনা আছে কিছুই ভোলেননি শোভনলাল।
গলির মোড়ের পীতাম্বরবাবু রেল কোম্পানির বড় চাকরি করতেন। সেই ভদ্রলোক বাড়িতে আত্মীয়কুটুম হঠাৎ চলে আসায় একটা বড় মশারি বছর দেড়েক আগে এক সন্ধ্যাবেলা এসে ধার। করে নিয়ে গিয়েছিলেন। আত্মীয়েরা চলে যাওয়ার পরে পীতাম্বরবাবু বলেছিলেন, মশারিটা ধোপাবাড়ি থেকে কাচিয়ে ফেরত দিয়ে আসব। শোভনলাল বলেছিলেন, তার কী দরকার? প্রয়োজন হলে আমি নিজেই কাচিয়ে নেব।
কিন্তু সে সুযোগ আর শোভনলাল শেষ পর্যন্ত পাননি। পীতাম্বরবাবু প্রথম প্রথম এড়িয়ে চলতেন, এখন আর দেখা হলেও উচ্চবাচ্য করেন না। মশারিটা বোধহয় ধোপাবাড়ি থেকে কেচে আজও আসেনি।
এর চেয়ে অনেক মারাত্মক ধারিয়ে হলেন গলির মোড়ের ওপারের জগদম্বা দেবী। অঘ্রান মাসের শেষ শনিবারে পূর্ণিমা পড়েছিল। সেদিন সন্ধ্যায় জগদম্বা দেবী তাদের গৃহে সত্যনারায়ণ ঠাকুরের পুজো করেছিলেন। পুজোর দিন সকালে প্রসাদ খাওয়ার নিমন্ত্রণ করার জন্য নাতির হাত ধরে এসে শাখ, কাসর ঘণ্টা, তামার কোষাকুষি, চন্দনের পাটা ধার করে নিয়ে যান জগদম্বা। ফেরত দেওয়ার নামগন্ধ নেই।
শোভনলালবাবু মধ্যে একদিন সকালে নিজে থেকে জগদম্বা দেবীর বাড়িতে গিয়েছিলেন জিনিসগুলো উদ্ধার করতে। ভদ্রমহিলার নাতি, ঠাকুমা, কাপড় ছাড়ছে, এই বলে বাইরের ঘরের। মুখে এক ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখল, ভেতরে এসে বসতে পর্যন্ত বলল না। এদিকে শোভনলাল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেবে গেলেন, প্রৌঢ়া বিধবার কাপড় ছাড়তে এতক্ষণ কেন লাগে?
জগদম্বা দেবীর সঙ্গে কিন্তু দেখা হল না। এক ঘণ্টা পরে নাতি এসে জানাল, ঠাকুমা, পুজোয় বসে গেছে। বিরক্ত হয়ে শোভনলালবাবু বললেন, তোমাদের বাড়িতে আমার শাখ, কাসর ঘণ্টা এসব আছে। সেগুলো নিতে এসেছি।
নাতি এবার নিজ দায়িত্বে বলল, কিন্তু সে তো এখন ফেরত দেওয়া যাবে না। সরস্বতী পুজোর পরে পাবেন। শোভনলাল মিনমিন করে বললেন, কিন্তু আমার বাড়িতেও যে সরস্বতী পুজো আছে। কোনও জবাব না দিয়ে জগদম্বার কিশোর নাতি তার মুখের ওপরে সদর দরজা বন্ধ করে দিল।
অপমানিত শোভনলালবাবু রাস্তায় নামতে নামতে জগদম্বা দেবীর বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, পুজো-টুজো নয়, দোতলার বারান্দায়, সাদা প্লাস্টিকের ইজিচেয়ারে বসে জগদম্বা দেবী নীল-মেরুন প্রিন্টেড কাপড়ের সাদা লেস লাগানো আধুনিক ঘটিহাতা নাইটি পরে সকালের খবরের কাগজ পড়ছেন।
শোভনলাল অত্যন্ত ভাল লোক, তার মনে রাগ-বিদ্বেষ কিছু নেই। সকালবেলায় ঝলমলে রোদে ইটরঙা জগদম্বা কুটিরের দোতলার বারান্দায় প্রতারিকা জগদম্বাকে মোহিনী বেশে দেখে তার মনটা কেমন হয়ে গেল। শীতের বাতাসের হু হু ভাবটা তার মনের মধ্যেও ঢুকে গেল। এ অবশ্য সাত দিন। আগের কথা। এই সাত দিন শোভনলালবাবু ক্রমাগতই জগদম্বা দেবীর কথা ভেবেছেন। এদিকে সরস্বতী পুজোও এসে গেছে, পুজোর জিনিসপত্রগুলি ফেরত পাওয়া দরকার।
