এদিকে দোকানের মালিক দেশে গিয়েছিল, সামনের সপ্তাহে ফিরবে। তার আগেই পটললালকে টাকাটা জোগাড় করতে হবে, মালিক ধরতে পারলে চাকরিটি যাবে, জেল খাটতেও হতে পারে।
ফলে খুবই দুঃসাহসভরে পটললাল জুলেখার একটি সোনার হার চুরি করে দোকানে বন্ধক রেখে টাকাটা সংগ্রহ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু চুরি করার পরেই ধরা পড়ে যান। ফলস্বরূপ কাল রাতে এবং আজ সকালে পটললালকে ক্রমাগত লাথি-ঘুষি, চড়-চাপড় খেতে হয়েছে জুলেখার কাছে।
একদিকে জুলেখার নির্যাতন, অন্যদিকে মালিকের ফিরে আসার আশঙ্কায় পটললাল খুবই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। কোনওরকমে কাউন্টারে বসে দোকানের কাজকর্ম দেখছেন।
এদিকে অনুপমা দোকানে ঢুকে একজোড়া চটি পছন্দ করেছে। এই দোকানের সব পাদুকাই কোনও না কোনও চিত্রতারকার নামে, যেমন জুহি চাওলা চপ্পল, শতাব্দী রায় চটি, প্রসেনজিৎ কাবুলি। যে জোড়া অনুপমা পছন্দ করল তার নাম হেমা মালিনী হাই হিল।
জুতোজোড়া পায়ে দিয়ে দোকানের কার্পেটে একটু পায়চারি করে অনুপমা দেখল যে ভালই হয়েছে, পায়ে ভাল ফিট করেছে। ঠিক করল এটা পায়ে দিয়েই যাবে, পুরনো ঘেঁড়া চটিজোড়া কোথাও ফেলে দেবে।
যে কর্মচারী জুতো দেখাচ্ছিল, তার হাতে জুতোর দাম বাবদ বাবার দেওয়া তিনটে একশো টাকার নোট দিয়ে অনুপমা অপেক্ষা করছিল, কাউন্টার থেকে ক্যাশমেমো করিয়ে খুচরো ষাট টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য। নতুন জোড়ার দাম দুশো চল্লিশ টাকা।
ভদ্রলোকের ফিরতে দেরি হচ্ছিল, কাউন্টারে বেশ ভিড়। ইতিমধ্যে অনুপমা তার পুরনো চটিজোড়া নতুন জুতোর বাক্সে ভরে নতুন চটিজোড়া পায়ে পরে নিয়েছে।
দেরি হচ্ছে দেখে সে কাউন্টারের দিকে এগোল, যাওয়ার সময় কী ভেবে পুরনো চটিজোড়া সমেত জুতোর বাক্সটা যেখানে বসেছিল সেই সিটটার উপরে রেখে দিল। তারপর পটললালের কাউন্টারে গিয়ে খুচরো টাকাটা কর্মচারিটির কাছ থেকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
এদিকে কর্মচারি ভদ্রলোক তার নিজের জায়গায় ফিরে দেখেন সিটের উপর জুতোর বাক্সটা পড়ে আছে। বাক্সটা তুলে ঝাঁকি দিতেই দেখলেন ভারি আছে, জুতো ভেতরে রয়েছে।
ভদ্রলোক বাক্সটা হাতে করে তাড়াতাড়ি ছুটে দোকানের বাইরে গেলেন, কিন্তু ততক্ষণে অনুপমা একটা ট্রামে উঠে গেছে।
একটু খোঁজাখুঁজি করে তারপর ভদ্রলোক দোকানে ফিরে এসে কাউন্টারে গিয়ে পটললালকে বললেন, ম্যানেজারবাবু, এক ভদ্রমহিলা এই জুতোজোড়া ফেলে চলে গেছেন।
ক্যাশমেমো লিখতে লিখতে পটললাল বললেন, উনি নিশ্চয় ফিরে আসবেন। বাক্সটা এখানে রেখে যান।
বাক্সটায় চোখ বুলিয়ে পটললাল দেখলেন, হেমামালিনী হাই হিল। একটু উঁচু হিলের লেডিস পাম্পসু। নতুন স্টাইলের জুতো। পটললাল ভাবতে লাগলেন, একজোড়া জুতো জুলেখার খুব পছন্দ হবে।
০৫.
পটললাল যা আশা করেছিলেন তাই হল। দোকান বন্ধ হওয়া পর্যন্ত জুতোজোড়া নিতে কেউই এল না। কেই বা আসবে।
আটটার সময় সব কর্মচারী বেরিয়ে গেলে দোকান বন্ধ করে পটললাল বেরোলেন, তার বগলে অনুপমার পরিত্যক্ত জুতোর বাক্স। আজ এটা উপহার দিয়েই জুলেখার সঙ্গে সন্ধির চেষ্টা করতে হবে।
বাড়ি ফিরে জুলেখার শ্রীচরণে জুতোর বাক্সটি রেখে প্রণিপাত হলেন পটললাল। অত্যন্ত অবহেলা সহকারে জুতোর বাক্সটা খুললেন জুলেখা দেবী। ভিতর থেকে বেরোল সেই ছেঁড়া। পুরোনো চটিজোড়া।
এর পরের কাহিনি আর কহতব্য নয়, শুধু এটুকু বলি, অনুপমা পুরোনো চটি জোড়া ফেলে না দিলেও পারত। একটু পুরনো হলেও খুব শক্ত, মজবুত চটিজোড়া।
পটললালকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন, তিনি হলফ করে বলবেন, এমন মজবুত চটি সচরাচর দেখা যায় না।
চলন্তিকা
অকৃতজ্ঞ এবং কৃতঘ্ন শব্দ দুটির অর্থ একই কিনা, সে বিষয়ে শোভনলালবাবুর মনে একটু সন্দেহ আছে।
কিন্তু সন্দেহ নিরসনের কোনও উপায় এই মুহূর্তে তাঁর হাতে নেই। বাংলা অভিধানটা গত সপ্তাহেই নির্মলা দেবী নিয়ে গেছেন, বলেছিলেন পরের দিন সকাল হতে-না-হতে ফেরত দিয়ে যাবেন, দেননি।
কেউ কথা রাখেনি। নির্মলা দেবীও কথা রাখেননি। এই সপ্তাহের মধ্যে একদিন বাজারে, দুদিন বাসস্ট্যান্ডে নির্মলা দেবীর সঙ্গে শোভনলালবাবুর দেখা হয়েছে। তাকে দেখে নির্মলা দেবী চোখের কোনায়, ঠোঁটের প্রান্তে মৃদু, অভ্যস্ত হাসি হেসেছেন। কিন্তু অভিধান নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করেননি।
শুধু নির্মলা দেবীর কাছে নয়, অনেকের কাছেই অনেক কিছু পাওনা আছে শোভনলালবাবুর।
হিসেব করতে গেলে লম্বা ফিরিস্তি হয়ে যাবে। সব মনে পড়বে না। এত মনে থাকে নাকি কারও।
আর মনে থেকেই বা কী লাভ? একবার কোনও জিনিস হাতছাড়া হলে যতই মনে করে তাগাদা দেওয়া যাক, সে কি আর সহজে ফেরত পাওয়া যায়। আসল কথা হল, সহজে বা কঠিনে, কোনওভাবেই ফেরত পাওয়া যায় না।
এর যে ব্যতিক্রম নেই তা অবশ্য নয়।
এই তো এগারো নম্বর বাড়ির ছোট নাতনিটার হঠাৎ জ্বর হয়েছে। আড়াই বছরের টগবগে, ছিমছাম মেয়েটা, নামটাও সুন্দর, মাছের নামে নাম মৌরলা। ঝলমল করে খেলে বেড়ায় শোভনলাল চক্রবর্তীর বাড়ির সামনের রাস্তায়, পাশের ছোট পার্কে। সেই মেয়েটা জ্বরে পড়তে তার মা নমিতা এসে শোভনলালবাবুর থার্মোমিটার ধার নিয়ে গেল। পুরনো দিনের হিকস কোম্পানির অতি বিশ্বস্ত থার্মোমিটার। নমিতা এসে মেয়ের জ্বরের কথা বলে থার্মোমিটারটা চাইতে, বিশেষ করে মৌরলার কথা মনে করে শোভনলালবাবু তাকে থার্মোমিটারটা দিয়ে বললেন, সাবধানে ব্যবহার করবে। খুব পুরনো জিনিস।
