এই স্বভাবটা অনুপমা পেয়েছে তার ঠাকুমার কাছ থেকে। সম্প্রতি পরলোকগত সেই বৃদ্ধা দিনের মধ্যে অর্ধেক সময় পুজোর ঘরে কাটাতেন। বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরোলে দুধারে যত মন্দির-বিগ্রহ আছে, এমনকী আশেপাশের গলির ভিতরে সমস্ত ঠাকুর দেবতাকে হাঁটুমুড়ে প্রণাম করে তবে পথ পেরোতেন। ঠনঠনের বাড়ি থেকে হেদুয়া পর্যন্ত সামান্য পথটুকু পায়ে হেঁটে পেরোতে দেড় ঘণ্টা দু ঘণ্টা লেগে যেত।
অনুপমার পক্ষে অবশ্য অতটা সম্ভব নয়। টালিগঞ্জে তার শ্বশুরবাড়ি, হাতিবাগানে একটা মেয়েদের স্কুলে সে পড়ায়। শ্বশুরবাড়ি, স্বামী, সংসার এসব সামাল দিয়ে, স্কুলে পড়িয়ে তারপরে পুজোর ঘরে বেশি সময় কাটানো সম্ভব হয় না। তবে পথেঘাটে ঠাকুর-দেবতা পড়লে হাঁটুমুড়ে সম্ভব হলেও করজোড়ে সে প্রণাম জানাতে ভোলে না।
সেদিন কী একটা কারণে স্কুল একটু আগে ছুটি হয়ে যাওয়ায় অনুপমা ভাবল ঠনঠনেতে বাপের বাড়ি থেকে একটু ঘুরে যাবে। ঠাকুমা মারা গেছেন বটে, তবে মা বাবা আছে। এক ছোট ভাই আছে, তাকে অবশ্য এ সময়ে পাওয়া যাবে না, তবে মা-বাবাকে পাওয়া যাবে। হঠাৎ হঠাৎ বিনা নোটিশে গেলে মা-বাবা খুবই খুশি হন।
সেদিনও তাই হল। মা-বাবার সঙ্গে চারটে পর্যন্ত গল্পগুজব করে, চা-জলখাবার খেয়ে তারপর ঠাকুমার পুজোর ঘরে একবার প্রণাম করে অনুপমা বাপের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। বাবা বাসরাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসছিলেন, কিন্তু সে বাধা দিল, আমি ঠনঠনেতে একটা প্রণাম করে, সামনে থেকে একটা ট্রাম ধরে নেব। তোমাকে আসতে হবে না।
ঠনঠনের মন্দির অনুপমার আজন্ম পরিচিত, ঠনঠনের কালীর প্রতি তার অচলা ভক্তি। এখন এই বিকেলের দিকে সন্ধ্যার একটু আগে মন্দিরটা একটু ফাঁকা থাকে।
ঠনঠনের মা কালীর সিঁড়ির সামনে যেখানে হাঁড়িকাঠ রয়েছে তার একপাশে হাঁটুমুড়ে বসে পরম ভক্তিভরে অনুপমা প্রণাম করল।
প্রণাম করার আগে পায়ের চটিজোড়া খুলে অনুপমা নিজের পিছনে রেখে দিল, প্রণাম সেরে উঠে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে তার চটিজোড়া নেই। তবুও অনুপমা এদিক ওদিকে একটু তাকিয়ে দেখল, না, আশপাশে কোথাও নেই।
তার মানে চটিজোড়া গেছে। কেউ নিয়ে গেছে।
জ্ঞান হওয়া অবধি এই মন্দিরে অনুপমা আসছে। অনেকের কাছেই শুনেছে, মন্দিরে জুতো যায়। কিন্তু তার নিজের চটিজোড়াই যে চুরি যাবে এমন সে কখনও ভাবেনি।
কিন্তু এখন কী করবে? অনুপমা নির্বোধ নয়, সে জানে চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করে কোনও লাভ হবে না, বরং লোকসানো হবে। জুতোর হদিশ পাওয়া যাবে না।
খালিপায়ে এই উত্তর কলকাতা থেকে টালিগঞ্জ যাওয়া নিরাপদ নয়। ভিড়ের ট্রামে-বাসে লোকেরা পা মাড়িয়ে দেবে।
অবশ্য একটু দূরেই জুতোর বাজার। সেখানে হেঁটে গিয়ে একজোড়া চটি কেনা যায়, কিন্তু খালিপায়ে জুতোর দোকানে যাওয়া কেমন দেখাবে?
অনেক ভেবেচিন্তে অনুপমা আবার বাপের বাড়িতে ফিরে গেল। বাবা-মা অবাক হলেন, সে কী? কী হল?
অনুপমা কালীমন্দিরে জুতোচুরির কথা বলে ভিতরের বারান্দায় জুতোর র্যাকে পুরনো চটি খুঁজতে গেল। বিয়ের চার বছর আগেকার একজোড়া পুরনো চটি সে খুঁজে পেল। পুরনো হিল ক্ষয়ে যাওয়া চটি, ধুলো ময়লা জমেছে, এতদিন অব্যবহারে দুমড়ে মুচড়ে গেছে। সেই চটিজোড়াই জুতোর বুরুশ দিয়ে একটু ঝেড়েমুছে অনুপমা পায়ে দিল।
একটু শক্ত শক্ত লাগছে, মা জিজ্ঞাসা করলেন, এটা পায়ে দিয়ে হাঁটতে পারবি তো?
অনুপমা বলল, সামনের জুতোর দোকানে গিয়ে একজোড়া চটি কিনে নেব।
বাবা বললেন, তোর কাছে টাকা আছে?
অনুপমা বলল, তা আছে। তোমাকে এত ভাবতে হবে না।
তথাপি দেরাজ খুলে বাবা তিনটে একশো টাকার নোট মেয়ের হাতে দিয়ে বললেন, এ টাকাটা রাখ।
অনুপমা টাকাটা নিয়ে নিল, সে বুঝল নিজের এলাকার মন্দিরের জুতোচুরির খেসারত বুড়ো বাবা দিচ্ছেন। মেয়ের বাবাকে এরকম কত খেসারতই তো দিতে হয়!
০৪.
অনুপমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গলির মোড় পেরিয়ে একটু বাঁদিকে হাঁটলে পরপর অনেকগুলো জুতোর দোকান।
সেই জুতোর দোকানগুলোর প্রথম সারিতে রয়েছে সেই ফ্রি-ফ্রি-ফ্রি দোকান, যে দোকানে একপাটি জুতো কিনলে আরেকপাটি ফ্রি। যে দোকানের ম্যানেজার আমাদের পটললাল।
একপাটি জুতো কিনলে তবে আরেকপাটি ফ্রি। হাসি পেল অনুপমার। সে মোটেই বোকা নয়, সে এসব বিজ্ঞাপনি ফাজলামি ভালই বোঝে।
কিন্তু বিশাল কাপড়ের ব্যানারের নীচে পৌঁছে নিজের অজান্তেই দোকানটায় ঢুকে গেল। হাজার। হোক বিজ্ঞাপনের একটা টান আছে, তা ছাড়া দোকানটিও বেশ চালু।
দোকানের মধ্যে কয়েকজন খদ্দের, চার-পাঁচজন কর্মচারী, বেশ ভিড়ই বলা যায়। জুতোর স্টকও ভালই, ঘরের একপ্রান্তে কাউন্টার, সেখানে ক্যাশিয়ার কাম ম্যানেজার পটললাল বসে রয়েছেন।
পটললাল সাধারণত হাসিখুশিই থাকেন, কিন্তু আজ যেন মুখটা একটু ভার ভার।
অবশ্য এর একটা কারণ আছে। পটললাল একজন নির্যাতিত স্বামী, তার স্ত্রী জুলেখার হাতে তিনি প্রায় নিয়মিতই তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে নিগৃহীত হন।
জুলেখা দেবী স্থূলাঙ্গিনী হলেও অতি ক্ষিপ্রহস্তা। শুধু হস্তই? তাঁর হাত-পা দুই-ই খুব ভাল চলে। প্রয়োজন হলেই তিনি স্বামী দেবতাকে ধোলাই দেন।
পটললালও অবশ্য খুব সুবিধার লোক নন। তাঁর প্রধান দোষ হাতটান। এই জুতোর দোকানের মালিকের অনুপস্থিতিতে তিনি ক্যাশ থেকে বেশ কিছু টাকা সরিয়েছেন। পটললালের জুয়ো খেলার পুরনো অভ্যাস, সেই জুয়ো খেলেই টাকাগুলো গচ্চা গেছে।
