আমি রুদ্ধ নিশ্বাসে শুনছিলাম, বললাম, তারপর!
তারপর আর কী, লোকটা বলে চলল, ঘুগনি বেচবার পর যেটুকু লেগে রইল থালায়, ওই তেল, মশলা, ডালের গুঁড়ো মতো কাদা কাদা, সেটা আর নষ্ট করে লাভ কী, একটা কৌটায় ভরে পরের দিন ওইগুলো নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রং-মিস্ত্রি হয়ে। আপনার বাড়িতেই তো রং করে দিয়ে এলাম।
অ্যা বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে উঠল আমার চোখ। কিন্তু বেশি বিস্মিত হবার আর সময় নেই। কাঁধের উপর ছেলে এতক্ষণে চঞ্চল হয়ে উঠেছে। তদুপরি স্ত্রী-কেও কাছাকাছি দেখছি না। তিনি যে ইতিমধ্যে কোথায় গেলেন?
যাই হোক, আমার আর একটি প্রশ্নই বাকি ছিল। এইবার জিজ্ঞাসা করলাম, ওই বাটিকের ছাপা কাপড় কোথায় পেলে?
লোকটা হাসল, কোথায় আর পাব? আপনারাই তো দিলেন। সেই যে ছেঁড়া ধুতি দিলেন জানলায় রং লাগানোর জন্য।
ছেঁড়া ধুতি? আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।
হ্যাঁ, সেটাই রং লাগানো হয়ে গেলে রোদে শুকিয়ে তিন টুকরো করে বেচে দিলাম।তাড়াতাড়ি জবাব শেষ করে লোকটা আবার হাঁটা শুরু করল।
আমাকেও ফিরতে হবে। কিন্তু কী একটা খটকা যেন রয়ে গেল কোথায়? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ইতস্তত করতে লাগলাম।
এমন সময় লোকটা নিজেই কেন যেন ফিরে এল। এসে আমাকে বলল, দেখুন বাবু, আমার নাম বেনারসীপ্রসাদ নয়, আসলে আমার নাম ভজুয়া।
এই স্বীকারোক্তিতে আমি অবাক হলাম, বললাম, তাহলে বেনারসীপ্রসাদ বললে কেন?
লোকটা হেসে বলল, তখন কাপড় বেচছিলাম কিনা।
এইবার সব আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল। যখন কাপড় বেচে তখন বেনারসীপ্রসাদ, যখন রং লাগায় তখন ফাগুলাল, যখন চানাচুর বেচে তখন চানামোহন, যখন ঘুগনি বেচে তখন? কী জানি?
না জানলাম। আমার আর জানবার প্রয়োজন নেই।
দূরে ভজুয়া হেঁটে যাচ্ছে। ভজুয়া মানে বেনারসীপ্রসাদ, মানে ফাগুলাল, মানে চানামোহন।
আমি আবিষ্টের মতো, অভিভূতের মতো তার চলার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
চর্মন্তুদ অথবা জুতো ও পটললাল
০১.
গল্পটায় সবে হাত দিয়েছি। মূর্তিমান গঙ্গারাম এসে হাজির। নাম দেখেই সে চটে গেল। আমার উপরে রাগারাগি করতে লাগল, এই জন্য আপনার কিছু হল না। কোনওদিন একটা প্রাইজ পর্যন্ত পেলেন না।
আমি গঙ্গারামকে বোঝাতে গেলাম, প্রাইজ পাইনি সে কথা ঠিক নয়, দু-একটা ছোটখাটো প্রাইজ অবশ্যই পেয়েছি, আর বড় প্রাইজগুলো নোবেল, পুলিতজার, জ্ঞানপীঠ….
আমাকে কথা শেষ করতে দিল না গঙ্গারাম। থামিয়ে দিয়ে বলল, ওসব কথা বাদ দিন, গল্পটার নাম বদলে ফেলুন। জুতো নামে কোনও গল্প কেউ গুরুত্ব দিয়ে পড়বে?
অসহায়ের মতো আমি প্রশ্ন করি, কী নাম দেব?
একটু ভেবে নিয়ে গঙ্গারাম বলল, নাম দিন চর্মন্তুদ।
আমি বিস্মিত, চর্মন্তুদ আবার কী?
গঙ্গারাম আমাকে ব্যাকরণ বোঝাল। মর্ম থেকে যেমন মর্মন্তুদ, চর্ম থেকে তেমনি চর্মন্তুদ।
গঙ্গারামের কথাটা হাস্যকর শোনালেও, সে আমার একমাত্র অনুগত ক্যাডার, বশংবদ এবং হিতাকাঙ্ক্ষী। তার কথা ফেলতেও পারি না। ফলে এই গল্পের নামটা বড় খটমটে হয়ে গেল।
০২.
এবার গল্পটা শুরু করি।
আবার পটললালের গল্প।
.
এককালে ছিল বিয়ে করলে বউয়ের সঙ্গে শ্যালিকা ফ্রি। এক কুড়ি কই মাছ কিনলে সঙ্গে পাঁচ-ছয়টা ফ্রি। গ্রামে-গঞ্জে বলত ফাউ। আজকাল অনেককিছুই ফ্রি। একটা টুথপেস্ট কিনলে একটা। সাবান ফ্রি। দুটো শার্ট কিনলে একটা শার্ট বিনামূল্যে। আর অরেঞ্জ স্কোয়াশ কিনলে গেলাস, কফির কৌটো কিনলে চিনেমাটির রঙিন মগ ফ্রি।
একবার তো এক দোকানে হইহই গোলমাল, এক ভদ্রমহিলা বিজ্ঞাপন দেখে একটা বিশেষ ব্র্যান্ডের রান্নার তেল কিনতে এসেছেন। বিজ্ঞাপনে বলা রয়েছে কোলেস্টেরল ফ্রি-মহিলা বিজ্ঞাপন অনুসারে দাবি করছেন, কোলেস্টেরল দিন, এক বোতল তেলের সঙ্গে কোলেস্টেরল ফ্রি পাওয়া যাবে বিজ্ঞাপনে বলেছে, আপনারা দিচ্ছেন না কেন?
কিন্তু এসব কিছুর মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে উত্তর কলকাতার একটি পাদুকা ভাণ্ডার অর্থাৎ জুতোর দোকান।
এই দোকানের সামনে বিশাল ব্যানারে লেখা আছে:
ফ্রি। ফ্রি। ফ্রি।
ফ্রি-ফ্রি-ফ্রি লেখা আছে টগবগে বিশাল রক্তক্ষরে, তার নীচে খুবই ছোট হরফে হালকা হলুদ রং-এ লেখা:
বাম-ডান
যে কোনও পায়ের
এক পাটি জুতো কিনলে
অন্য পায়ের জুতো
ফ্রি।
বলা বাহুল্য এই শেষ ফ্রি উপরের মতো বিশাল রক্তাক্ষরে লেখা।
.
এই দোকানটির নাম জুতসই।
দোকানের ম্যানেজার পটললাল পাল। আপনাদের মধ্যে যাঁদের পটললালবাবু সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই তাদের জন্য ছোট করে পটললালবাবুর কথা জানাচ্ছি
শ্রীযুক্ত পটললাল পাল একদা যাত্রা-থিয়েটারের লাইনে ছিলেন, সিনেমা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। তিনি কোনও অভিনেতা, শিল্পী ইত্যাদি ছিলেন না, ভদ্রভাবে বলা যায় তিনি একজন সহকারী ছিলেন, যাকে টালিগঞ্জের ভাষায় সাধারণত টাউট বলা হয়।
তবে পটলবাবুর একটা প্লাস পয়েন্ট আছে। তিনি বিখ্যাত মঞ্চ অভিনেত্রী নৃত্যপটীয়সী শ্ৰীযুক্তা মিস জুলেখার শেষতম স্বামী। অত্যন্ত স্কুলাকৃতি হয়ে যাওয়ায় মিস জুলেখা অবশ্য আজকাল আর অভিনয় করেন না, নাচতে তো একেবারেই পারেন না। এক পাক ঘুরেই হাঁফিয়ে ওঠেন, ঘামতে থাকেন।
০৩.
অনুপমার দেব-দ্বিজে খুব ভক্তি। একালে এমন দেখা যায় না।
অনুপমা নিজে কায়স্থ কন্যা, বিবাহসূত্রে ব্রাহ্মণী হয়েছে, ব্রাহ্মণ-ঘরণী। ফলে বিবাহোত্তর জীবনে দ্বিজভক্তি সাধারণভাবেই অনেকটা কমে গেছে, তবে এখনও দেবভক্তি প্রচুর।
