বিমূঢ় ছেলেটিকে উদ্ধার করতেই মেয়েটি এবার কথা বলল, হ্যাঁ, কিন্তু তাই কী হল?
আপনারা দোতলায় পাঁচ নম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন? উকিলের মতো জেরা সদাব্রতর।
হ্যাঁ, খুবই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল মানু। ছেলেটি কোনও কথাই বলছে না।
হ্যাঁ, প্রায় ভেংচে ওঠেন সদাব্রত, আমি থাকি ছয় নম্বর ফ্ল্যাটে, আপনার পাশের ফ্ল্যাটে বিড়বিড় করতে থাকেন তিনি। তারপরেই আবার বিস্ফোরণ, আপনার ওই খাঁচায় পাখি আছে,কী পাখি ও দুটো ঘুঘু পাখি?
এই সময় খাঁচার মধ্য থেকে পাখি দুটো ডেকে উঠল, ঘু-উ-উ-উ, ঘু-উ-উ-উ, ঘু-উ এবং সঙ্গে সঙ্গে সদাব্রত অজ্ঞান হয়ে গেলেন। মানু পাশেই দাঁড়িয়েছিল, মাটিতে পড়তে দিল না, দু হাত দিয়ে জাপটে ধরল সদাব্রতকে।
যখন জ্ঞান ফিরল সদাব্রত দেখলেন তিনি নিজের ফ্ল্যাটে বিছানায় শুয়ে আছেন। ফ্ল্যাট বাড়িটাতে আগুন লাগতে পারেনি, তার আগেই রঙের ফ্যাক্টরিটার আগুন দমকলের লোকেরা নিবিয়ে ফেলেছে। তখন ভোর হয়ে আসছে, জানলা দিয়ে ফিকে আলো, একটু হিম হিম বাতাস আসছে। মাথার কাছে একটা চাদর থাকে সেটা টানতে গিয়ে কার গায়ে হাত লাগল, তিনি উঠে বসলেন। মাথার বালিশের পাশে খাটের গায়ে হেলান দিয়ে মানু বসে রয়েছে, একটু দূরে ছেলেটি। মানু বোধ হয় সারারাত্রিই তার পাশে বসেছিল। এখন ঘুমে চোখ জড়ানো ছেলেটি সিগারেট খাচ্ছিল। তাঁকে উঠতে দেখে সিগারেটটা জানলা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে দিল।
মানু প্রথম কথা বলল, এখন কেমন বোধ হচ্ছে?
ভাল। সদাব্রতর এখন ভালই লাগছিল।
আমরা খুব চিন্তায় পড়েছিলাম। মানু বলল, ছেলেটি চুপ করে আছে।
আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম বুঝি? সদাব্রত জিজ্ঞাসা করলেন।
হ্যাঁ, ঘুঘুটা খাঁচায় ডেকে উঠল আর আপনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন। এতবড় আগুন লাগল, এত দৌড়োদৌড়ি, ছুটোছুটি, তারপর সামান্য ঘুঘুর ডাক শুনে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন? মানু হাসতে হাসতেই প্রশ্ন করল।
সদাব্রত ম্লান হাসলেন, রিটায়ার করার পর থেকে একলা এই ফ্ল্যাটে আছি। যখন-তখন ঘরে বসে ঘুঘুর ডাক শুনি। আমি কি আর ভাবতে পেরেছি আমার পাশের ফ্ল্যাটে কেউ ঘুঘু পোষে! আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে বলে আমি মাথার চিকিৎসা করছি, তিন বছর ইলেকট্রিক শক নিচ্ছি, এই ঘুঘুর ডাক মাথার মধ্যে শুনতে পাই বলে।
মানু অত্যন্ত লজ্জিত মুখে ছেলেটির দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে তারপর বলল, দেখুন কী কাণ্ড। ওঁর যত সব উদ্ভট শখ। ঘুঘু পাখি, নাগকেশর ফুল। আমিও একদিন পাগল হয়ে যাব।
সদাব্রত যুবকটির বর্তমান অসহায়, অপ্রস্তুত অবস্থা অনুমান করে কিঞ্চিৎ সহানুভূতিশীল হওয়ার চেষ্টা করলেন। এর সঙ্গে একটু আলাপ করা যাক। মেয়েটির নাম মানু, বেশ নাম, কিন্তু এর নাম কী? ছেলেটিকে বললেন, আচ্ছা, আপনাকে…
কথা শেষ করতে হল না। তার আগেই ছেলেটি মুখ খুলল। সেই মুখস্থ উত্তরমালার বহু পরিচিত মুখভঙ্গি। আবার সেই ধানবাদ স্টেশনের স্টেশন মাস্টার, সেই একেবারে অমিল চেহারার ছোড়দা।
ভাগ্যিস, এই সময়ে দুটো ঘুঘু ডেকে উঠল, ঘু-উ, ঘু-উ, ঘু-উ-উ, ঘু-উ। সদাব্রত বেশ জোরে মাথায় একটা ঝাঁকি দিলেন; না, মাথার মধ্যে নয়।
চতুরঙ্গ
আমার জীবনে ভীষণ সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমি একটা লোকের হাত কিছুতেই এড়াতে পারছি না।
অথচ লোকটা আমার কেউ নয়। আত্মীয় নয়, বন্ধু নয়, কখনও কিছু ছিল না। এই লোকটার কাছে আমার কোনও ধারদেনা নেই, লোকটারও নেই আমার কাছে। ধারের কথায় বলি, একবার এক কাবুলি ভদ্রলোকের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়েছিলাম কিন্তু তিনিও আমার পিছনে এমন করে লাগেননি।
উত্তমর্ণ ছাড়া এমনভাবে পিছনে লেগে থাকতে পারে ইন্সিওরেন্সের দালাল, বিয়ের ঘটক কিংবা পুলিশের ফেউ।
কিন্তু এই লোকটা আমার সম্মুখে একেক সময় একেক ছদ্মবেশে দেখা দিচ্ছে। আজ পর্যন্ত কোনও ইনসিওরেন্সের দালাল ছদ্মবেশে আক্রমণ করেছে শুনিনি। অনেকে আত্মীয় কিংবা বন্ধুর বেশে আসে বটে। একেবারে ছদ্মবেশী দালাল, যতদূর মনে হয় অসম্ভব।
বিয়ের ঘটক? কিন্তু বিয়ের ঘটক আমার কী করবে? গৃহে আমার নবীনা স্ত্রী, দুর্দান্ত পুত্র। হিন্দু কোড বিল পাশ হওয়ার পরে কি আর বিয়ের ঘটকেরা বিবাহিত ব্যক্তির অনুসরণ করে?
তা হলে বাকি থাকে পুলিশের স্পাই। পুলিশ কী জন্যে? আমি অতি নিরীহ সাদাসিধে মানুষ। সজনের ডাটা চুষে, বউয়ের শাড়ি ইস্ত্রি করে, সস্তা সিগারেট খেয়ে, গলা ব্যথা হলে নুন জল দিয়ে গার্গল করে নেহাত গোবেচারার মতো বেঁচে আছি। কোনও বেআইনি কিছু করি এমন সাহস নেই। একবার একটা অন্ধ ভিখিরির থালায় একটা অচল সিকি দিয়ে বিশ পয়সা তুলে নিয়েছিলাম, জ্ঞানত এই হল সবচেয়ে বড় পাপ কাজ। কিন্তু সেই জন্যে পুলিশ আমাকে ওয়াচ করতে যাবে কেন?
কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। এ বড়ই বিপদ হয়েছে আমার।
লোকটাকে প্রথম দেখি হাজরা পার্কের সামনে।
একটু আগে বলেছি আমার একটি পুত্রসন্তান আছে। সে সদ্য কথা বলতে শিখছে। প্রথমেই যে পাঁচ-সাতটি শব্দ সে উচ্চারণ করতে শেখে তার মধ্যে একটি হল বাবা এবং অন্য একটি ট্যাক্সি। এই শব্দ দুটি সে অধিকাংশ সময়েই একত্রে উচ্চারণ করে।
বাবা, ট্যাক্সি, তার এই শব্দ দুটির একত্রে মানে হল, বাবা, ট্যাক্সি ডেকে এনে চড়াও, অথবা বাবা, ট্যাক্সি হও।
