সদাব্রতকে ছেলেটি আঙুল দিয়ে দেখাল, রাধাচূড়া গাছের ডালে একটা পরগাছা, তাতে সাদা ধবধবে একগুচ্ছ ফুল ফুটেছে। সদাব্রত নাগকেশর ফুল চেনেন না, বললেন, এটা নাগকেশর নয়?
আরে না, না। ছেলেটি আবার উত্তেজিত হয়ে উঠল। ফুটপাথে হাঁটু গেড়ে বসে ডান হাতের কবজি বেঁকিয়ে দেখাতে লাগল নাগকেশর ফুল আসলে কীরকম। মানু মেয়েটি তখন পার্কের রেলিঙের উপর লুটিয়ে পড়েছে, সমস্ত শরীর হাসির দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছে। মিনিট কয়েক আগের ব্যাপারটা সদাব্রত কিছুটা অনুধাবন করতে পারলেন। কিন্তু ছেলেটির কি মাথা খারাপ, একে কি কোনও পাগলা গারদে দেখেছি, নাগের বাজারে মানসিক সদনে। না, তাও তো ঠিক মনে হয় না। এই সব ভাবতে ভাবতে সদাব্রত ফিরলেন, তখনও ছেলেটি ফুটপাথে উবু বসে রয়েছে।
পরের দিন আবার শনিবার। এই শনিবার ইলেকট্রিক শক নিতে হয়েছে। ভীষণ যন্ত্রণা, সমস্ত শরীরে ব্যথা, মাথা দপ দপ করছে। যেসব দিনে শক নেন, সদাব্রত সারাদিন মানসিক সদনেই থাকেন, সন্ধ্যার দিকে এই ফ্ল্যাটে ফিরে আসেন। মানসিক সদনে যতক্ষণ ছিলেন বেশ ভালই ছিলেন। কিন্তু ফ্ল্যাটে এসেই অনুভব করলেন সেই পুরনো গোলমালটা, সেই মাথার মধ্যে, না ঘরের মধ্যে, না কোথায় কাছাকাছিও অসহ্য, অসহ্য বোধ হতে লাগল। দুটো বালিশ দিয়ে মাথা চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লেন।
রাত দশটা সাড়ে দশটা নাগাদ ভয়ংকর হই-চই চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল তার। যখন ঘুম ভাঙল, চমকে উঠলেন, সমস্ত ঘর ভরতি আলো। তাড়াতাড়ি উঠে জানলার কাছে দাঁড়াতেই ভীষণ হলকা লাগল গায়ে।
ফ্ল্যাটের লাগোয়া একটা রঙের ফ্যাক্টরি, সেটা দাউ দাউ করে জ্বলছে। বাতাসের ঝাপটায় আগুন ফুঁসে ফুঁসে এই ফ্ল্যাট বাড়িটার গায়ে একটা করে ঝাপটা দিচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে দুমদাম সবাই ছুটে নামছে। সদাব্রত মিনিটখানেক হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললেন, সামনেই সিঁড়ি–এত বড় ফ্ল্যাট বাড়িটার সমস্ত লোক একসঙ্গে নামার চেষ্টা করছে। তাও খালি হাতে নয়। যে যার মূল্যবান জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে নিয়েছে। কারও হাতে পুঁটলি, কারও মাথায় ট্রাঙ্ক। সদাব্রতবাবু একবার ভাবলেন; তারপর আর ঘরের দিকে ফিরলেন না, যা হয় হবে, আগুনে যদি সব পুড়েই যায়, কিছু বাঁচানোর চেষ্টা না করাই ভাল। সকলের সঙ্গে তিনিও সিঁড়ি ধরে নামতে লাগলেন।
নিরাপদ ব্যবধানে সবাই উলটোদিকের ফুটপাথে গিয়ে দাঁড়াল। এরই মধ্যে কেউ কেউ ভয়ংকর কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। অবশ্য খোঁজ নিয়ে জানা গেল বাড়ির মধ্যে ঠিক কেউ আটকে যায়নি। আর আগুনও এখন পর্যন্ত বাড়িটাকে ধরেনি। রঙের ফ্যাক্টরিটাই জ্বলছে, খুবই দাউ দাউ করে জ্বলছে, বহুদূর পর্যন্ত আলো ছড়িয়ে গেছে, চতুর্দিক থেকে ক্রমাগত লোক দৌড়ে এইদিকে আসছে, আশেপাশে বাড়িগুলির জানলায়, বারান্দায় ছাদে ভিড় জমে গেছে। এই সময় ঘণ্টা দিয়ে দমকল এসে পৌঁছাল। ভীষণ ভিড়ের মধ্যে দমকলের গাড়ি ঢুকতে পারছে না। এমন সময় সেই ছেলেটি হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে এল, এসে ভিড় সরিয়ে দমকলের গাড়ির জায়গা করে দিল। তারপর সদাব্রতর খুব কাছাকাছি এসে কাকে যেন খুঁজতে লাগল, মানু, এই মানু।
সদাব্রত বুঝলেন, সেদিনের সেই মেয়েটিকে ডাকছে। পেছন দিক থেকে চাপা গলা শোনা গেল, কী চেঁচামেচি করছ, এই যে আমি এখানে।
আমার খাঁচা এনেছ, আমার খাঁচা? ছেলেটি ভীষণ ব্যস্ত।
মেয়েটি একটু এগিয়ে এল, গয়নার বাক্স নিয়েই বেরোতে পারি না, আবার খাঁচা! গলার স্বরে একটু তিক্ততা।
আমার খাঁচা। আমার খাঁচা। ছেলেটি পরিত্যক্ত বাড়িটার দিকে ছুট দিল।
এই শোনো, শোনো। মেয়েটি ভীষণ ভয় পেয়ে ওকে ডাকতে লাগল। দু-একজন লোক চেঁচিয়ে উঠল, আরে মশায় পাগল নাকি?
কিন্তু কে কার কথা শোনে। ঊর্ধ্বশ্বাস ছেলেটির পায়ের দুমদাম শব্দ সিঁড়িতে শোনা গেল, উঠল, নামল, তারপর আবার এক ছুটে রাস্তার এই পাশে, একেবারে সদাব্রতর পাশে। দুহাতে দুটি খাঁচা, রাত্রিবেলা বলে বোধহয় পরদা দিয়ে ঢাকা।
এতক্ষণ সদাব্রত সব লক্ষ করছিলেন। এইবার ছেলেটি খাঁচা দুটি সদাব্রতর পায়ের পাশে মাটিতে রেখে হাঁপাতে লাগল। এর মধ্যে মানু নামে মেয়েটিও এগিয়ে ওদের পাশের দিকে চলে এসেছে।
খাঁচার ভিতরে পাখির পাখার ঝটপটানি শোনা গেল। হঠাৎ বিদুৎ চমকের মতো কী একটা কথা সদাব্রতর মনের মধ্যে খেলে গেল। তার হাত-পা থরথর করে কাঁপছে, তিনি একবার ছেলেটির দিকে, একবার খাঁচা দুটির দিকে গভীর সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর হঠাৎই ঝট করে ছেলেটির হাত চেপে ধরলেন। এই যে আপনি…
ঘটনার আকস্মিকতায় ছেলেটি যেন একটু হতভম্বই হয়ে গেছে। সে কী একটা কথা বলার জন্যে হাঁ করল, শুধু আ-আ-আজ্ঞে এইটুকু বলার আগেই সদাব্রত তার হাত ধরে একটা জোরে ঝাঁকুনি দিলেন। এই মুখভঙ্গি, তার ভয়ংকর পরিচিত এবং এর থেকে যে উত্তর বেরিয়ে আসবে তা তার প্রায় মুখস্থ। তিনি প্রায় চিৎকার করেই উঠলেন। না, আপনার দাদাকে আমি কোথাও কখনও দেখিনি। আমি ধানবাদ যাইনি। ভাগলপুর যাইনি। মুঙ্গের যাইনি। জীবনে স্টেশনমাস্টার দেখিনি। উত্তেজনায় সদাব্রতর সারা শরীর কাঁপছে।
ছেলেটি হতচকিত অবস্থায় আবার কী যেন বলার জন্যে হাঁ করল, কিন্তু এবারও সদাব্রত সুযোগ দিলেন না। আপনার ছোড়দা, যার রং খুব ফরসা, স্বাস্থ্য খুব ভাল, তার উপরে বেঁটে, খুবই বেঁটে, যার সঙ্গে আপনার চেহারার একেবারেই মিল নেই, আপনার ভাই বলে মনে হয় না, না–তাকে কোথাও দেখিনি। আপনাকেই দেখেছি। আপনি এই, এই ফ্ল্যাট বাড়িতেই থাকেন?
