আশেপাশের সমস্ত লোকগুলো হো হো করে হেসে উঠল, সদাব্রতবাবুও হাসলেন। লোকটা আরও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।
যুবকটির এই আচরণ এবং কথাবার্তা সবই সদাব্রতবাবুর কেমন যেন চেনাচেনা মনে হল। সদাব্রত একটু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা, আপনাকে কোথায় দেখেছি বলুন তো?
যুবকটি একটু ঘাড় চুলকে বলল, আপনি বোধ হয় আমার বড়দাকে দেখেছেন, আপনি কি কখনও ধানবাদে গেছেন?
সদাব্রতবাবুর এইবার মনে পড়ল এই ছেলেটিকেই মাসখানেক আগে গোলদিঘির কাছে দেখেছিলেন। সেদিনও এই রকম একটা ছোটখাটো দুর্ঘটনা।
কলেজ স্ট্রিট দিয়ে আসছেন, হঠাৎ দেখলেন সমস্ত লোক ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োচ্ছে, যে যেরকম পারে ছুটছে, তিনি কিছু বুঝতে না পেরে সকলের সঙ্গেই দৌড়ে গোলদিঘির মধ্যে ঢুকলেন। এর মধ্যে হাঁপাতে হাঁপাতে এই ছেলেটিও ঢুকল, শার্টের হাতা ছিঁড়ে গিয়েছে, ফুল-প্যান্টের হাঁটুতে কাদা লেগে রয়েছে, হুমড়ি খেয়ে পড়ার চিহ্ন বেশ বোঝা যাচ্ছে, এই মাত্র ধস্তাধস্তি গোছের কিছু হয়েছে। ছেলেটি এসে সদাব্রতবাবুকে সামনে পেয়ে তাকেই জিজ্ঞাসা করল, আপনারা সব এরকম ছুটে পালালেন কেন, আমি কিছু বুঝতে পারলাম না, আমি দেখতে এগুলাম, আমাকে একটা ক্ষ্যাপামতন ষাঁড় তেড়ে এসে গুঁতো দিয়ে ফেলে দিল।
কেন পালিয়েছিলেন ব্যাপারটা এতক্ষণে সদাব্রতবাবুর বোধগম্য হল। খুব বাঁচা গেছে, এই বুড়ো বয়েসে ষাঁড়ের গুঁতো, বাবা, কিন্তু ছেলেটির প্রশ্ন তাকে একটু ভাবিয়ে তুলল। পাশে কয়েকটি মেয়ে দাঁড়িয়েছিল, তারা ফিক করে হেসে ফেলল বোধ হয় প্রশ্নটি শুনেই, তিনি একবার মেয়েদের দিকে তারপর একবার বিধ্বস্ত ছেলেটির দিকে তাকালেন। তখনই তার কেমন চেনা মনে হল, বেশ চেনা চেনা মনে হল ছেলেটিকে, জিজ্ঞাসা করলেন, আপনাকে আগে কোথায় যেন দেখেছি বলুন তো?
যুবকটি বলল, আপনি বোধহয় আমার বড়দাকে দেখেছেন, আপনি কখনও ধানবাদে গেছেন?
সদাব্রত ঘাড় নেড়ে না জানিয়েছিলেন।
তাহলে ভাগলপুর, মুঙ্গের? আমার বড়দা বিহারে স্টেশনমাস্টার, তাকেই দেখেছেন। ছেলেটি পরম বিশ্বাসের সঙ্গে বলল।
কিন্তু সদাব্রতবাবু দেওঘর ছাড়া বিহারে আর কোথাও কোনও দিনই যাননি। তার এও স্পষ্ট ধারণা এই যে, এই ছেলেটিকেই তিনি বহুবার কোথাও দেখেছেন, মাথাটা ঠিক নেই, না হলে ঠিক মনে করা যেত।
ছেলেটি যখন জানতে পারল সদাব্রতবাবু তার বড়দাকে কোথাও দেখেনি বরং তাকেই কোথাও দেখেছেন বলে মনে করছেন, বলল; তাহলে আপনি আমার ছোড়দাকে খুব সম্ভব দেখেছেন! অবশ্য ছোড়দাকে দেখলে আমার ভাই বলে চেনা কঠিন। তার রং খুব ফরসা, স্বাস্থ্য ভাল তার ওপরে বেঁটে, খুবই বেঁটে। আমার সঙ্গে তার চেহারার কোনও মিলই নেই।
যুবকটির এই ধরনের অর্থহীন, অসংলগ্ন আত্মপরিচয়ে সদাব্রত সেদিন খুব বিব্রত বোধ করেছিলেন। যথেষ্ট অবাকও হয়েছিলেন, আজও তাই হলেন। এর কথার কোনও মাথামুণ্ডু ধরা যায় না। এর ছোড়দার সঙ্গে যদি এর চেহারার একেবারে কোনও মিলই না থাকে তবে একে দেখে এর ছোড়দার কথা মনে পড়তে পারে কী করে?
এর মধ্যে ছেলেটি দুই হাত ছড়িয়ে রাস্তার মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে একটা মিটার ডাউন ট্যাক্সি ফাঁকা যাচ্ছিল দেখে সেটা আটকাল, তারপর ড্রাইভারের সঙ্গে একচোট বচসা এবং জোর করেই একরকম ট্যাক্সির মধ্যে উঠে বসল। উঠে সদাব্রতকে ডাকল, আসুন আপনি তো ওই দিকেই বোধহয় যাবেন। আপনাকে শ্যামবাজারে নামিয়ে দিয়ে যাব।
সদাব্রত খুব খুশিই হলেন, ছেলেটা ভালই বলতে হবে। একবার শ্যামবাজার পৌঁছালে সেখান থেকে যা তোক গাড়ি-টাড়ি একটা ধরা যাবে।
ট্যাক্সিতে বসে ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কতদূর যাবেন?
এই এন্টালির কাছে। আপনি?
আমিও তো এন্টালির দিকেই যাব। ঠিক আছে একসঙ্গেই যাওয়া যাবে। সদাব্রত বিশেষ আশ্বস্ত কণ্ঠে বললেন।
এন্টালিতে সি আই টি-র মোড়ে এসে সদাব্রত বললেন, আমার এখানে নামলে হবে।
ছেলেটি বলল, ঠিক আছে আপনি নামুন, আমিও এখানেই নামতাম। তবে পার্কসার্কাসে একটা কাজ আছে, সেটা সেরে আসি।
ছেলেটি চলে গেল। ট্যাক্সির ভাড়াটা দিতে চাইলেন সদাব্রত, কিন্তু ছেলেটি কিছুতেই নিল না। সদাব্রত ঘরে ফিরতে ফিরতে ভাবতে লাগলেন, ছেলেটিকে কোথায় দেখেছি?
এর পরেও সদাব্রত ছেলেটিকে একাধিকবার এদিকে ওদিকে এই পাড়াতেই দেখতে পেলেন। সেই সব অসংলগ্ন উত্তরমালার কথা ভেবে বিশেষ ভরসা পেলেন না আলাপ করবার। একটু এড়িয়েই চললেন। কিন্তু ছেলেটির ব্যাপার-স্যাপার কীরকম যেন। এরই মধ্যে একদিন সন্ধ্যার দিকে সদাব্রত রাস্তায় একটু পায়চারি করছেন, পার্কের পাশের রাস্তা, পার্কের ধারে রাস্তা ঘেঁষে একটা বড় রাধাচূড়া ফুলের গাছ, সেইখানে ফুটপাথের ওপরে একটা হাঁটু গেড়ে ছেলেটা উবু হয়ে বসে ডান হাতের কবজি গোলমতন করে কী যেন দেখাচ্ছে। পাশে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে, মেয়েটি মৃদু মৃদু হাসছে। এই সময় সদাব্রত মুখোমুখি পড়ে গেলেন, এড়ানো গেল না; তার উপরে একটু কৌতূহলও ছিল। ছেলেটি সদাব্রতকে দেখে একটু অপ্রস্তুত অবস্থাতেই যেন উঠে দাঁড়াল। সদাব্রত জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার?
আজ্ঞে, ও মানে মানু বলছিল, ছেলেটি মেয়েটার দিকে তাকাল, মানু নামে মেয়েটি তখন মুখ পার্কের দিকে ফিরিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ চাপা দিয়েছে, ছেলেটি বলে চলল, ও বলছিল, এটা নাগকেশরের ফুল।
