গোরু-হওয়া নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কারণ নেই দীনদয়ালবাবুর, সেটাই তাঁর ইচ্ছা। কিন্তু শিগগিরই ডাক্তারের কাছে যেতে হল তাকে অন্য কারণে। পূর্ণ গোরু হওয়ার পর থেকে তার মনে ভীষণ গণ্ডারের ভয় ঢুকেছে, হঠাৎ কখন তেড়ে এসে আক্রমণ করে, সব সময় শঙ্কিত থাকেন। একটা সমাধান অবশ্য তিনি পেয়ে গেছেন, গণ্ডারের উপস্থিতি অনুমান করলেই পা দুটো মেজেতে দ্রুততালে ঠোকেন, জঙ্গলের গোরুরা নাকি গণ্ডারের সামনে ওইরকম করে আর গণ্ডারেরা ভয়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু রাতেই খুব সমস্যা, উনি ঘুমিয়ে পড়লেই খাটের নীচে দলে দলে গণ্ডার ঢুকে যায়, তাদের সমবেত চিৎকারে তার ঘুম ভেঙে যায়, তখন অবশ্য আবার দ্রুত পা ঠোকেন এবং সঙ্গে সঙ্গে পালায়।
ডাক্তার হালদার সব শুনে বললেন, পা ঠুকলে গণ্ডার পালিয়ে যায়, একথা আপনাকে কে বলল?
একবার সশব্দে পা ঠুকে দীনদয়ালবাবু বললেন, দেখছেন না এক চিড়িয়াখানার খাঁচার গণ্ডার কটা পালাতে পারছে না আর বাকিগুলো কোথায় চলে গেছে কলকাতায় দুশো মাইলের মধ্যে এখন কোনও গণ্ডার নেই।
ডাক্তারসাহেব বললেন, তাহলে রাতে কী করে আসে?
রাতে কী করে আসে, কে জানে?
দীনদলায়বাবু বলেন, আমি ঘুমোলেই সাহস পেয়ে যায়, খাটের নীচে পালে পালে ঢুকে পড়ে। ডাক্তার হালদার ব্যর্থ হলেন, খাটের নীচ থেকে গণ্ডার তাড়ানোর যোগ্যতা তার নেই।
কয়েকদিন পরে গড়ের মাঠের সেই জায়গায় আবার দীনদয়ালবাবুকে দেখতে পেলেন ডাক্তার সাহেব। কেমন যেন খুশিখুশি ভাব, বাছুরদের সঙ্গে আহ্লাদে ছুটোছুটি করছেন। ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার দীনদয়ালবাবু?
দীনদয়ালবাবু হেসে বললেন, আর ব্যাপার, সব গণ্ডারদের জব্দ করেছি। তারা আর খাটের তলায় ঢুকতে পারে না।
ডাক্তার অবাক হয়ে বললেন, কী করে?
দীনদয়ালবাবু বললেন, ছুতোর ডেকে খাটের পায়া সম্পূর্ণ হেঁটে দিয়েছি, এখন ব্যাটারা জব্দ, আর নীচে ঢুকতে পারে না।
ঘুঘু কাহিনি
হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তার মোড়ে চলে এলেন সদাব্রতবাবু। অবশ্য মানসিক সদন থেকে এই নাগের বাজারের মোড় খুব কাছে নয়, কিন্তু কী-ই বা করা যাবে। আজ আড়াই বছর এই রকম চলছে। কোনও উন্নতিই হচ্ছে না। সেই রিটায়ার করে যখন প্রথম সরকারি কোয়ার্টার ছেড়ে, সি.আই.টি-র নতুন ফ্ল্যাট বাড়িটাতে এলেন সদাব্রত, তখনই ব্যাপারটার শুরু।
বাড়ি ফিরে ঘরে ঢুকলেই, কারণে অকারণে, দিনেদুপুরে, এমনকী রাত্রিতে ঘুমের মধ্যে পর্যন্ত মাথার মধ্যে, নাকি ঘরের মধ্যে, ঘুঘুর ডাক শুনতে পান সদাব্রতবাবু। কলকাতা শহরের ফ্ল্যাট বাড়িতে ঘরের মধ্যে বিছানায় শুয়ে ঘুঘুর ডাক, মাথা খারাপ হল নাকি আমার?আজ প্রৌঢ় বয়েসে নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ মনে হয় সদাব্রত রায়ের। আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? এও তো আর বলা যায় না কাউকে, যাদের বলা যেত– একটা চাপা নিশ্বাস অবসরপ্রাপ্ত প্রৌঢ়ের বুকের মধ্য থেকে নাক পর্যন্ত ঘোরাফেরা করে।
নিজের থেকেই বন্দোবস্ত করেছেন, প্রত্যেক শনিবার আসতে হয় এখানে, এই মানসিক সদনে, ডাক্তার সান্যালের কাছে চিকিৎসা করান। মাসে একদিন ইলেকট্রিক শক নিচ্ছেন আজ এক বৎসরের বেশি হয়ে গেল। সামনের শনিবার আবার শকের জ্বালা, ভাবতে গিয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। সদাব্রতর, না, আর পারা যায় না।
কিন্তু এই মুহূর্তে একটা ট্যাক্সি চাই। এখন অফিসের সময়। দশটা বাজে, বাসে ওঠা অসম্ভব। কিন্তু ট্যাক্সি তার চেয়েও অসম্ভব। শরীর অস্থির করতে থাকে তার, মাথার মধ্যে সব উলটোপালটা ভাবনা ভিড় করে। যদি একদম ক্ষেপে যেতেই হয়, খুন করে ক্ষেপে যাব, আর তখন ট্যাক্সি চালাব, দেখি কে ধরতে পারে? এই ট্যাক্সি…ছয় বার দৌড়িয়ে ব্যর্থ হলেন সদাব্রতবাবু।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পায়ে ব্যথা হয়ে গেল। ঠিক এই সময় প্রায় একটা দুর্ঘটনা। একটা বাস স্টপে একটুও না থেমে দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছিল, একটা হিন্দুস্থানি মুটে-মজুর গোছের লোক হবে সেই বাস থেকে উলটোদিক মুখ করে ঝাঁপিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে, জীবনপণ করে রাস্তায় ছিটকে পড়ল। বাসের ভেতর থেকে এবং রাস্তার চারপাশ থেকে, দোকানঘরগুলো থেকে লোকজন খুব চেঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল, এই রোককে, রোককে…গেল, গেল…।
বাসটা কিন্তু একটুও থামল না, ভ্রুক্ষেপ না করে চলে গেল। পতিত হতভম্ব লোকটা একটা ডিগবাজি খেয়ে প্রথমেই সদাব্রতবাবুর গায়ের ওপর, তারপর হুমড়ি, হুমড়ির পর হুমড়ি খেয়ে পড়ল রাস্তায়, চরকিবাজি কিন্তু থামল না, আবার উঠে দাঁড়াতেই রাস্তার উপর পড়ে গেল। চলন্ত বাস থেকে উলটোদিক মুখ করে নামলে এই রকমই হয়, নোকটা রাস্তার উপর বেশ কয়েকটা গড়াগড়ি খেল। ভাগ্যিস বিশেষ কোনও জোর আঘাত লাগেনি, কোনও দিক থেকে একটা গাড়ি এসেও চাপা দিতে পারত। সদাব্রতবাবু এতক্ষণ ঠিক লক্ষ করেননি, একটি কালোমতন রোগা লম্বা চেহারার যুবক তার পাশেই বোধ হয় এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। সে-ই ছুটে গিয়ে লোকটাকে ধরে সোজা করে দাঁড়। করিয়ে দিল; লোকটা তখন হাঁফাচ্ছে, ঘটনার আকস্মিকতায় সে একটু হতভম্ব হয়ে গেছে। হঠাৎ সেই যুবকটি হিন্দুস্থানিটির ঘাড়ে একটা ঝাঁকি দিয়ে প্রশ্ন করল, কী, রাস্তাটা ভাঙতে পারলে না?
