রোগীর অবস্থা দেখে হালদার সাহেব সাহসী বোধ করলেন, তিনি সঙ্গীদের কাছ থেকে যতটুকু জানা সম্ভব জেনে নিয়ে সবাইকে বললেন, আপনারা এবার বাইরে যান, আমি দেখছি কী হয়েছে।
সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর তিনি নীল বালবটি জ্বালিয়ে দিলেন, তারপর রোগীর দিকে এগোলেন। রোগী তখনও দুর্বল অবস্থায় চোখ বুজে পড়ে রয়েছে। হালদার সাহেব রোগীর মাথার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার নাম?
দীনদয়ালবাবু ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, হাম্বা হাম্বা।
ডাক্তার সাহেবের এরকম অনেক অভ্যাস আছে, তিনি অদমিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার ঠিকানা?
দীনদয়ালবাবু আবার হাম্বা হাম্বা করলেন।
যেন খুব খুশি হয়েছেন এই রকম ভাব দেখিয়ে হালদার ডাক্তার বললেন, ও বুঝেছি, বুঝেছি; আপনি কোন অফিসে আছেন?
দীনদয়ালবাবুর কণ্ঠে আরেকবার হাম্বা হাম্বা ধ্বনিত হল।
এইবার ডাক্তারসাহেব কায়দা পালটালেন। তিনি বললেন, ও, বুঝতে পেরেছি আপনি গোরু।
প্রশ্নটা শুনে দীনদয়ালবাবু স্থির দৃষ্টিতে এক মিনিট নীল আলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর স্পষ্ট মানুষের ভাষায় বললেন, আজ্ঞে। আবার এক মিনিট নীল আলোর দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন এবং এবার বললেন, হাম্বা হাম্বা।
হালদার সাহেব বুঝলেন ওষুধে কাজ হয়েছে এবং উৎফুল্ল হয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেন, আপনি যে গোরু এটা কবে থেকে বুঝতে পারলেন?
বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে দুবার হাম্বা হাম্বার পর দীনদয়ালবাবু নির্বিকারভাবে বললেন, সেই ছোট বয়সে যখন বাছুর ছিলাম তখন থেকে।
অভিজ্ঞ ডাক্তার বুঝতে পারলেন ব্যাধি কঠিন এবং অনেক গভীরে। সেদিনের মতো বত্রিশ টাকা ফি নিয়ে তিনি দীনদয়ালবাবুকে সামনের সপ্তাহে আবার নিয়ে আসতে বলে সহকর্মীদের হাতে তুলে দিলেন। সহকর্মীরা আবার হই হই করে ট্যাকসি ডেকে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিলেন।
দীনদয়ালবাবু কিন্তু আর ডাক্তারের কাছে গেলেন না; কাশীতে চলে গেলেন।
গোরু-বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জনের জন্য দীনদয়ালবাবু প্রায় তিন মাস কাশীতে রইলেন। কাশীর যেখানে যত গলিকানাগলি আছে, পাড়া-বেপাড়ায়, ঘাটে-মন্দিরে ঘুরে ঘুরে তিনি গোরুদের আচার-আচরণ লক্ষ করতে লাগলেন। যত দেখেন ততই অবাক হয়ে যান এবং নিজের গোরুত্ব সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হন।
কাশী যাওয়ার ফলে অবশ্য দীনদয়ালবাবুর একটা বড় উপকার হল, তিনি হাম্বা হাম্বা করা একেবারেই প্রায় ছেড়ে দিলেন। কারণ তিনি লক্ষ করে দেখলেন, অধিকাংশ গোরুই এবং বিশেষ করে ষাঁড়েরা প্রায় কখনওই ডাকে না। ডাকার ব্যাপারটা মোটামুটি বাছুর এবং বাছুর জননীদের একচেটিয়া। দীনদয়ালবাবু ভালই জানেন, তিনি বাছুর বা বাছুরজননী নন, সুতরাং ডাকাডাকি ছেড়ে দিলেন। এখন শুধু কখনও কালেভদ্রে মনে খুব স্ফূর্তির ভাব এলে নাকটা যথাসাধ্য উলটিয়ে একটু হু-হু করেন।
এ ব্যাপারটা বিশেষ কিছু দোষের নয় এবং আশেপাশের লোকের এতে আপত্তির কোনও কারণ থাকা উচিত নয়। সুতরাং দীনদয়ালবাবু ভাল হয়ে গেছেন।
এর অবশ্য অন্য একটা কারণও ছিল। কাশীতে গোরুদের সঙ্গে দিনের পর দিন মেলামেশা করে তিনি বুঝতে পেরেছেন শারীরিকভাবে তাঁর পক্ষে গোরু হওয়া অসম্ভব। একদিন খড় চিবিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন গলা দিয়ে ঢুকবার আগে জিভ ছড়ে রক্ত বেরিয়ে গেল। আরেকদিন জামাকাপড় ছেড়ে ফেলে চার পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে দশাশ্বমেধ ঘাটের ওখানে ঘুরে বেড়ালেন, কাশীর লোক এরকম জিনিস অনেক দেখেছে। তারা বিশেষ তাকিয়েও দেখল না। কিন্তু দীনদয়ালবাবুর হাঁটুতে, কোমরে তারপর তিনদিন প্রচণ্ড ব্যথা। নানাভাবে ঠেকে তিনি বুঝতে পারলেন এ জন্মে দৈহিক অর্থে গোরুত্বপ্রাপ্তির ইচ্ছা তার পূর্ণ হবে না।
তাই দীনদয়ালবাবু কাশী থেকে ফিরে এসে মনে প্রাণে গোরু হওয়ার সাধনা করতে লাগলেন। আত্মীয়বন্ধুরা কোনও প্রকাশ্য বিকার না দেখে ধরে নিল তিনি ভাল হয়ে গেছেন।
অবশ্য প্রকাশ্য বিকার একেবারে রইল না তা মোটেই নয়। কাশীতীর্থের ভুবনবিখ্যাত গোরুদের সঙ্গে তিন মাস থেকে তিনি চমৎকার গুঁতোনো শিখে এসেছেন। বিশ্বনাথ মন্দিরের কাছে এক চাঁদকপালে মারকুটে ষাঁড়ের কাছেই তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন। ঘাড় বাঁকিয়ে মাথা নিচু করে আচমকা তীব্র বেগে হাটুর নীচে গুতো দিয়ে প্রতিপক্ষকে ফেলে দেয়া তিনি চমৎকার আয়ত্ত করে এসেছেন। প্রতিদিন গভীর রাতে মন্দিরচত্বরে শিং ওঠেনি এমন বাছুরদের সঙ্গে নিয়মিত গুঁতোগুঁতি অভ্যাস করেছেন তিনি।
কলকাতায় ফিরে দীনদয়ালবাবুর প্রধান অসুবিধা হল এই গুঁতোগুঁতির অভ্যাসটা রফা করা নিয়ে। মাঝেমধ্যেই কপালের যে দুটো জায়গায় শিং থাকার কথা সে দুটো জায়গা সুরসুর করে ওঠে। অবশেষে অফিস থেকে ফেরার পথে প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা তিনি গড়ের মাঠে যেতে লাগলেন বাছুরদের সঙ্গে গুঁতোগুতি করবার জন্যে। গড়ের মাঠে গোরু ভেড়া চরাতে নিয়ে আসে অনেক লোক কিন্তু তার মধ্যে বাছুরের সংখ্যা অত্যন্ত কম। একেকদিন এমন হয় একটা বাছুরের খোঁজে তিনমাইল চারমাইল হাঁটতে হয় দীনদয়ালবাবুকে।
সেদিন হঠাৎ, ভাগ্য ভাল, রেডরোডের পাশেই একদঙ্গল বাছুরের দেখা পেয়ে গেলেন তিনি। প্রাণের আনন্দে সেই বাছুরের ভিড়ে নেমে পড়লেন।
হালদার ডাক্তার গাড়ি করে ময়দান দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখেন ধুতিপাঞ্জাবি-পরা এক ভদ্রলোক বাছুরদের সঙ্গে প্রচণ্ড রকম মেলামেশা করছেন। মানসিক ডাক্তার তিনি, খুব কৌতূহল হল, তা ছাড়া লোকটাকে কেমন চেনাচেনা মনে হচ্ছে। গাড়ি থেকে নেমে দেখেন তাঁরই পুরনো রোগী। ডাক্তারসাহেব একটু এগিয়ে মাঠের দিকে যেতেই দীনদয়ালবাবু তাকে চিনতে পেরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন। ডাক্তারসাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, এখানে কী করছেন? দীনদয়ালবাবু নিজের কপালে একটু হাত বুলিয়ে নিয়ে বললেন, দেখছেন না শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢুকেছি। উত্তর শুনে আশ্বস্ত হলেন হালদার ডাক্তার, রোগলক্ষণ এখনও একই আছে, অনেকের সময়ের সঙ্গে অসুখ বদলিয়ে যায়। তার এক রোগী আগে নিজেকে আরশোলা ভাবতেন এখন জেটপ্লেন হয়েছেন। রোগীর অবস্থা দেখে খুশি হয়ে, আসবেন একদিন বলে হালদার ডাক্তার চলে গেলেন।
