ছেলেটি এরপরে বলল, আর তা ছাড়া আজকাল গেঞ্জির সাইজগুলোও ঠিক নয়। চৌত্রিশ সাইজের গেঞ্জির দরকার হলে কিনতে হবে ছত্রিশ। আর আপনার এখন দরকার ছত্রিশ, আপনাকে। কিনতে হবে আটত্রিশ।
আমি অবাক হয়ে ছেলেটির কথা শুনছি, এবার ছেলেটি মোক্ষম কথা বলল, আটত্রিশের জায়গায় এখন যদি আপনি চৌত্রিশ গেঞ্জি গায়ে দেন তাহলে আপনার কানের ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করবে, নাকের ডগা লাল হয়ে উঠবে, চোখ টনটন করবে, মাথা ঘুরবে, দম বন্ধ হয়ে আসবে।
আমি অবাক হয়ে দোকানি ছেলেটির কথা শুনছি। সমস্ত লক্ষণ মিলে যাচ্ছে, কান ভোঁ ভোঁ, নাক লাল, চোখ টনটন, দম বন্ধ, আমার দিব্যদৃষ্টি খুলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে আমি আমার কর্দমাক্ত জামাসুদ্ধ চৌত্রিশ নম্বর গেঞ্জি থেকে মুক্ত হলাম।
আঃ কী আরাম! সঙ্গে সঙ্গে সব উপসর্গ দূর হয়েছে। কান ভোঁ ভোঁ করছে না, চোখ টনটন করছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে না, নাক-মাথা সব ঠিক। আমি ছেলেটির কাছ থেকে একটা আটত্রিশ নম্বর গেঞ্জি গায়ে দিলাম।
এরপর থেকে আটত্রিশ নম্বর গেঞ্জি গায়ে দিচ্ছি আর ডাক্তার-বৈদ্য, ওষুধ-টোটকা লাগে না। আর কান ভোঁ ভোঁ করে না, নাক লাল হয় না, চোখ টনটন করে না, মাথা ঘোরে না, আর দম বন্ধ হয়ে আসে না।
গোরুর গল্প
দীনদয়ালবাবুর মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে তিনি মানুষ নন গোরু। নানা ব্যাপারে ঠকে অনেকে। নিজেকেই গোরু ভাবে, কেউ কেউ অতিবুদ্ধিমান অন্যদের গোরু ভাবে, কিন্তু দীনদয়ালবাবুর ব্যাপারটা এত সামান্য বা সাধারণ নয়। যদিও তার লেজ নেই, তিনি দুধ দিতে পারেন না বা মাঠে হালচাষ করতে পারেন না, দীনদয়ালবাবুর দৃঢ় বিশ্বাস গোরু হিসাবে তার এই সব অযোগ্যতার জন্যে সৃষ্টিকর্তা এবং তার জনক-জননী দায়ী এবং আসলে তিনি দেহে-প্রাণে সর্বান্তঃকরণে সম্পূর্ণই গোরু।
প্রথম প্রথম সবাই যখন একটু-আধটু বুঝতে পারল যে দীনদয়ালবাবু নিজেকে গোরু ভাবছেন, কেউ ব্যাপারটাকে তত গুরুত্ব দেয়নি। দীনদয়ালবাবু কাউকে বিরক্ত করতেন না, বাড়িতে চুপচাপ বসে থাকতেন, অফিসেও যেতেন। কেউ তাঁকে ঘাঁটাত না, তিনিও কাউকে ঘাঁটাতেন না। অফিস কাছারিতে এরকম লোক অনেক যায়, সবাই তাদের মেনে নেয়। কেউ নিজেকে সিরাজউদ্দৌল্লা ভাবে, বার্নাড শ ভাবে। এক বড়বাবু ছিলেন, তিনি নিজেকে রানি ভিক্টোরিয়া ভাবতেন। শাসনকর্ত্তীর যোগ্য রাশভারিয়ানা এবং রমণীসুলভ ব্রীড়ার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল তার চরিত্রে। আরেক আবগারির দারোগা নিজেকে ধরে নিয়েছিলেন হাওড়া ব্রিজ, কোনও অসুবিধা ছিল না। সব সময়ে পায়ের বুড়ো আঙুলে ভর দিয়ে লম্বা হয়ে হাঁটতেন, হাওড়া ব্রিজের মতো টানটান, দুদিকে দুটো হাত সমবাহু ত্রিভুজের মতো পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি প্রসারিত। তবে কোনওদিন বেশি পান-টান করলে ট্রাফিক জ্যাম হয়ে যেত রাত্রির দিকে, তখন গাড়ি-ঘোড়া, লোকজনের চাপে হাওড়া ব্রিজের খুব কষ্ট হত।
সে যা হোক, দীনদয়ালবাবুকে নিয়ে বিশেষ কোনও অসুবিধা ছিল না। তাকে দেখলে অচেনা লোকের বুঝবার ক্ষমতা ছিল না যে তিনি একটি আস্ত গোর। কিন্তু ক্রমশ নতুন উপসর্গ দেখা দিতে লাগল। একদিন অফিসের করিডোরে যেতে যেতে হঠাৎ তারস্বরে হাম্বা হাম্বা করে চিৎকার করে উঠলেন। বড়সাহেবের খাস আর্দালি উমানাথ, তাদের বংশে সকলের হার্টের অসুখ, সে টুলে বসে ঝিমোচ্ছিল, হঠাৎ ঘুমের মধ্যে অফিসের বারান্দায় গোরুর ডাক শুনে ঘেমে-টেমে শেষ হয় আর কী! অফিসের লোকেরা এইই চায়–অফিস ছুটি হয়ে গেল। একদল লোক উমানাথকে স্ট্রেচারে চড়িয়ে অ্যাম্বুলেন্স করে হার্টের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল, বাকিরা জোরজবরদস্তি করে ট্যাকসিতে উঠিয়ে দীনদয়ালবাবুকে নিয়ে গেল মাথার ডাক্তারের কাছে।
মাথার ডাক্তার হালদার সাহেব অতি বিচক্ষণ ব্যক্তি। বহুদিনের অভিজ্ঞতা তার। অনেক রকম মাথার অসুখ তিনি দেখেছেন। অনেক বাঙালি-অবাঙালি স্ত্রী-পুরুষ, সাহেব-চিনেসাহেব-ছিনেসাহেব অনেকের চিকিৎসা তিনি করেছেন। কলকাতা শহরে তিনিই একমাত্র মানসিক চিকিৎসক যাঁকে একুশবার পাগলে কামড়িয়েছে। শতকরা দশজন পাগল চিকিৎসার শেষ পর্যায়ে একবার ডাক্তারকে কামড়াতে যায় এবং কামড়াতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে ভাল হয়ে যায়। তাই পাগলের ডাক্তারদের প্রতিষ্ঠা নির্ধারিত হয় কতবার পাগলে কামড়িয়েছে তাই দিয়ে। বলাই বাহুল্য, আমাদের এই হালদার সাহেব এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ স্থানে আছেন। হালদার সাহেব আগে চিকিৎসা করতেন সামান্য একটা কড়াই-ধরা সাঁড়াশি দিয়ে। অবশ্য হালদার সাহেব বলতেন, ওই সাঁড়াশিটা ভিয়েনা থেকে আনানো, তিনশো তিরিশ পাউন্ড দাম; কেউ তা বিশ্বাস করত না। সবাই বলত কালীঘাট বাজার থেকে কেনা। দাম দেড় বড় জোর দু টাকা। কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না, সাঁড়াশির দামের সঙ্গে হালদার সাহেবের যোগ্যতার কোনও সম্পর্ক নেই।
আজকাল হালদার ডাক্তার একটু আধুনিক হয়েছেন। প্রায় ষাট টাকা খরচ করতে হয়েছে তাঁকে এই জন্যে। একটা তক্তাপোশ, একটা তোশক, একটা বালিশ, সাদা চাদর এবং পঁচিশ শক্তির একটা নীল বালব। সেই তক্তাপোশের উপরে দীনদয়ালবাবুকে সবাই মিলে জোর করে শুইয়ে দিল। এতক্ষণ দীনদয়ালবাবু ধস্তাধস্তি করে কাবু হয়ে পড়েছিলেন, শুইয়ে দেওয়ামাত্র একবার নিস্তেজ কণ্ঠে ক্ষীণ হাম্বা হাম্বা করে নেতিয়ে পড়লেন।
