পরে জানা গিয়েছিল ওই হাই-লো প্রেশারের ব্যাপারটা। হাই-লো অর্থাৎ উচ্চনীচ রক্তচাপ অর্থাৎ খুব বেশি নিচু। ব্যাপারটা না বোঝার জন্যে আমার অগ্রজের সমূহ ক্ষতি হয়েছিল, ওই ঘটনার পরে জ্ঞান ফিরে আসার থেকে তার বিবাহ, রমণী এবং কাঠের উপরে সম্পূর্ণ অনীহা জন্মায়।
আমার অশ্রুগ্রন্থি দুর্বল। অগ্রজের কথা লিখতে গেলে আমার চোখে জল আসে। তার চেয়ে নিজের কথা লিখি।
আমার রক্তচাপ বার বার বহু ডাক্তারের কাছে মাপিয়ে দেখেছি, মোটামুটি স্বাভাবিক। নানা রকম ডাক্তারি পরীক্ষা করিয়েও দেখলাম, আমার তেমন খারাপ কিছু ধরা পড়ল না। ঘুম, খিদে হজম ইত্যাদিও চমৎকার। কিন্তু বাড়ির মধ্যেও কেমন একটা দমবন্ধ ভাব, কানের মধ্যে ভোঁ ভোঁ করে, গলা শুকিয়ে যায়, মাথা ঘোরে।
কোনও ডাক্তারই যখন চিকিৎসা করে সুরাহা করতে পারলেন না, তখন কোবরেজি, হোমিওপ্যাথি সবই চেষ্টা করলাম। কিছুতেই কিছু হল না, পরশুরামের চিকিৎসা সংকটের মতো অবস্থা প্রায়। তবু অবশেষে মুষ্টিযোগ, তারপরে যোগ ব্যায়ামের পথে এগোলাম। বিশেষ সুবিধে হল না। মধ্য থেকে সর্বাঙ্গে প্রচণ্ড ব্যথা হল। শীর্ষাসন করার সময় হঠাৎ বাড়ির বহু পুরনো বুড়ো হুলো বেড়ালটা কেমন চমকে গিয়ে আমার নাকটা আঁচড়ে দিল। নাকের মাংস বড় নরম, দরদর করে কপাল বেয়ে রক্ত পড়ে মাথার চুল আঠা হয়ে গেল।
সবচেয়ে বেকায়দা হয়েছিল জল চিকিৎসা করতে গিয়ে। কাঁচা মাটির হাঁড়িতে শায়িত অবস্থায় চুমুক দিয়ে সাত সকালে পরপর সাত হাঁড়ি জল শুয়ে শুয়ে খেতে হবে বিছানা পরিত্যাগ না করে। যে সময়ে জলত্যাগ করার জন্যে মানুষ বিছানা পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয় ঠিক সেই সময়ে সাত হাঁড়ি জলপান করা আমার পক্ষে সম্ভব হল না। এদিকে সেই মাথা ঘোরা, কান ভোঁ ভোঁ, দমবন্ধ ভাব সেটা কিন্তু লেগেই রয়েছে।
অগত্যা পৈলান, পৈলানের পথে আসি। অবশ্য ঠিক পৈলান নয়। পৈলান থেকে তিন মাইল অর্থাৎ পাঁচ কিলোমিটার দূরে বড় মহাদেবপুর। বড় মহাদেবপুরের শেষ সীমানায় গ্রামের কুমোরপাড়া, সেখানে খোকা পালের বাড়িতে সাদা আমড়া, ভগবানের এক আশ্চর্য দান, পৃথিবীতে আর কোথাও পাওয়া যায় না। এই সাদা আমড়া রোদ্দুরে শুকিয়ে যখন ঝরঝরে হয়ে যাবে, হামানদিস্তায় হেঁচে একরকম হালকা তেল বেরোবে, সেই তেল নাকে দিয়ে রাতে ঘুমোতে হবে। এই রকম সাত রাত চালাতে পারলেই চোখ টনটন, কানের ভেতর ভোঁ ভোঁ ডাক, নাকের ডগা লাল হওয়া সব সেরে যাবে।
পরামর্শটা দিয়েছিলেন আমার এক সহকর্মী মহেশবাবু। মহেশবাবুর মামাশ্বশুর এই সাদা আমড়ার তেল নাকে দিয়ে সাক্ষাৎ মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন। মহেশবাবু আরও বলেছিলেন, কলকাতার যত বড় বড় ডাক্তার তারা রোগীকে যতসব উলটোপালটা ওষুধ খাওয়ান কিন্তু নিজেরা গোপনে এই সাদা আমড়ার তেল নাকে দেন, কোনও ওষুধ স্পর্শ করেন না।
আজ বড় মহাদেবপুরে বড় আশা নিয়ে এসেছি। কিন্তু আশা পূর্ণ হল না। কুমোরপাড়ার খোকা পালের বাড়ি খুঁজে পেতে কোনও অসুবিধেই হল না। সারা অঞ্চলে ওই সাদা আমড়ার দৌলতে খোকা পালের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু সম্প্রতি বড় একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমড়া গাছে আর সাদা আমড়া হচ্ছে না, অন্য সব গাছে যেমন হয় তেমনই স্বাভাবিক সবুজ রঙের আমড়া হচ্ছে।
খোকা পাল মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে। যদিও সে আমাকে কখনও দেখেনি, আমি তাদের উঠোনে পা দিতেই ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। বোঝা গেল সাদা আমড়ার ব্যবসায় তার বিলক্ষণ দু পয়সা হচ্ছিল, এখন আমড়ার শুভ্রতা চলে যাওয়ায় সে পথে বসে পড়েছে। সাদা আমড়ার উপর নির্ভর করে সে তার জাতব্যবসার সম্বল কুমোরের চাকটা পর্যন্ত বেচে দিয়েছে।
আমি আর কী করব, নিজের ভাগ্যকে মনে মনে বলিহারি দিয়ে দমবন্ধ, কান ভোঁ ভোঁ, নাক লাল, চোখ টনটন অবস্থা চিরস্থায়ী ধরে নিয়ে পৈলানের হাঁটাপথে কলকাতার মুখে রওনা হলাম।
এখন রোদ আরও চড়া। তবে এবার আর সেই খালধার থেকে বাঁশের সাঁকোয় লাফিয়ে উঠতে গেলাম না। খালের মধ্য দিয়ে হেঁটে পার হলাম। জামাকাপড় তো আগের বারেই কাদা মাখামাখি হয়ে গেছে। আরও একটু কাদাজল লাগল।
বাসস্ট্যান্ডে যখন এসেছি, রোদ্দুরে শুকিয়ে সারা গায়ে কাদা চটচট করছে। শরীরের অস্বস্তির জন্যে কষ্ট হচ্ছে, এমন সময় চোখে পড়ল পাশে একটা হোসিয়ারির দোকান। মনে মনে ভাবলাম, এখান থেকে গেঞ্জি কিনে নিই। তারপর গায়ের কাদামাখা জামা আর গেঞ্জি ছেড়ে নতুনটা পরে নেব, একটু আরাম হবে।
দোকানটার ভেতরে গেলাম। অল্পবয়েসি একটি ছেলে, বড় জোর কুড়ি-বাইশ বছর বয়েস হবে, কাউন্টারে বসে রয়েছে। আমি তাকে গিয়ে বললাম, ভাই, একটা চৌত্রিশ সাইজ হাওলা গেঞ্জি হবে?
ছেলেটি এতক্ষণ আমার কর্দমাক্ত পোশাক পর্যবেক্ষণ করছিল। আমার কথা শুনে আমার মুখের দিকে তাকাল, তারপর প্রশ্ন করল, কত সাইজ? চৌত্রিশ? কার জন্যে?
আমি বললাম, আমার জন্যে। আমার চৌত্রিশই লাগে।
ছেলেটি বলল, আপনি আগে নিশ্চয় রোগা ছিলেন তখন চৌত্রিশ লাগত।
আমি ভেবে দেখলাম, ছেলেটি ঠিকই বলেছে। বহুকাল ধরে চৌত্রিশ নম্বর গেঞ্জি গায়ে দিয়ে আসছি, এর মধ্যে আমার ওজন সোয়াগুণ বেড়েছে।
