কিন্তু আমি আর প্রসঙ্গ দুজনেই ন্যাড়াকে মাপতে ভুল করেছিলাম। পরের দিন সকালে আবার প্রসঙ্গ এল হাঁপাতে হাঁপাতে, খোকাদা, খবরের কাগজ দেখেছেন?
আমি তখন পার্কে খালিপায়ে হাঁটছিলাম ভেজা ঘাসের ওপরে, সেখানেই প্রসঙ্গ এসে আমাকে ধরল। আমি তাকে বললাম, তুমি তো জানো, আমি সকালে খবরের কাজ দেখি না।
প্রসঙ্গ বলল, আজ একটু দেখুন। দেখলাম চারের পাতায় সপ্তম কলমে একটা ছোট খবর:
ভারতীয় জাহাজে ছবি
…জাহাজ নির্মাণ দপ্তরের নতুন প্রতিমন্ত্রী কার্যভার গ্রহণ করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে ভারতীয় যাত্রী জাহাজগুলিকে আরও সুন্দর ও সুষমামণ্ডিত করা হবে। প্রত্যেকটি জাহাজের ডেকে একটি করে উচ্চমানের ছবি টাঙানো হবে।
প্রসঙ্গত জানা গেল বিখ্যাত চিত্রকর শ্রীযুক্ত প্রসঙ্গ গুপ্ত প্রথম বারোটি জাহাজের জন্যে তাঁর বারোটি বিখ্যাত ছবি সরকারকে দিতে সম্মত হয়েছেন।
জাহাজ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন যে, এর জন্যে উপযুক্ত মূল্য শিল্পীকে সরকার দেবেন। খবরটা পড়া শেষ হবার পর প্রসঙ্গের মুখের দিকে তাকালাম। তার মুখভরা হাসি, সে বলল, ন্যাড়া কী করল দেখলেন! এখন সেই পাঁচ হাজার টাকাটা দিন তো, বাড়িওয়ালির কাছ থেকে ছবিগুলো ছাড়াতে হবে! তারপর একটু থেমে বলল, আচ্ছা একেকটা ছবির জন্যে সরকার যদি দশ হাজার টাকা করে দেয়, তাহলে তার থেকে বেশি চাওয়া কি উচিত হবে?
আমার অনেকদিন আগের প্রসঙ্গের প্রথম প্রদর্শনীর সেই ক্রেতাটির কথা মনে পড়ল যে ষাট টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। লোকটা এখন এখানে থাকলে অজ্ঞান হয়ে যেত।
গেঞ্জি
ভূমিকা
আমার ছেলে কিছুতেই বাঁচামাছ খেতে চায় না। যাঁরা খান, জানেন বাঁচামাছ জাবদা বা ট্যাংরার। মতোই কিংবা তার চেয়েও সুস্বাদু জাতের মাছ। এবার কয়েকদিন পরপর বাজারে বাঁচামাছ উঠল, দামও খুব চড়া নয়।
আমি নিজেই বাজার করি, ইচ্ছে করে এবং ছেলেকে জোর করে বাঁচামাছের স্বাদ গ্রহণ করানোর জন্যে পরপর তিনদিন বাঁচামাছ কিনে আনলাম বাজার থেকে। হয়তো এর পরেও আরও কয়েকদিন আনতাম যদি না আমার স্ত্রী মারমুখী হতেন।
সে যাহোক, বাড়িতে বাঁচামাছের প্লাবনেও আমার ছেলে কিন্তু বাঁচামাছ স্পর্শ করল না, বাঁচামাছের একটা টুকরোও খাওয়ার পাতে ছুঁল না। তৃতীয় দিনে তার এই মৎস সত্যাগ্রহের পর যখন তাকে কঠোরভাবে জিজ্ঞাসা করলাম, ব্যাপারটা কী? সে বিনীতভাবে জানাল, এ লড়াই বাঁচার লড়াই।
ভূমিকাতেই বলে রাখা ভাল আমার এই সামান্য গল্পটি মাছ বা মাছ খাওয়া নিয়ে নয়, তার চেয়ে অনেক গুরুতর বিষয়ে, একালের ওই স্লোগান বাঁচার লড়াই নিয়ে।
সম্ভবত এই গল্পটির নাম পাঠ করে কোনও কোনও কৃতবিদ্য পণ্ডিত তৎসহ সাহিত্যের পাঠকের এই নামে একটি বিখ্যাত উপন্যাসের কথা মনে পড়তে পারে। আমার স্বীকার করা উচিত, ওই কালজয়ী গেঞ্জি উপন্যাসটির কাহিনির সঙ্গে মিল না থাকলেও এবং এটি একটি ক্ষুদ্র গল্প হলেও, ওই একই জাতের জীবনসংগ্রাম, যাকে অধুনা বাঁচার লড়াই বলে, আমার অক্ষম লেখনীতে এক্ষণে আমি ব্যক্ত করার চেষ্টা করছি।
কাহিনি
পৈলান বাসস্ট্যান্ডে নেমে একটু এগিয়ে মোড় ঘুরে হাঁটাপথে মাত্র সাড়ে তিন মাইল। জীবনে এই আমার দীর্ঘতম পদযাত্রা। কোনও উপায় নেই, প্রাণের দায়ে হাঁটতেই হল। পথে রেলিংহীন একটি পঞ্চাশ হাত বাঁশের সাঁকো, যার শেষ প্রান্ত এবং খালধারের মধ্যের দূরত্ব দীর্ঘ লক্ষে অতিক্রম করতে হয়, সেও প্রায় ছয়-সাত হাত। প্রাণের দায়ে সেটুকুও লাফাতে হল। কাদামাটিতে মুখ থুবড়িয়ে পড়ে একটা গড়াগড়ি দিতে হল। সকালবেলা ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরে বেরিয়েছিলাম। এখন যা চেহারা হল বলার নয়।
লাফের পর মিনিট দশেক দম নিয়ে আবার হাঁটতে হল। এমনিই সারাক্ষণ আমার দমবন্ধ ভাব, তার উপরে এই হুজ্জোত।
কিন্তু এই দমবন্ধ ভাবটা কাটানোর জন্যে এ হুজ্জোত আমাকে পোহাতেই হচ্ছে।
ব্যাপারটা আরেকটু আগের থেকেই খুলে বলা উচিত। বছর দুয়েক হল আমার কেমন একটা গলাচাপা, দমবন্ধ ভাব। বাসায় বা বিছানায় ভালই থাকি। সকালবেলা খোলামেলা খালি গায়ে ইজিচেয়ারে শুয়ে বেশ আরাম এবং স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে চা খাই, খবরের কাগজ পড়ি। বিকেলে কাজ থেকে বাড়ি ফিরে স্নান-টান করে স্বস্তি ফিরে পাই। কিন্তু যখনই রাস্তায় বেরোই বা কাজে যাই, কেমন যেন কানের ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করে, নাকের ডগা লাল হয়ে ওঠে, চোখ টনটন করে, মাথা। ঘুরতে থাকে, রীতিমতো দমবন্ধ অবস্থা দাঁড়িয়ে যায়।
একদিনে এরকম হয়নি। আস্তে আস্তে হয়েছে। যখন কষ্ট বাড়ল অফিসের এক বন্ধুকে বললাম। তিনি একবাক্যে রায় দিলেন, তোমার প্রেশার হয়েছে।
প্রেশার হয়েছে কথাটা এমনিতে নিরর্থক। নিচু হোক, উঁচু হোক প্রেশার তো জীবিত মানুষের থাকবেই। শুধু যখন সে মরে যাবে তখন প্রেশার থাকবে না।
প্রেশারের ব্যাপারটা আমি অবশ্য ভাল বুঝি না। আমার দাদাকে একবার ডাক্তার বলেছিলেন, আপনার হাই-লো-প্রেশার। দাদা ধরে নিয়েছিলেন হাই এবং লো যখন একসঙ্গে, সুতরাং মাঝারি, সুতরাং নর্মাল; তাই কোনও চিকিৎসা করাননি। শেষে এক গোধূলি লগ্নে আমাদের এক আত্মীয়কন্যার বিবাহমণ্ডপে কনের পিড়ি ধরে সাতপাক ঘোরানোর সময় প্রথম পাকের মাথায় দাদা মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। এবং মুহূর্তের মধ্যে তাঁর সেই ভূপতিত মস্তকে প্রথমে পড়ল শতাব্দীপ্রাচীন আধমণি কাঁঠাল কাঠের পিড়ি এবং তারপরে পড়ল সিকি শতাব্দীপ্রাচীন দেড়মণি নাদুসনুদুসী কনেটি।
