এই রকম পরপর তিনবার ট্রায়াল দিই। তারপরেও ধৈর্য ধরে কেউ চতুর্থবার ফোন করে তাহলে ধরেই বলি, রং নাম্বার।
কিন্তু আমার গলার স্বর খুব মিহি, দুরভাষী তারের মধ্যে সে আরও মিহি হয়ে যায়, ফলে প্রায় প্রত্যেকেই ধরতে পারে, বলে, খোকাদা ঘুমুচ্ছিলে নাকি?
আজও সে রকম হতে পারত। কিন্তু আজকের ফোন যে করেছে সে কুড়িবার ক্রিং ক্রিং করার। জন্যে অপেক্ষা না করে আবার ফোন করল। আবারও দু-তিনবার বাজার পর ছেড়ে দিল।
কেমন খটকা লাগছিল। তৃতীয়বারে ফোনটা বাজতেই খপ করে ধরলাম। আমার ফোন ধরার কায়দাটা একটু অন্যরকম। বাইশ বছর বয়েস পর্যন্ত এমন এলাকায় ছিলাম যেখানে রেল স্টেশন, থানা আর দু-তিনটে মাড়োয়ারি গদি ছাড়া কোথাও ফোন ছিল না। আমি দূর থেকে ফোন দেখেছি। আমাকে কেউ কখনও ফোন করেনি, আমিও কাউকে করিনি।
কলকাতায় এসে আরও কিছুর সঙ্গে ফোন ব্যবহার করা শিখলাম। সদাগরি অফিসের কাজের দৌলতে নিজের বাড়িতেও একটা ফোন এল। কিন্তু ফোনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক এখনও গড়ে ওঠেনি। জিনিসটাকে আমি দূরে দূরে রাখতেই চাই। নিজে বিশেষ ফোন করি না বা ধরি না, কিন্তু যদি কখনও বাধ্য হয়ে ধরতে হয় তবে অতর্কিতে, খপ করে, শক্ত পাঞ্জায় ধরি, যেন বিষধর সাপের গলা ধরেছি, অসতর্ক হলেই সর্বনাশ।
অবশেষে আজও তাই করলাম, এবং সাপটা ধরা পড়ল দুবার হ্যালো হ্যালোর পর, সাপটা কথা বলল, খোকাদা, আমি প্রসঙ্গ বলছি। বলা বাহুল্য প্রসঙ্গ কারও আসল নাম নয়, প্রসঙ্গ প্রসঙ্গমাত্র। টেলিফোনে আমি প্রসঙ্গ বলছি যে বলল তার পিতৃদত্ত নাম প্রমীলাকান্ত দাশগুপ্ত। সে ছবি আঁকে।
হায় ছবি তুমি শুধু ছবি
প্রমীলাকান্ত ওরফে প্রসঙ্গ আমার খুবই অনুগত। সে আর ন্যাড়া মানে আমার মামাতো ভাই একসঙ্গে ইস্কুলে পড়ত, দুজনে একই সঙ্গে পরপর দুবার হায়ার সেকেণ্ডারি ফেল করে। পরে ন্যাড়া সাপ্লাইয়ের ব্যবসা শুরু করে, কী সাপ্লাই তা অবশ্য কখনও বলেনি। আর প্রসঙ্গ আমার পরামর্শে আর্ট কলেজে ভর্তি হয়। সেখানেও সে আঁকাজোকা শেষ করে পাশ হয়ে বেরোতে পারেনি। তার। আগেই সে আর্ট কলেজ ছেড়ে দেয়। কিন্তু ওই মহাবিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষা এবং সেই সঙ্গে জটিল অভিজ্ঞতা এখন তাকে জীবনে একটা পঁড়াবার জায়গা খুঁজে দিয়েছে।
তাকে নাম বদলের পরামর্শও আমি দিই, বলি যে, প্রমীলাকান্ত দাশগুপ্ত নামে এ বাজারে ছবি এঁকে সুবিধে করা কঠিন, নাম তোমাকে পালটাতে হবে। সে আমাকে বলেছিল, খোকাদা, তুমি যদি খোকা নামে বুড়ো হতে পারলে, তাহলে প্রমীলাকান্ত নামে আমার কী অসুবিধে হবে?
দু-চারবার চাপ দেবার পর প্রমীলাকান্ত অবশ্য আমার পরামর্শ গ্রহণ করেছিল। তার নতুন নামকরণও আমারও করা, প্রমীলার প্র রইল, সেই প্র দিয়ে হল প্রসঙ্গ, মধ্যপদ কান্ত সম্পূর্ণ বাদ আর। দাশগুপ্তের দাশ ঘেঁটে দিয়ে শুধু গুপ্ত রইল। অর্থাৎ প্রমীলাকান্ত দাশগুপ্ত হল প্রসঙ্গ গুপ্ত।
বেশ কাব্যময় নাম। নামটার মধ্যে একটু আর্টিস্ট আর্টিস্ট ভাব, একটা রহস্যময়তা আছে। আর নামটা বেশ লাকিও বটে, প্রথম একজিবিশনেই উতরিয়ে গেল প্রসঙ্গ গুপ্ত। কাগজে কাগজে অনেকটা লেখালেখিও হল। বাংলা দৈনিকের প্রৌঢ় কলারসিক মন্তব্য করলেন, প্রসঙ্গ অবান্তর নয়। ইংরেজি কাগজে প্রসঙ্গ গুপ্তকে সংক্ষিপ্ত করে দিয়ে লিখল, পি জি ইস ডিফারেন্ট। একটু ধরাধরি করতে হয়েছিল, কিন্তু সেটা বিফলে যায়নি।
তার প্রথম প্রদর্শনীতেই একটা অচেনা লোক একটা ছবি সস্তায় কেনার চেষ্টা করল। যদিও সে কিনল না কিন্তু দামদর করতে করতে পঁচিশ টাকা থেকে ষাট টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। ষাট টাকাতে দিলেও বিশেষ কোনও ক্ষতি ছিল না, কিন্তু ছবির গায়ে দাম লেখা ছিল বাইশশো পঞ্চাশ টাকা। এরপরে ষাট টাকায় দেওয়া খুব সম্মানজনক নয়।
সম্মানজনক হোক আর নাই হোক, শিল্পীর অপরিচিত ব্যক্তি ছবি কিনতে চাইছে–এরকম সাধারণত দেখা যায় না। এই ধরনের প্রদর্শনীতে যারা ছবি-টবি কেনে তারা সবাই শিল্পীর আশেপাশের চেনাশোনা লোক।
তবে এসব কথা বলার কোনও অধিকার নেই। আমি জীবনে কোনওদিন কোনও ছবি কিনিনি। ছবি বুঝিও না, সেটা প্রসঙ্গ জানে। এবং সম্ভবত সেই জন্যেই আমাকে একটু সম্মান-উম্মান করে।
প্রসঙ্গ যে খুব ফালতু নয় সেটা আমি এবং অনেকে টের পায় তারাপদবাবুর একটা লেখা পড়ে। তারাপদবাবু তাঁর কাণ্ডজ্ঞানে এক শিল্পীর কথা লিখেছিলেন, প্রদর্শনীতে যাঁর একটা ছবি দেখে জনৈক দর্শক উক্তি করেছিল, অপূর্ব ছবি। দেখলেই জিবে জল আসে। প্রসঙ্গ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছিল সেই দর্শককে, এটা হল সূর্যাস্তের ছবি। দেখে আপনার মনে আনন্দ হতে পারে। চোখে আরাম হতে পারে, কিন্তু জিবে জল আসে কী করে?
জবাবে নির্বিকার দর্শক বলেছিলেন, আমি ভেবেছিলাম ডবল ডিমের ওমলেটের ছবি। সূর্যাস্তের ছবি বুঝতে পারিনি। মাপ করবেন।
তারাপদবাবুর রসিকতা আমার একদম ধাতে সয় না, কিন্তু তিনি যে প্রসঙ্গের এই ব্যাপারটা নিয়েও রসিকতা করবেন এবং সেটা পড়ে পাবলিক হাসবে তা ভাবতে পারিনি।
গতবার সিঙ্গাপুরে এক কনফারেন্সে আমার যাওয়ার কথা ছিল। সব ঠিকঠাক, কিন্তু কীসে কী হল, আমার বড়সাহেব সেই কনফারেন্সে চলে গেলেন, আমার নিমন্ত্রণ আর এল না, অথচ বিষয়টা আমারই ছিল।
