এইখানেই গঙ্গামণির কেরামতি। গয়া-গঙ্গা স্টোরসে নিয়ম করা হয়েছে প্রতি রবিবার সন্ধ্যাবেলা যে মুহূর্তে অ্যালার্মটা বেজে উঠবে ঠিক তখন যে সব খদ্দের যা যা জিনিস কিনছিলেন তা অর্ধেক দামে দেওয়া হবে।
ফলে অ্যালার্ম বাজার অপেক্ষায় খদ্দেররা সারা সন্ধ্যা জিনিস কিনে যাচ্ছেন। গয়া-গঙ্গা স্টোরসে বিক্রি রবিবার সন্ধ্যায় সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। অ্যালার্ম বাজার শুভ মুহূর্তে ডবল লাভের লোভে টিভি-তে বাংলা সিনেমা ফেলে রেখে এ পাড়া ও পাড়ার গৃহিণীরা ভিড় করছেন গয়া-গঙ্গা ভ্যারাইটি স্টোরসে।
.
কোনও রবিবার সন্ধ্যায় আমাদের ওদিকে এলে আপনিও দেখে যেতে পারেন গয়া-গঙ্গার কেমন রমরমা চলছে। ইচ্ছে হলে কোনও জিনিস কিনতে পারেন, ভাগ্য প্রসন্ন হলে, অ্যালার্ম বেজে উঠলে জিনিসটা অর্ধেক দামে পেয়ে যাবেন।
গুপ্তপ্রসঙ্গ
রাত সাড়ে দশটার সময় সদ্য খাওয়া শেষ হয়েছে, এর পরে খবরের কাগজগুলোতে একটু চোখ বুলিয়ে শুতে যাব, এমন সময় ফোন এল।
এই সময়টা ফোন-টোন খুব বিরক্তিকর। আমার নিতান্ত নিজস্ব এই কিছুক্ষণ খবরের কাগজের জন্যে নির্দিষ্ট এবং উৎসর্গীকৃত।
সারাদিন খবরের কাগজ পড়ার অবকাশ আমার হয় না। সকালে উঠে ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে পার্কে গিয়ে ভেজা ঘাসের উপরে খালিপায়ে এক ঘণ্টা হাঁটি। তারপর চা, দাড়ি কামানো, স্নান ইত্যাদি, অবশেষে ব্রেকফাস্ট। ততক্ষণে অফিসের প্রিজনভ্যান এসে যায়, ছুটে গিয়ে বন্দি হই। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হতে সন্ধে সাড়ে সাতটা-আটটা। ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরি।
বাড়ি ফিরেও বিশেষ বিশ্রাম হয় না। আমার একমাত্র মামাতো ভাই ন্যাড়া গত বছর মন্ত্রী হয়েছে। আমার সূত্রে অনেকেই তার কাছে তদ্বির-তদারক করে। সন্ধ্যার এই সময়টা সেই সব লোকজন আসে৷ যদিও ক্লান্ত থাকি, কিন্তু ভালই লাগে। মন্ত্রী মামাতো ভাইয়ের ক্ষমতার কিঞ্চিৎ ভগ্নাংশ উপভোগ করতে করতে নিজেকেও বেশ ক্ষমতাবান মনে হয়। তাও তো নাড়ু এখনও পুরোপুরি মন্ত্রী নয়, নেহাত উপমন্ত্রী।
কাউকে কাউকে বেশ ধমকিয়ে দিই, বলি, নতুন রেশন কার্ড করার জন্যে বলা যাবে না, ওসব ছোট ব্যাপার পাড়ার কাউন্সিলরকে বলো, মন্ত্রীকে বলা যাবে না।
আবার কাউকে বলি, মন্ত্রীকে কি জামিনের কথা বলা যায়? জজ কোর্টে জামিন না পাও হাইকোর্টে যাও। মন্ত্রী এর মধ্যে মাথা গলাতে পারবে না।
কেউ কেউ ক্ষুণ্ণ হয়ে ফিরে যায়, আবার কারও কারও দরখাস্ত রেখে দিই। প্রত্যেক রোববার সকালে মামার বাড়ি যাই, মামাতো ভাই কদাচিৎ থাকে। আমি মামিমার হাতে কাগজপত্র বুঝিয়ে দিয়ে আসি। আমার মামিমা খুব বুদ্ধিমতী, চব্বিশ বছর বয়েসে ছয় বছরের ছেলে নিয়ে বিধবা হয়েছিলেন। কত আপদ-বিপদ, ঝড়-ঝঞ্ঝা মাথায় করে ছেলেকে মানুষ করেছেন, শুধু মানুষ নয়, মন্ত্রী করেছেন।
সে যা হোক, সে অন্য গল্প। মন্ত্রীর গল্প বলার সময় বা জায়গা এটা নয়। আর তত সাহসও আমার নেই।
বরং স্রেফ নিজের কথা বলি। সেটাই নিরাপদ। সুতরাং যা বলছিলাম, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়ি-অফিস-বাড়ি। তারপর সন্ধ্যাবেলার তদ্বির-তদারক শেষ হওয়ার পরে হাত মুখ ধুয়ে রাতের খাবার খেয়ে নিই। তারপর ডাক্তারের পরামর্শ মতো আধ ঘণ্টা, এবার আর খালিপায়ে নয়, চটিপায়ে রাস্তায় হাঁটি। রাত সাড়ে দশটা নাগাদ বিছানায় শুতে আসি সকালবেলার খবরের কাগজ হাতে নিয়ে। তখন সেগুলো আর খবরের কাগজ নেই, ইতিহাস হয়ে গেছে। কিছু কিছু লোকমুখে অফিসে বা বাসায় সকাল থেকে শুনেছি, তেমন অতীব চমকপ্রদ সংবাদ হলে অফিসের বারোয়ারি কাগজে একবার দূর থেকে হেডলাইনে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিয়েছি।
কিন্তু হেডলাইনের চেয়েও আমাকে অনেক বেশি আকর্ষণ করে খুচরো খবর, আইন-আদালতের কলম এবং নানা ধরনের বিজ্ঞাপন।
রাতে নির্ভার শরীর ও মনে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে আরাম করে খবরের কাগজগুলো পড়ি। তিনটে কাগজ রাখি আমি, তিনটেই বাংলা কাগজ, দিশি কাগজের ইংরেজি খবরে তেমন জুত পাই না, তার জন্যে টাইম, নিউজ উইক সপ্তাহান্তে যথেষ্ট।
খবরের কাগজ পড়ার সময় আমাকে কেউ বিরক্ত করে আমি সেটা চাই না। একদিক থেকে আমি নিশ্চিন্ত, আমি চিরকুমার, বিয়ে-টিয়ে করিনি। রাতের বেলা বিছানায় আমাকে বিরক্ত করার তেমন কেউ নেই।
কিন্তু সত্যিই আজ বিরক্ত হলাম। সবে প্রথম কাগজটার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় নিরুদ্দেশ বিজ্ঞাপনের এক যুবতীর (উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, উচ্চতা সোয়া পাঁচ ফুট, পরনে নীল তাঁতের শাড়ি) বর্ণনা পড়ে ফটোর চেহারার সঙ্গে যেটুকু সম্ভব মিলিয়ে নিচ্ছি, এমন সময় ফোনটা এল।
বেশ কয়েকবার ক্রিং ক্রিং করে বেজে ফোনটা থেমে গেল। দিনের বেলায় ফোনটা ভাইয়ের ঘরে থাকে, রাতে আমি আমার ঘরে নিয়ে আসি ওটা। সেটা নিতান্ত আত্মরক্ষার জন্যে, যাতে কাজের লোকজন কেউ ফোনটা ধরে আমাকে না ডাকতে পারে।
অন্যান্য দিন সাধারণত শোয়ার সময় ফোনের রিসিভারটা মেঝেয় নামিয়ে রাখি কিন্তু আজ ভুল হয়ে গিয়েছিল, সেই সুযোগে ফোনটা বাজছে। কার কী তদ্বির পড়েছে এত রাতে, এসব ফোন আমি চট করে ধরি না। এরকম ক্ষেত্রে আমি ফোনটাকে গুণে গুণে কুড়িবার বাজতে দিই, তারপর রিসিভারটা তুলে কট করে কেটে দিই।
