সে যা হোক, চাকরি করতে গেলে এমন অনেক হয়। বড়সাহেব আমি যাতে মনে দুঃখ না পাই, সিঙ্গাপুর থেকে ফেরার সময় আমার জন্যে এক বোতল লাল জনিওয়াকার আর একটা গেঞ্জি নিয়ে এসেছিলেন।
বোতলটা পেয়ে খুশি হয়েছিলাম কিন্তু গেঞ্জিটার বুকে আর পিঠে বড় বড় বেগুনি অক্ষরে লেখা ছিল, কিক মি এগেইন, প্লিজ মানে আমাকে আবার লাথি মারুন।
বড়সাহেবের ইঙ্গিতটা আমি বুঝেছিলাম, কিন্তু মৃদু আপত্তি জানালাম, না স্যার। এ গেঞ্জিটা আমি গায়ে দিতে পারব না। লোকেরা হাসবে। বড়সাহেব বলেছিলেন, কী যা-তা বলছেন আপনি? জানেন না হাস্যকর হওয়াই এখন আধুনিকতা?
বড়সাহেবের কথাটা আমার মনে ধরেছিল। সুতরাং যখন তারাপদবাবুর কল্যাণে প্রসঙ্গ হাস্যকর হয়ে গেল, বুঝতে পারলাম এবার আর তাকে ঠেকানো যাবে না।
কে কাকে ঠেকাতে চায়? চাইলেও কেউ কাউকে কি ঠেকাতে পারে? যখন সে উঠতে থাকে, উঠতেই থাকে। হয়তো, হয়তো কেন নিশ্চয়, কেউ কেউ তাকে ঠেকাতে চেয়েছিল। প্রসঙ্গ আমার নিজের লোক। তা ছাড়া তার সঙ্গে আমার স্বার্থের কোনও সংঘাত নেই, তাকে যে ঠেকানো যায়নি তাতে আমি খুশি।
অবশ্য আজকাল প্রসঙ্গের সঙ্গে আমার খুব কম দেখাসাক্ষাৎ হয়। কিন্তু আমি মোটামুটি টের পাই যে সে ছবির আকাশে জেট বিমানের মতো তরতর করে উড়ছে।
কথাবার্তা
(পাঠক পাঠিকা মনে রাখবেন সত্যনারায়ণ = আমি এবং প্রমীলাকান্ত = প্রসঙ্গ)
প্রমীলাকান্ত: খোকাদা, আমি প্রসঙ্গ বলছি।
সত্যনারায়ণ: কে, প্রমীলা? তুমি এত রাতে বিরক্ত করছ? তুমি জান না আমি এখন খবরের কাগজ পড়ি!
প্রমীলাকান্ত: তা জানি। খুব ভালভাবেই জানি। কিন্তু একটা খবর কাগজে ছাপা হয়নি অথচ আপনার জানা দরকার সেই জন্যেই ফোন করছি।
সত্যনারায়ণ: (কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে) বলো কী খবর?
প্রমীলাকান্ত: খবরটা শুনলে আপনি চমকে উঠবেন।
সত্যনারায়ণ: তাড়াতাড়ি বলো। দেরি করে চমকাতে আমার মোটে ভাল লাগে না।
প্রমীলাকান্ত: আমি কলম্বো যাচ্ছি। ন্যাড়া পাঠাচ্ছে।
সত্যনারায়ণ: এই দুর্দিনে কলম্বো? তুমি কি ভারতীয় শান্তিসেনায় যোগ দিয়েছ?
প্রমীলাকান্ত: আরে তা নয়, আমি আমার বারোটা ছবি নিয়ে কলম্বোয় ভারত-উৎসবে যাচ্ছি।
সত্যনারায়ণ: এই দুর্দিনে ভারত-উৎসব! সাংঘাতিক কথা বলছ, তোমার কি কোনও বোধ নেই? নাড়ার কথায় ওদিকে যেয়ো না, মারা পড়বে। শোনো, আমাদের কোম্পানির একটা ব্রাঞ্চ অফিস ছিল কলম্বোয়, তার তামিল ম্যানেজারকে আজ আড়াই মাস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হয়তো গুমখুন হয়েছে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
প্রমীলাকান্ত: দোহাই খোকাদা, এই মাঝরাত্তিরে ভয় দেখাবেন না। সব ঠিকঠাক, এখন ভয় খেলে। চলবে না। ভয় দেখাবেন না।
সত্যনারায়ণ: তুমিও মাঝরাত্তিরে আমার খবরের কাগজ পড়ায় বাধা দিয়ো না। (এই সময় টেলিফোনের মধ্যে একটা তৃতীয় কণ্ঠস্বর মহিলার গলা শোনা গেল, থ্রি মিনিটস ওভার, থ্রি মিনিটস৷)।
সত্যনারায়ণ: (একটু চমকিয়ে উঠে) সর্বনাশ, এটা ট্রাঙ্কল নাকি! এটা তো লোকাল কল মনে হচ্ছে না! প্রমীলাকান্ত তুমি কোথা থেকে কথা বলছ?
প্রমীলাকান্ত: কলকাতায় আমার ফ্ল্যাট থেকেই কথা বলছি। সত্যনারায়ণ: তাহলে থ্রি মিনিটস ওভার–থ্রি মিনিটস এসব কী হচ্ছে?
প্রমীলাকান্ত: আমি নিজে তো ফোন পাইনি। বাড়িওয়ালির কাছ থেকে টাইলাইন নিয়েছি। তার সঙ্গে চুক্তি একনাগাড়ে তিন মিনিটের বেশি কথা বলব না। তাই তিনি তিন মিনিট হয়ে গেলেই ওইরকম আওয়াজ দেন।
সত্যনারায়ণ: কিন্তু মহিলার গলার স্বর কেমন চেনা চেনা মনে হল। উনি কি টেলিফোন ডিপার্টমেন্টে ট্রাঙ্ক সেকশানে আগে কাজ করতেন? (এই সময় টেলিফোনের মধ্যে আবার তৃতীয় কণ্ঠস্বর শোনা গেল, শাট আপ!)।
প্রমীলাকান্ত: খোকাদা আপনি ডোবালেন। বাড়িওয়ালি টাইলাইনে সব কান পেতে শুনছে। (পুনরায় টেলিফোনের মধ্যে তৃতীয় কণ্ঠস্বর, না, আমি শুনছি না। মিথ্যুক কোথাকার!)
সত্যনারায়ণ: উনি তো শুনছেন না বলছেন, শুধু শুধু ভদ্রমহিলার নামে দোষ দিচ্ছ। (আবার টেলিফোনের মধ্যে করুণ তৃতীয় কণ্ঠস্বর, দেখুন তো!)।
প্রমীলাকান্ত: খোকাদা, বাড়িওয়ালির সাইড নেবেন না। ওর গ্যারেজের ঘরে ছবিগুলো রেখেছিলাম। হঠাৎ তালা দিয়ে দিয়েছে। এখন ছবিগুলো কী করে বার করি, কী করে ভারত-উৎসবে নিয়ে যাই! অনেকটা সেই জন্যেই আপনাকে ফোন করছি।
তৃতীয় কণ্ঠস্বর: আগে দেড় বছরের গ্যারেজ ভাড়া মেটাও। তার সঙ্গে দেড় কুইন্টাল দুধের দাম দিতে হবে।
প্রমীলাকান্ত: ভারত-উৎসব থেকে ফিরেই আপনার গ্যারেজ ভাড়া দিয়ে দেব। কিন্তু দুধের দামটা কেন বুঝতে পারছি না।
তৃতীয় কণ্ঠস্বর: বুঝতে পারছ না? গ্যারেজের ঘরে আমার মেনি বেড়াল চারটে বাচ্চা দিয়েছিল। সে তোমার ছবিগুলো দেখে ভয় পেয়ে বাচ্চা ফেলে পালিয়ে যায়। সেই চারটে বাচ্চাকে তাদের তিন মাস বয়েস পর্যন্ত বড় না হওয়া পর্যন্ত একেকটাকে দৈনিক সিকি লিটার করে মাদার ডেয়ারির দুধ খাওয়াতে হয়েছে। হিসেব করলে অনেক হয়, তুমি দেড় কুইন্টালের দামটাই দাও। তা ছাড়া এখন মাদার ডেয়ারির দুধের দাম অনেক বেড়ে গেছে, তুমি না হয় পুরনো দামটাই দাও।
প্রমীলাকান্ত: সব মিথ্যে কথা। আপনি ভঁহা কৃপণ। আপনার মেনি বেড়াল খেতে না পেয়ে পালিয়েছে, আমার ছবি দেখে ভয় পাবে কেন?
