.
গঙ্গামণি কখনও দোকানে বসে না। তবে বিকেলের দিকে বাড়ির কাজকর্ম বিশেষ কিছু না থাকলে দোকানের দিক দিয়ে একবার ঘুরে যায়। কখনও কখনও দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কেনাবেচা দেখে।
গঙ্গামণিকে বাজারের প্রায় সবাই চেনে। দোকানদাররা অনেকেই তাকে বউদি বলে, কেউ কেউ বলে গঙ্গাদি। নতুন ছেলেছোকরারা বলে কাকিমা বা মাসি।
শ্বশুরের আমলে এ দোকানে গঙ্গামণি একদিনই আসত বছরে, সেটা হল অক্ষয় তৃতীয়ার দিন। হালখাতাও হত সেদিন। সত্যনারায়ণ পুজো হত বাড়িতে। পুজোর পর এক মাথা ঘোমটা টেনে, হাতে কাঠের বারকোশ ভরতি করে ফলমূল, ঘরে তৈরি নারকেলের সন্দেশ, নাড়ু, বাতাসা, নকুলদানা নিয়ে গঙ্গামণি সন্ধ্যাবেলা দোকানে আসত।
এই প্রসাদটা বাজারের অন্য দোকানদারদের জন্যে। খদ্দেরদের আলাদা বন্দোবস্ত, কাগজের বাক্সে বোঁদে, গজা আর নিমকি। সেটা হালুইকরের দোকান থেকে আসত।
এ সব তিরিশ বছর আগের কথা। তখন এক সের জিনিসের যা দাম ছিল এখন একশো গ্রামের তাই দাম। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি।
তারপর শ্বশুর-শাশুড়ি গত হয়েছেন। এক পাগল ভাশুর ছিল, তিনি কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন, তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।
গঙ্গামণির পর পর তিনটি মেয়ে জন্মেছে। জন্মেছে, কিছুটা লেখাপড়া করেছে, বড় হয়েছে, পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে অল্পবিস্তর ফষ্টিনষ্টি করেছে। তারপর তাদের বিয়ে হয়েছে। বরের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে। এখন তাদের ভরা সংসার, কালে ভদ্রে বাপের বাড়িতে আসে।
.
গয়ারাম-গঙ্গামণির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এই গল্প নয়, তার জন্যে উপন্যাস লিখতে হবে।
আপাতত আমরা মাখনের প্রসঙ্গে একটু ফিরে যাচ্ছি। কারও ফ্রিজ আছে। কারও ফ্রিজ নেই। কেউ হয়তো একটু কৃপণ। কারও হয়তো আর্থিক সম্পত্তির অভাব আছে। গঙ্গামণি বিকেলের দিকে বেড়াতে বেড়াতে দোকানে এসে লক্ষ করেছে সবাই বারো টাকা দিয়ে এক প্যাকেট মাখন নিতে চায় না। কেউ বলে অর্ধেক দিতে, কেউ জিজ্ঞাসা করে, অল্প পাওয়া যাবে কি না।
এ সব দেখে গঙ্গামণির মাথায় একটু বুদ্ধি এল।
বুদ্ধিটা গোলমেলে। গয়ারাম প্রথমে সায় দেয়নি। কিন্তু স্ত্রীর পরামর্শ অগ্রাহ্য করার মতো মানুষ। জগৎসংসারে সামান্য যে কয়েকজন আছে তার মধ্যে গয়ারাম পড়ে না।
গঙ্গামণির ব্যাপারটা, মানে মাখন বেচার বুদ্ধিটা খুবই সরল।
বারো টাকার মাখনের প্যাকেটটা মধ্য দিয়ে ঠিক সমান সমান ভাবে ছুরি দিয়ে কেটে দুভাগ করতে হবে। এখন দুভাগের দামই যদি ছয় টাকা করা যায় তাহলে বিক্রি হয়তো সামান্য বাড়বে কিন্তু শেষ পর্যন্ত হিসেবে পোষাবে না। কিছু মাখন নষ্টও হতে পারে। গঙ্গামণি কিন্তু একটা উলটো কাজ করল, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা চলে না।
গঙ্গামণি প্রত্যেকটা মাখনের প্যাকেটকে সমান দু টুকরো করে, এক অংশের দাম করল সাড়ে ছয় টাকা, অন্য অংশের দাম সাড়ে পাঁচ টাকা।
গঙ্গারামের মাথায় হাত। হাফ প্যাকেট যদি সাড়ে পাঁচ টাকায় বেচা হয়, পুরো প্যাকেট এগারো টাকা। কেনা দামই যে উঠবে না।
গঙ্গামণি নির্বিকার। সে বলল, একবার পরীক্ষা করেই দেখা যাক না।
দোকানের মধ্যে নোটিশ আটকানো হল,
মাখন।
আধ প্যাকেট ৫-৫০, ৬-৫০
পরীক্ষা প্রার্থনীয়
অন্য কোথাও পাইবেন না।
এই নোটিশ দেওয়ার পরে মাখনের বিক্রি বাড়ল। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, গয়ারামের আশঙ্কা ধুলিসাৎ করে দিয়ে সাড়ে ছয় টাকার মাখনই বেশি বিক্রি হতে লাগল।
মাখন আধ টুকরো করে, ফ্রিজের মধ্যে দুটো আলাদা কাঁচের বাটিতে রাখা আছে। দেখা গেল সাড়ে ছয় টাকার বাটি যখন নিঃশেষে ফুরিয়ে গেছে, তখনও সাড়ে পাঁচ টাকার কাঁচের বাটি প্রায় ভর্তি। কেউই মাত্র এক টাকার জন্যে কম দামি মাখন নিতে চায় না।
ঘি-মাখন, দুধ-ডিম এই সব স্বাস্থ্যকর জিনিস লোকে বিশুদ্ধ ও খাঁটি কিনতে চায়। তাই বেশি দাম দিয়ে কিনতে আপত্তি করে না।
গয়া-গঙ্গার মাখনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সবাই ভাবে দাম বেশি যখন এই মাখনটা অনেক ভাল। দুটোই যে একই মাখন, এই বাটির সাড়ে ছয় টাকার মাখনের টুকরোগুলো যে গতকালই সাড়ে পাঁচ টাকার বাটিতে ছিল, খদ্দের সেটা জানেও না, এ নিয়ে তলিয়ে ভাবেও না।
মাখন বৃত্তান্ত পাঠ করে গঙ্গামণির বুদ্ধির ওপর পাঠকদের নিশ্চয় একটু আস্থা হয়েছে।
এবার গল্পের শেষ অংশে সন্ধ্যাবেলায় ফিরে যাই।
সেই যে অ্যালার্ম ঘড়ির কথা লিখেছি, দোকানের শো-কেসের ওপরে গণেশঠাকুরের পাশে আছে। সেই পুরনো ঘড়িটাকে এবার গঙ্গামণি রবিবারের বিকেলের বিক্রিবাটা বাড়ানোর কাজে লাগাল।
গল্প অতিরিক্ত না বাড়িয়ে গঙ্গামণির বুদ্ধিটা একটু সংক্ষিপ্ত করে বলছি।
প্রতি রবিবার সকালে গঙ্গামণি নিজের হাতে ঘড়িটায় দম দেয়। অ্যালার্মের স্প্রিংয়েও দম দেয়, দিয়ে ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা থেকে আটটার মধ্যে কোনও একটা সময়ে অ্যালার্ম বাজিয়ে রাখে।
একেকদিন একেক রকম সময়ে অ্যালার্ম বাজে। কোনওদিন সোয়া পাঁচটায়, কোনও দিন সাড়ে ছটায়, কোনও দিন পৌনে আটটায় বা অন্য কোনও সময়ে। অবশ্য অধিকাংশ রবিবারই আটটার। কাছাকাছি সময়ে অর্থাৎ দোকান বন্ধ করার একটু আগে অ্যালার্ম বাজে।
চাবি দেওয়া হয়ে যাবার পরে শো-কেসের ওপরে একটা ছোট তোয়ালে দিয়ে ঘড়িটা ঢেকে রাখে গঙ্গামণি। ঘড়ির ডায়ালটা দেখতে না পারায় কেউ বুঝতে পারে না কখন অ্যালার্মটা বাজবে।
