গয়ারাম অবশ্য এ কাজটা, এই নামকরণের ব্যাপারটা সচেতন ভাবে করেনি। এর গুরুত্বও সে বোঝে না। বোঝার দরকারও নেই।
সপ্তাহের শেষে রবিবার বিকেলে ও সন্ধ্যায় বাজারে-দোকানে ভিড় খুব কম হয়। কেনাকাটা প্রায় থাকে না বললেই চলে।
অনেক বাজারই রবিবারের সন্ধ্যায় বসে না। যেসব বাজার খোলা থাকে, সমস্ত দোকান খোলা থাকে না। অধিকাংশ বন্ধ।
রবিবার অপরাহ্নে যাঁরা বাজারে আসেন প্রায় সকলেই মহিলা, বাড়ির গিন্নি বান্নি। সপ্তাহান্তিক মোটা বাজারটা বাড়ির কর্তারা শনিবার ছুটি থাকলে ওই দিন সকালে বা সন্ধ্যায় সেরে ফেলেন। না। হলে রবিবারের সকালে।
রবিবার সন্ধ্যায় গৃহিণীরা বাজারে আসেন প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়, খুচরো বা শৌখিন কিছু কেনাকাটা করতে। পাশের বাড়ির তমালী এক পাতা চৌকো বিন্দি কিনেছে, তাই শ্যামলী কিনতে এসেছেন এক পাতা ছক্কা বিন্দি। এই রকম আর কী। যাঁরা জানেন না, এসব বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন।, যাদের বিদ্যাবুদ্ধি খবরের কাগজের হেডলাইন পর্যন্ত, তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই যে, বিন্দি হল মেয়েদের কপালের রঙিন (এবং সাদা) এক পিঠে আঠা লাগানো টিপ। চৌকো আর ছক্কা বিন্দি হল, যথাক্রমে চতুর্ভুজ এবং ষড়ভুজ আকারের।
তবে শুধু বিন্দিই নয়, সদ্য দূরদর্শনে দেখা দুর্গন্ধ দূরীকরণ সাবান, জীবানুনাশক টুথপেস্ট, বর্ণে-গন্ধে অনুপম গুঁড়োমশলা রবিবার সন্ধ্যায় তমালী দেবী, শ্যামলী দেবীরা কিনতে বেরোন।
রবিবারের সন্ধ্যাটাই গৃহিণীদের নিজস্ব সময়। ছেলেমেয়েদের ইস্কুল থেকে ফেরার ব্যাপার নেই। ক্ষুধার্ত গৃহকর্তার ঘর্মাক্ত কলেবরে অফিস কাছারি সেরে বাড়ি আসা নেই। এমনকী কাজের মেয়েটিরও এই অপরাহ্নে ছুটি।
গৃহিণীরা বাজারে আসেন, কিন্তু এই সন্ধ্যায় অতি অল্প দোকান খোলা থাকে। তার মধ্যে একটি হল এই আমাদের গয়া-গঙ্গা ভ্যারাইটি স্টোরস।
গয়ারাম জানেন খদ্দের হিসেবে মেয়েরা ভাল। অধিকাংশ ওজন ব্যাপারটা কিছুই বোঝে না, হিসেবও ভাল করতে পারে না।
আর আজকের বাজারে হিসেব করাও কম কঠিন নয়। সাড়ে তেরো টাকা দরের জিনিস আড়াইশো গ্রাম কিনে দশ টাকার নোট দিলে কত ফেরত পাওয়া যাবে এ হিসেব করতে গেলে বাঘা বাঘা অঙ্কের ছাত্রেরা হিমশিম খেয়ে যায়। গৃহবধূরা পারবেন এরকম আশা করা যায় না।
মোট কথা গৃহবধূরা হিসেব করতে পারেন না, ওজন বোঝেন না। খদ্দের হিসেবে অবশ্যই লোভনীয়।
কিন্তু তাই বলে গয়ারাম যে মহিলাদের দোকানে পেলেই ঠকায় তা কিন্তু নয়। গয়ারামের হাত নিশপিশ করে, মন চুলবুল করে ঠকানোর জন্যে। কিন্তু সাহস পায় না, গঙ্গামণির নিষেধ আছে।
গঙ্গামণির বক্তব্য খুব সোজা, ওজনের হেরফের, দামের গোলমাল করে অন্যান্য খদ্দেরদের যতটা ঠকানো হয় মহিলাদের তার চেয়ে বেশি ঠকানো চলবে না। আমি নিজে মহিলা হয়ে আমার দোকানে মহিলাদের অতিরিক্ত ঠকাতে দেব না।
এ কারণে গয়া-গঙ্গা ভ্যারাইটি স্টোরসের ব্যবসায়ে লাভ হয়তো কিছু কম হয়। কিন্তু গঙ্গামণি সেটা পুষিয়ে দিয়েছে নতুন একটা কায়দা করে। গয়া-গঙ্গা ভ্যারাইটি স্টোরসের দেয়াল ঘেঁষে কাঁচের টানা শো-কেস রয়েছে। সেই শো-কেসের মাথায় একটা গণেশ মূর্তি রয়েছে। রোজ দুবেলা সেই মূর্তিতে ধূপধুনো দিয়ে, আলো জ্বালিয়ে পুজো করা হয়। সেই গণেশ ঠাকুরের একপাশে রয়েছে। একটা অতি পুরনো অ্যালার্ম ঘড়ি। ঘড়িটা গয়ারামের বাবা গয়ারামকে কিনে দিয়েছিলেন, সেই যখন সে ইস্কুলে পড়ত।
এই অ্যালার্ম ঘড়িটা খুব কাজে লাগিয়েছে গঙ্গামণি। গঙ্গামণির পরামর্শে গয়ারাম দোকানের ভেতর এবং বাইরে দুটো বড় নোটিশ দিয়েছে:
নোটিশ
প্রতি রবিবার বৈকাল বেলায়
অভাবনীয় লাভের সুযোগ।
ভেতরে অনুসন্ধান করুন।
ভেতরে অনুসন্ধান মানে গয়ারাম কিংবা তার তিন বালক কর্মচারীর কাছে জিজ্ঞাসা করলে যা জানা যাচ্ছে সে যেমনি চমকপ্রদ, তেমনি অভিনব।
স্বীকার করা উচিত, কস্মিনকালেও কোনও মুদির দোকানে এ জাতীয় কিছু দেখা যায়নি। এ বিষয়ে পরে বলছি। যেহেতু বুদ্ধিটা বেরিয়েছে গঙ্গামণির মাথা থেকে তাই তার আগে গঙ্গামণি প্রসঙ্গে একটু আসা যেতে পারে।
ব্যবসায়িক ভাষায় একটা পুরনো চালু কথা আছে Sleeping partner। এর সরাসরি মানে হল ঘুমন্ত অংশীদার। অনেক সময় টাকাওয়ালা লোকেরা ব্যাঙ্ক, পোস্টঅফিস কিংবা কোম্পানির ফিক্সড ডিপোজিটের সুদের চেয়ে কোনও নির্ভরযোগ্য লোকের ব্যবসায়ে টাকা ঢালেন বেশি আয়ের আশায়। তারা কিন্তু কিছুই করেন না সেই ব্যবসায়ের জন্য। তারা শুধুই মূলধন জোগান আর অন্যে খাটে। লাভ সমান সমান ভাগ হয়।
এই রকম ভাবে যারা টাকা খাটান তাদের বলা হয় স্লিপিং পার্টনার বা ঘুমন্ত অংশীদার।
গয়া-গঙ্গা ভ্যারাইটি স্টোরসের ক্ষেত্রে ওই স্লিপিং পার্টনার কথাটা আক্ষরিক অর্থে সত্য। স্বামী-স্ত্রী এক বিছানায় ঘুমোয় আবার তারা দুজনে একই ব্যবসার অংশীদার। সুতরাং গয়ারাম এবং গঙ্গামণি এরা দুজনে আদর্শ স্লিপিং পার্টনার।
তবে কোনও অর্থেই গঙ্গামণি ঘুমন্ত অংশীদার নয়। দোকানের ব্যাপারে গঙ্গামণির অনেক রকম কূটবুদ্ধি গয়ারামের কাজে লাগে।
মাখনের ব্যাপারটাই ধরা যাক। গঙ্গামণি যে পরামর্শ দিয়েছিল সেটা প্রথমে নির্ভরযোগ্য মনে হয়নি গয়ারামের।
