বুঝতে পারলাম এই বাড়িতে আমার আগের বাসিন্দা যিনি ছিলেন, তিনি ভুল করে এই ফটোটি ফেলে রেখে চলে গিয়েছেন। শেষ মুহূর্তে দেয়াল থেকে ছবিটি খুলে নিয়ে যেতে ভুলে গেছেন।
এই ফ্ল্যাটের সেই পূর্ববর্তী বাসিন্দা, মিস্টার তরফদার, চাকরিসূত্রে আমার যথেষ্ট পরিচিত। এই গ্রুপ ফটোগ্রাফের মধ্যে রয়েছেন হয়তো তার কোনও নিকট আত্মীয়, বাবা বা ঠাকুরদা। তাঁদের মূল্যবান পারিবারিক স্মৃতিচিহ্ন এই ফটোটা।
আমার পুরনো অফিস থেকে মিস্টার তরফদার দিল্লি বদলি হয়েছেন। সেখানে গিয়ে তার দিল্লি অফিসের ঠিকানা সংগ্রহ করে তাঁকে ওই ভুলে ফেলে যাওয়া ফটোটি সম্বন্ধে জানালাম ও লিখে দিলাম : ফটোটা দেয়ালে যেখানে ছিল সেখানেই থাকছে, ওটায় আমি হাত দিচ্ছি না। তিনি যদি কখনও কলকাতায় আসেন, আমাদের এখান থেকে যেন ওটা নিয়ে যান।
কয়েকদিন পরেই মিস্টার তরফদারের চিঠি এলো, এবং তার চিঠি পড়ে আমি অবাক হয়ে গেলাম। তিনি লিখেছেন, ওই ফটোর কোনও ব্যক্তির সঙ্গে তার কিংবা তার পরিবারের কারও কোনও সংস্রব নেই। তাদের বংশের কেউ কখনও গয়ায় বাস করেনি, দু-একবার পিণ্ড দিতে গিয়েছেন, কিন্তু সেই পর্যন্তই।
মিস্টার তরফদারের চিঠি পড়ে আরও জানলাম যে, তিনিও এসে দেয়ালে ঝোলানো অবস্থায় ফটোটি পেয়েছিলেন এবং আমারই মতো তার পূর্ববর্তী বাসিন্দাকে যোগাযোগ করে ফটোটি ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। দুঃখের বিষয় তিনি ফটোটি ফেরত দিতে পারেননি, কারণ সেই পূর্বতর বাসিন্দা ফটোটির দায়িত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন এবং জানান যে, তিনিও বাড়িতে এসে দেয়ালে ঝোলানো অবস্থায় ফটোটি পেয়েছিলেন।
আমার যদি অনেক সময় থাকত এবং সরকারি নথি খুলে আমার বর্তমান ফ্ল্যাটের প্রাক্তন বাসিন্দাদের তালিকা ও নাম-ঠিকানা জোগাড় করে একে একে যোগাযোগ করতে পারতাম, হয়তো প্রকৃত মালিকের কাছে, যিনি প্রথমবার ভুল করে ছবিটি ফেলে রেখে যান, তার জিনিস ফেরত দিতে পারতাম।
কিন্তু সে বড় কঠিন কাজ। ছবিটি তোলা হয়েছিল উনিশশো চব্বিশ সালে আর আমাদের এই সরকারি ফ্ল্যাট বাড়িটায় সরকারি কর্মচারীর বসবাস শুরু হয়েছে পঞ্চাশ দশকের শুরু থেকে।
এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে আমিই শুধু একটানা আট বছর আছি। অন্যেরা কেউ দুবছর, বড় জোর আড়াই বছর। কেউ কেউ তার চেয়ে কম সময়েও থেকেছেন।
মোটমাট অন্তত জনা-দশ-বারো সরকারি কর্মচারী আমার আগে এ বাসায় থেকে গেছেন। খোঁজ নিয়ে দেখলাম, তাদের মধ্যে কয়েকজন ইতিমধ্যে লোকান্তরিত হয়েছেন, একজন সন্ন্যাসী হয়ে গেছেন, আর অন্য একজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ সরকারি তহবিল তছরুপ করে যথাকালে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন।
সুতরাং অনেক রকম চিন্তা করে আমি আর এই ফটোর মালিককে খুঁজে বার করার চেষ্টা করিনি। আমার পূর্বের বাসিন্দারা যা করেছিলেন, আমিও ঠিক তাই করেছি। দেয়ালে ঠিক যে জায়গায় ফটোটা ছিল সেখানেই রেখে দিয়েছি, একটুও নড়চড় করিনি। শুধু চুনকামের সময় খুলে একটু সরিয়ে রাখি, আবার চুনকাম সারা হয়ে গেলে ফটোর ওপরের কাঁচটা ভাল করে মুছে দেয়ালের নির্দিষ্ট স্থানে টাঙিয়ে দিই, সাদা দেয়ালে কালো কোট, চাপকান পরা পুরনো কালের ভারী ভারী মানুষদের চমৎকার মানায়।
আমাদের বাইরের ঘরে কেউ এলেই ছবিটার দিকে তাঁর নজর যায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ জানতে চান, আপনারা কি আগে গয়ায় থাকতেন? আমি এই প্রশ্নের কোনও সরাসরি উত্তর দিই না, শুধু একটু মৃদু হাসি।
গয়া-গঙ্গা ভ্যারাইটি
বন্ধুতে বন্ধুতে, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে নানা রকমের যৌথ কারবার হয়।
রাস্তাঘাটে, খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনে হামেশাই দেখতে পাওয়া যায় চক্রবর্তী অ্যান্ড চ্যাটার্জি কোম্পানি কিংবা জি.সি. দত্ত অ্যান্ড সনস। অবশ্য শুধুমাত্র সনসেই ব্যাপারটা সীমাবদ্ধ নয়।
এ পাড়াতেই মোড়ের মাথায় আছে, কে. কে. মিটার অ্যান্ড গ্র্যান্ডসনসের ঘড়ির দোকান। তার থেকে কিছুটা এগিয়েই ঘোষ ব্রাদার্সের মিষ্টির দোকান। সনস এবং ব্রাদার্সের পরেও একটু এদিক ওদিক খোঁজ করলেই নেফিউ, কাজিন এদেরও দেখা যায়। দরজি মহম্মদ আলি অ্যান্ড নেফিউ, গয়নার দোকান দত্ত কাজিনস খুবই বিখ্যাত।
সুতরাং গয়া এবং গঙ্গা দুইজনে মিলে একটি ভ্যারাইটি স্টোরস খুলেছে, তাতে বিস্ময়ের ব্যাপার কিছু নেই। অন্তত, আপাতত তাই মনে হয়।
কিন্তু ব্যাপারটা অন্য রকম। গয়া-গঙ্গা এই দুজনে পিতাপুত্র, ভাইবন্ধু, আত্মীয়স্বজন নয়।
গয়া-গঙ্গা পরস্পর সম্পর্ক হল যে তারা স্বামী-স্ত্রী। সংক্ষেপে নাম গয়া-গঙ্গা হলেও পুরো নাম হল গয়ারাম দাস এবং গঙ্গামণি দাসী।
বাজারের মধ্যে একটা পুরনো, পারিবারিক মুদির দোকান ছিল গয়ারামদের। গঙ্গামণির অপুত্রক পিতার মৃত্যুর পর সে কিছু ধনসম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পায়। তারই কিছু অংশ ব্যবহার করে নামহীন মুদির দোকানের জায়গায় কাঁচের রঙিন সাইনবোর্ড ফ্লুরোসেন্ট আলো জ্বালা গয়া-গঙ্গা ভ্যারাইটি স্টোরস হয়েছে।
গয়ারাম অকৃতজ্ঞ নয়। স্ত্রীর টাকা নিজ ব্যবসায়ে অনেকেই বিনিয়োগ করে। কিন্তু সে এটাকে। কাগজপত্রে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ ব্যবসা করেছে, যা একেবারে অভিনব। এবং তেমনি অভিনব এই গয়া-গঙ্গা ভ্যারাইটি স্টোরস নামকরণ, উভয়েরই নামে কোনও দোকান আর বোধহয় কোথাও। নেই। দেশে বিদেশে হাজার জায়গা খুঁজেও ওরকম নামের একটা ব্যবসা বা দোকান খুঁজে পাওয়া যাবে না।
