সমস্ত জীবন মহীতোষবাবু স্ত্রীর ভয়ে সন্ত্রস্ত ছিলেন। টিপে টিপে, মেপে মেপে চলতেন। কীসে কী দোষ হয়, গাফিলতি হয় কিছুই অনুমান করতে না পেরে দুরুদুরু বক্ষে সদাসর্বদাই স্ত্রীর হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতেন।
জামাকাপড়, জুতো নতুন কিছু কিনলেই সেটা মহীতোষিণী দেবীর নজরে পড়ত এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি মহীতোষবাবুকে জানিয়ে দিতে দ্বিধা বোধ করতেন না যে এগুলো ভদ্রলোকের ব্যবহাযোগ্য নয়। তিনি স্বামীর রুচিবোধ নিয়ে ধিক্কার দিতেন, টিটকিরি কাটতেন।
মহীতোষবাবুর খাবার-দাবার সম্পর্কে তাঁর ছিল ভয়াবহ সতর্কতা। দেড় কেজি ইলিশ মাছ হয়তো মহীতোষবাবু বাজার থেকে এনেছেন তার থেকে দুবেলায় মাত্র দু টুকরো মাছ বরাদ্দ মহীতোষবাবুর। এক কেজি মাংস আনলেও ওই দুটুকরো দিনে রাতে। কোনও দিন প্রাণভরে বাসায় খেতে পাননি মহীতোষবাবু, তাই ইদানীং এদিকে ওদিকে লুকিয়ে চুরিয়ে খারাপ ভাল দ্রব্যাদি নিজে কিনে খেতেন।
আজ মহীতোষবাবু মারা যাবেন। তার দীর্ঘ, নির্যাতিত জীবনের এই শেষ দিনে এসব কথা স্মরণ করে লাভ নেই।
একটু আগে ডাক্তার এসে ঘুরে গেছেন। নাড়ি দেখে, স্টেথসকোপ দিয়ে হৃৎস্পন্দন পরীক্ষা করে ডাক্তারবাবু গম্ভীর মুখে চলে গেছেন।
বোধ হয় আর কিছুক্ষণ মাত্র। ব্যাপারটা মহীতোষবাবুও বুঝতে পেরেছেন। বুঝতে পেরেছেন, তার বিদায় আসন্ন।
কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল মহীতোষবাবুর জ্ঞান, বুদ্ধি সব কিন্তু টনটনে রয়েছে। চোখেও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন, কানেও মোটামুটিও শুনতে পাচ্ছেন। তার শয্যার পাশেই ছেলেমেয়ে, দু-চারজন আত্মীয়স্বজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের সঙ্গে কখনও কখনও দু-চারটে কথাও বলছেন।
সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে। মহীতোষবাবুর এই একতলায় শোয়ার ঘরে বাইরে থেকে দক্ষিণের খোলা দরজা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আসছে। বছর কয়েক আগে শেয়ালদায় রথের মেলা থেকে একটা গোলাপ গাছ কিনে এনেছিলেন তিনি, সেটা লাগিয়েছিলেন ওই দক্ষিণের দরজার বাইরে বারান্দার নীচের উঠোনে।
দুয়েকটা গোলাপ ফুটেছে তার মৃদু গন্ধ আসছে বাতাসে। কে একজন ঠান্ডা হাওয়া আসছে বলে দরজাটা বন্ধ করতে যাচ্ছিল, মহীতোষবাবু তাকে হাত নেড়ে বারণ করলেন। তার ঘ্রাণশক্তি এখনও বেশ প্রবল রয়েছে, এই শেষসন্ধ্যায় গোলাপের মধুর গন্ধ তার বেশ ভালই লাগছে।
এমন সময় অন্য একটা সুঘ্রাণ এসে তাকে চনমনে করে তুলল। খেজুরে গুড়ের পাকের গন্ধ। দুয়েকবার শুকে তিনি তার মাথার কাছে দাঁড়ানো মেয়ে অনুকণাকে বললেন, রান্নাঘরে তোর মা বোধ হয় খেজুরে গুড়ের সন্দেশ বানাচ্ছে? অনু বলল, হ্যাঁ ঠিকই তাই।
মৃত্যুমুখী মহীতোষবাবু কেমন প্রলুব্ধ হয়ে পড়লেন, মেয়েকে বললেন, দ্যাখ, তোর মা তো সারাজীবন আমাকে ভাল-মন্দ কিছুই খেতে দেয়নি। আজ যা তো, রান্নাঘর থেকে দুটো সন্দেশ নিয়ে আয়, মরার আগে খেয়ে যাই।
মেয়ে মাকে ভালই চেনে। একটু দোনামনা করে সে রান্নাঘরে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে মুখ কালো করে ফিরে এল।
মহীতোষবাবু মেয়েকে বললেন, কীরে, সন্দেশ কী হল?
মেয়ে বলল, মা দিল না। ও সন্দেশগুলো শ্মশানবন্ধুদের জন্যে বানানো হচ্ছে। তুমি মারা যাওয়ার পরে তোমাকে পুড়িয়ে ফিরে এসে তারা ওই সন্দেশগুলো খাবে। ওর একটাও তোমার জন্যে নয়।
গয়া ১৯২৪
শেষবার আমরা যখন বাড়ি বদলালাম, অর্থাৎ আগের বাড়ি ছেড়ে এখনকার বাড়িতে এলাম, সে প্রায় আট বছর আগের কথা।
লোকে যখন একটা বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়ি যায়, অনেক জিনিস ফেলে আসে; কিছু ভুলে ফেলে আসে, আবার কিছু ইচ্ছে করেও ফেলে আসে। অনেক সময় বড় বাড়ি থেকে ছোট বাড়িতে উঠে যাওয়ার সময় অনেক কিছুই ছেড়ে যেতে হয়।
কিন্তু এ যাত্ৰা আমরা এসেছিলাম আগের থেকে বেশ একটু বড় বাড়িতে, ফলে আগের বাড়ির প্রায় সবকিছুই ঝেটিয়ে নিয়ে এসেছিলাম।
কিন্তু সেটাই সব নয়। এ বাড়িতে এসে আমরা কতকগুলো জিনিস উপরি পেয়ে গেলাম।
এটা একটা সরকারি বাসাবাড়ি। আমার চাকরির সুবাদে সরকার থেকে আমাকে থাকতে দেওয়া হয়েছে, আমার আগে যিনি ছিলেন, তিনি তখন বদলি হয়ে দিল্লি চলে গেছেন। ফলে অনেক ছোটখাটো জিনিসই তিনি নিয়ে যেতে পারেননি।
আরও দু-চার মাস ব্যবহার হতে পারত এমন দুটো ঝাটা ও একটা বড় পাপোশ, অল্প ভাঙা কিন্তু বেশ কাজ চলে যায় এমন একজোড়া শিল-নোড়া, মরচেধরা পাখিহীন শূন্য একটা লোহার খাঁচা, একটা কুকুরের চেন, দুটো পুরনো বকলস–এই সব জিনিস তো ছিলই, আর ছিল কিছু শূন্য বোতল, পুরনো বই ও ম্যাগাজিন।
কিন্তু এ সমস্ত ছাড়াও বাড়িতে আমরা আরেকটা জিনিস পেয়েছিলাম। সেটা একটা ফটো, বাইরের ঘরের দেয়ালে টাঙানো কাঁচের ফ্রেমে বাঁধানো একটা পুরনো ফটোগ্রাফ।
ফটোগ্রাফটি অনেক পুরনো, উনিশশো চব্বিশ সালের। গয়া জেলা আদালতের বার লাইব্রেরির কর্মকর্তা ও সদস্যদের গ্রুপ ফটো। কালো কোট ও চাপকান পরা একদল নানা বয়েসের উকিল, তাদের অনেকেরই বড় বড় গোঁফ, দু-চারজনের লম্বা দাড়িও আছে। ছবির নীচে ধারাবাহিকভাবে সকলের নাম লেখা। সম্ভবত বার লাইব্রেরির বারান্দার সামনের সিঁড়িতে ছবিটা তোলা হয়েছিল। সিঁড়ির বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন উচ্চতায় উকিলবাবুরা গম্ভীরমুখে দণ্ডায়মান রয়েছেন। ছবির ওপরে ইংরেজিতে সন এবং লাইব্রেরির নাম লেখা রয়েছে, যেমন থাকে এধরনের সব ছবিতে।
