রমেশ এ ব্যাপারটা বুঝল। কিন্তু অন্য একটা ব্যাপারে নকুলবাবুর ওখানে রমেশের পোষালো। রমেশকে আগে ডাক্তারবাবুর ওখানে নকুলবাবু দেখেছেন, কিন্তু তার নামটা জানতেন না। যখন জানলেন নতুন চাকরের নাম রমেশ, তিনি একটু বেকায়দায় পড়লেন, কারণ তার শ্বশুরের নামও রমেশ। তিনি রমেশকে বললেন, তোমাকে আমরা রমেশ না বলে গদাই বলে ডাকব।
কিন্তু রমেশ গরিব হলে কী হবে, তার আত্মাভিমান অতি প্রখর। সে প্রতিবাদ করল, না, আমাকে রমেশ নামেই ডাকবেন। গদাই আবার একটা নাম নাকি!
ব্যাপারটা ঝুলে রইল। কিন্তু নকুলবাবুর সাহস নেই পূজনীয় শ্বশুরমশায়ের নামে চাকরকে ডাকেন। তিনি ওরে, হরে করে চালাতে গেলেন।
এ ব্যাপারটাও রমেশের অপছন্দ। এমন চমৎকার তার একটা নাম, এর আবার ওরে, হরে কী?
ইতিমধ্যে অন্য একটা ব্যাপার ঘটেছে। রাস্তার ওপরেই থাকেন এক নবীনা চিত্রতারকা ও তার তৃতীয় স্বামী। মহিলা অতি নাবালিকা বয়েস থেকেই সাতিশয় পক্ক এবং একাধিক স্বামী ও স্বামীস্থানীয়ের কণ্ঠলগ্না হয়েছেন। তার বাড়িতে অনিবার্য নানা কারণে কাজের লোক থাকে না। সুন্দরীর বর্তমান স্বামী একটি উপযুক্ত কাজের লোকের সন্ধানে আকাশ-পাতাল খুঁজছিলেন। নিজের নামের প্রশ্নে দ্বিধা ও সংশয়ে আচ্ছন্ন রমেশকে ভাঙিয়ে নিতে তাঁর এক মুহূর্ত সময়ও লাগল না। এর চেয়ে তার অনেক বেশি সময় এবং পরিশ্রম ব্যয় হয়েছিল সুন্দরীকে তার দ্বিতীয় স্বামীর হাত থেকে ভুলিয়ে আনতে।
সে যা হোক, রমেশ এই চিত্রতারকার বাড়ি থেকে প্রথম দিনেই, বলা উচিত সন্ধ্যাবেলাতেই, বিতাড়িত হল। সন্ধ্যাবেলা তারকা শয়নঘরে সাজগোজ করছেন। এমন সময় বাইরের দরজায় বেল বাজল। রমেশ গিয়ে দরজা খুলে তিনজন সুসজ্জিত ভদ্রলোককে ড্রইংরুমের সোফায় বসাল। তারপর ভিতরের ঘরে গিয়ে সুন্দরীকে খবর দিল। সুন্দরী এতক্ষণ এঁদের প্রতীক্ষা করছিলেন, এঁরা তার আগামী ছবির প্রযোজক এবং প্রযোজকের বন্ধুরা। নকুলবাবুর বাড়িতে সদ্য রপ্ত করা বুলিতে রমেশ সুন্দরীকে জানাল, বাইরের ঘরে তিনজন খদ্দের এসেছে। সুন্দরীর হাত থেকে পাউডারের পাফ পড়ে গেল। সুন্দরীর স্বামী বিছানায় শুয়ে চিত হয়ে সিগারেট টানছিলেন।
খদ্দের এসেছে শুনে তার মাথায় কেন যেন রক্ত উঠে গেল, রমেশকে কান ধরে হিড়হিড় করে টানতে হারামজাদা, রাস্কেল ইত্যাদি অবর্ণনীয়, অকথ্য গালাগাল দিতে দিতে ভাঙা সুটকেস সমেত পিছনের দরজা দিয়ে গলাধাক্কা দিয়ে বার করে দিলেন।
ওই বসে রয়েছে রমেশ। সে তার দুঃখিনী মায়ের কাছে ফিরে যাচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও সে শহরে এসে বুঝতে পারেনি, বাবুদের বাড়িতে যারা আসে তারা মক্কেল, না পেশেন্ট, না খদ্দের? নাকি আরও কিছু আছে?
খেজুরে গুড়ের সন্দেশ
মহীতোষবাবুর বয়েস ষাটের খারাপ দিকে, এখনও সত্তরের ঘরে পৌঁছতে দু-তিন বছর লাগবে। কিন্তু তার জীবনের মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে; অদ্য শেষ দিবস বা শেষ রজনী, মহীতোষবাবুর পরমায়ু আজকেই শেষ।
মারাত্মক অসুখ হয়েছে মহীতোষবাবুর। এখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে জীবনের শেষ প্রহর গুনছেন।
কী অসুখ? কেন অসুখ? কেমন অসুখ? কবে থেকে অসুখ?
এই সামান্য সংক্ষিপ্ত রম্যরচনায় এসব প্রসঙ্গে যাওয়া অনুচিত হবে। তা ছাড়া যেকোনও অসুখের আদ্যন্ত বিবরণ খুব ক্ষতিকর, মন খারাপ করে, দুশ্চিন্তা হয়, ভয় হয় এই অসুখ হয়তো আমারও হয়েছে, বিশেষ করে অসুখের লক্ষণগুলো খুব চট করে মিলে যায় নিজের সাম্প্রতিক দেহকষ্টের সঙ্গে।
আর তা ছাড়া, এই রম্য গল্পে অসুখ ব্যাপারটা গৌণ, মুখ্য ব্যাপার হল মৃত্যু, মহীতোষবাবুর মৃত্যু, যে ব্যাপারটা অনতিদূরেই রয়েছে।
মহীতোষবাবু বিছানায় শুয়ে ধুঁকছেন। মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছেন।
ডাক্তার গতকাল সকালেই জবাব দিয়ে দিয়েছেন, আর আশা নেই। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের খবর পাঠানো হয়েছে। তাঁরা ঘন ঘন সশরীরে উপস্থিত হয়ে, টেলিফোন করে মহীতোষবাবুর শেষ অবস্থার খবর নিচ্ছেন।
মহীতোষবাবুর এক ছেলে। এক মেয়ে। ছেলে মহীতোষবাবুর সঙ্গেই থাকে, এখনও বিয়ে করেনি। বয়েস সাতাশ-আটাশ। সে গত দুদিন ধরেই বাবার শরীরের অবস্থার অবনতি দেখে অফিসে যাচ্ছে না, ক্যাজুয়াল লিভ নিয়েছে।
মহীতোষবাবুর মেয়ে ছেলের চেয়ে বছর দুয়েকের বড়। তিন বছর আগে আসানসোলে তার বিয়ে দিয়েছেন। এখনও ছেলে-পিলে কিছু হয়নি। সে আজ সকালের ট্রেনেই বাবার অবস্থার খবর পেয়ে আসানসোল থেকে তার বাপের বাড়ি মহীতোষবাবুর এই দমদম নাগেরবাজারের বাসায় চলে এসেছে।
মহীতোষবাবুর ছেলে আর মেয়ে দুজনের নামই অনু, অনুতোষ আর অনুকণা।
এ ছাড়া এই নাগেরবাজারের বাড়িতে আছেন মহীতোষবাবুর স্ত্রী, দুই অনুর মা। তার নামটা জানা হয়নি। আপাতত তাকে মহীতোষিণী বলে উল্লেখ করলেই কাজ চলে যাবে।
কিন্তু শ্রীযুক্তা মহীতোষিণীকে এতটা দায়সারাভাবে নেওয়া উচিত নয়। তিনিই এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিয়োগান্ত কাহিনির নায়িকা।
দীর্ঘ তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর দাপটের সঙ্গে সংসার চালিয়েছেন মহীতোষিণী দেবী। দাপটটা অবশ্য শতকরা একশো ভাগই পতিদেবতা মহীতোষবাবুর ওপর। তবে দু-চারবার ছেলেমেয়ে, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন অথবা বাড়ির কাজের লোক এদের ওপরে দাপট খাটাতে যাননি তা নয়, কিন্তু যা হয় আর কী, তেমন সুবিধে করতে পারেননি। অবশেষে পুরো দাপটটাই মহীতোষবাবুর ওপর দিয়ে গেছে।
