দু-একদিনের মধ্যে খটকা লাগল ডাক্তারবাবুর, রোগী আবার মক্কেল হল কী করে? ছোকরা চাকরটা ইয়ার্কি করছে না তো? এক আধপাগল উকিল এসেছিলেন ডাক্তারকে দেখাতে, তাঁর মাথার মধ্যে অহরহ টং টং করে কী একটা বাজে, বেজেই যায়। তিনি রমেশের মুখে মক্কেলবাবু সম্বোধন শুনে হেসে কুটিপাটি। তাঁর মাথার টং টং ভুলে তিনি ডাক্তারবাবুকে না দেখিয়েই রাস্তায় বেরিয়ে গেলেন হাসতে হাসতে। সেদিন সন্ধ্যায় একমাত্র পাগল বেপাত্তা হয়ে যাওয়ায় ডাক্তারবাবু রমেশের উপরে খেপে গেলেন। পরে অনেক কষ্ট করে রমেশকে শেখালেন, আমার কাছে যারা আসে তারা মক্কেল নয়, পেশেন্ট।
রমেশের বঙ্গোপসাগরীয় জিহ্বায় যত সহজে মক্কেল কথাটা আসে পেশেন্ট তত সোজা নয়। অনেক কসরত করে সে শেষ পর্যন্ত পিসেন্ট বলা শিখে উঠতে পারল। পিসেন্টদের চেয়ার ঝেড়ে বসিয়ে সে ডাক্তারবাবুকে ডাকতে যেত, বাবু, পিসেন্ট এসেছে।
মোটামুটি চালিয়ে যাচ্ছিল রমেশ। কিন্তু ফ্যাসাদ বাধল ডাক্তারবাবুকে নিয়ে। ডাক্তারবাবুর একটা মারাত্মক খারাপ ব্যাপার ছিল, সন্ধ্যার পর সেজেগুঁজে রোগী দেখার নাম করে বেরোতেন আর সহজে গৃহমুখী হতে চাইতেন না। একেকদিন গভীর রাতে পা টিপে টিপে চোরের মতন ঘরে ঢুকতেন। চেম্বারের বাইরের দরজায় খুব আস্তে দুটো টোকা দিলে, রমেশ রাতে চেম্বারের মেঝেতে শুত, সে দরজাটা আলগোছে খুলে দিত। এই রাতে বাড়ি ফেরা নিয়ে ডাক্তার-গিন্নির সঙ্গে ডাক্তারবাবুর কোনও কোনও সময় তুলকালাম কাণ্ড হত।
বিপদ হয়েছিল রমেশের। তাকেই সাক্ষী মানতেন ডাক্তারগিন্নি, তুই বল তো, ঠিক কটায় বাড়ি ফিরেছে? চেম্বারে একটা দেয়ালঘড়ি আছে, ভদ্রমহিলা রমেশকে ঘড়ি দেখা ভাল করে শিখিয়ে নিয়েছিলেন স্বামীর ফেরার হিসেব রাখতে। কারণ তিনি নিজে কদাচিৎ কষ্ট করে ঘুম থেকে উঠে স্বামীর ফেরার তদারকি করতেন। যা চেঁচামেচি, তাণ্ডব সেটা করতেন সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে চা-টা খেয়ে, নিজের সুবিধাজনক সময়ে। ফুটন্ত কড়া ও উনুনের মধ্যে অর্থাৎ ডাক্তারবাবুর আর ডাক্তার-গিন্নির মধ্যে কোনওটাই রমেশের পক্ষে কম বিপজ্জনক নয়। সে যদি সঠিক সময় বলত, ডাক্তারবাবু খেপে যেতেন আর বানিয়ে সময় বললে ডাক্তার-গিন্নির হাতে ধরা পড়লে রক্ষা নেই। ভদ্রমহিলা বিছানায় নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে কী করে যে আসল সময়টা ধরে ফেলতেন সেটা রমেশ এবং রমেশের ডাক্তারবাবু উভয়েরই সমস্যা ছিল।
কিছুটা বুদ্ধি খরচ করে মোটামুটি জোড়াতালি দিয়ে রমেশ চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু শেষে আর পারল না। একদিন একেবারে রাত কাবার করে দিয়ে ডাক্তারবাবু বাড়ি ফিরছেন, ফিরেই চাপা গলায় রমেশকে শাসিয়েছেন, এই সাবধান! যদি বলবি তো রাত কাবার করে ফিরেছি, একদম ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বার করে দেব।ডাক্তারবাবু তো বাড়িতে ঢুকেই নিজের বিছানায় গিয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। পাশের খাটে গৃহিণী তখনও ঘুম থেকে ওঠেননি। মহিলা সময়মতো ধীরেসুস্থে ঘুম থেকে উঠে পরিতৃপ্তির সঙ্গে প্রাতঃরাশ সমাপ্ত করে গভীর নিদ্রায় মগ্ন স্বামীকে বিছানা থেকে চুলের মুঠি ধরে তুললেন, তোমার এত বাড় বেড়েছে, রাতে বাড়িতেই ফিরছ না! দাঁড়াও আজ পাগলের ইলেকট্রিক শক তোমাকেই দেব! সদ্য কাঁচা ঘুম ভাঙা রাত্রির অত্যাচারে ক্লান্ত ডাক্তারবাবু শেষ পর্যন্ত রমেশের শরণাপন্ন হলেন। স্ত্রীকে অনুরোধ করলেন, রমেশ তো দেখেছে কখন ফিরেছি, ওকে জিজ্ঞাসা করো।
রমেশকে ডাকতে সে এল। ডাক্তারগিন্নি গর্জন করে উঠলেন, এই কী রে! এই লোকটা কখন বাড়ি ফিরেছে? ঠিক সময় বললে বিপদ, ডাক্তারবাবু মারবে, তাড়াবে। আবার বেঠিক সময় বলে গিন্নির হাতে ধরা পড়লে সে তো আরও মারকুটে, আরও দজ্জাল। দুপক্ষের হাত থেকে বাঁচতে সে খুব বুদ্ধি খাটিয়ে বলল, ডাক্তারবাবু যখন ফিরলেন তখন তো আমি ঘড়ি দেখতে পারিনি। তাই বলতে পারছি না সময়টা। গিন্নি গর্জে উঠলেন, কেন ঘড়ি দ্যাখোনি? তোমাকে বলিনি আমি? রমেশ বলল, কী করে দেখব, তখন যে আমি ঘুম থেকে উঠে কলতলায় মুখ ধুচ্ছিলাম।
বলাবাহুল্য, অতঃপর রমেশের অন্ন ডাক্তারবাবুর বাড়ি থেকে উঠল। কিন্তু কলকাতা শহরে চাকরের কাজের অভাব হয় না। গলির মোড়েই থাকেন এক ব্যবসায়ী ভদ্রলোক, কাপড়ের পাইকারি বিক্রেতা, বাড়িতেই একতলায় তার গদি। যাতায়াতের পথে রমেশকে তিনি দেখেছেন, তার প্রতি দৃষ্টিও ছিল। তার গদিঘরের একজন বয় দরকার। রমেশ বেকার হওয়া মাত্র উক্ত ব্যবসায়ী ভদ্রলোক, নকুলবাবু, তাকে লুফে নিলেন।
নকুলবাবুর গদিতে গিয়ে রমেশ আরেকবার বোকা বনল। ওই ডাক্তারবাবুর বাড়ির কায়দায় যারা গদিতে আসে রমেশ তাদের সরল চিত্তে পিসেন্ট বলে। গদি পরিষ্কার করে ঝাড়ন দিয়ে ঝেড়ে তাদের বসতে বলে, দোতলায় নকুলবাবুকে গিয়ে বলে, চারজন পিসেন্ট এসেছে।
নকুলবাবু প্রথমে ধরতে পারেননি। পরে রমেশকে বললেন, আরে গাধা, আমি কি ডাক্তার নাকি যে ওরা পেশেন্ট হবে? রমেশ বোকা নয়, সে প্রাক্তন অভিজ্ঞতা থেকে বলল, ও বুঝতে পেরেছি, ওরা মক্কেল।নকুলবাবু স্থিতধী ব্যবসায়ী, খুব শান্ত কথায় রমেশকে বোঝালেন, যারা এসেছে, যারা গদিতে আছে, আসবে তারা পেশেন্ট নয়, মক্কেল নয়, তারা খদ্দের।
