রমেশের হাতে একটা টিকিট ধরা রয়েছে, এখনই কিনেছে টিকিটের কাউন্টার থেকে, টিকিটটা হাওড়া থেকে খঙ্গপুর। রমেশ বসে আছে হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের উপরে, সে গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। কলকাতায় তার পোষালো না, সে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। সে হাওড়া থেকে যাবে খড়গপুরে, সেখান থেকে বাসে দু ঘণ্টা, তারপর হেঁটে দেড়ঘণ্টা–সেখানে তাদের গ্রাম, সেখানে তার গরিব বিধবা মা, ছোট ছোট ভাইবোনেরা রয়েছে। রমেশ গাঁয়ের একজন লোকের সঙ্গে কলকাতায় এসেছিল উপার্জন করতে। কিছুই বিশেষ চায়নি সে, সামান্য চাকরের কাজ নিয়েই সে সন্তুষ্ট ছিল অথবা সন্তুষ্ট থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু সেটা সম্ভব হল না।
রমেশ বাসন মাজতে পারে, ঘর মুছতে পারে, কাপড় কাঁচতে পারে। বাজার করে হিসেব দিতে পারে। গাঁয়ের স্কুলে সে পাঁচ ক্লাস পড়েছিল।
রমেশ শেষরাতে ভোর চারটের সময় উঠে কয়লা ভাঙতে পারে। দরকার পড়লে উনুন থেকে। ভাতের হাঁড়ি নামাতে পারে। কলকাতা শহরে তার চাহিদা কিছু কম নয় কিন্তু সে এখানে কাজ করতে পারল না।
কলকাতায় আসার আগে রমেশ কাঁথিতে এক ভদ্রলোকের বাড়িতে অল্প কিছুদিন কাজ করেছিল। সেই ভদ্রলোক ছিলেন উকিল। রমেশদের গ্রামের বাড়িতে বাইরের লোকজন বিশেষ কেউ আসে না। কেই বা আসবে কীসের দরকারে? পাড়া-প্রতিবেশী যারা আসে সবাই চেনাজানা। কিন্তু কাঁথির উকিলবাবুর বাড়িতে রমেশ দেখল সকাল, সন্ধ্যা, রবিবারে, ছুটির দিনে অনেক লোকজন আসে। বাইরের ঘরটা গমগম করে লোকের ভিড়ে আর কথাবার্তায়।
অল্পদিনের মধ্যে রমেশ জানতে পারে, এই যারা দুবেলা উকিলবাবুর বাড়িতে আসে, উকিলবাবুর সঙ্গে আদালতে ছোটাছুটি করে, তাদের বলে মক্কেল। কিছুকালের মধ্যেই সে বাইরের ঘর খুলে দিয়ে লোকজন বসিয়ে বাড়ির মধ্যে থেকে উকিলবাবুকে ডেকে আনা শিখে গেল, কর্তামশায়, মক্কেল এসেছে। উকিলবাবু হেঁকে বলতেন, ওদের বসাও। আমি যাচ্ছি। একটা ঝাড়ন দিয়ে চেয়ারগুলো ঝেড়ে মক্কেলদের বসিয়ে রমেশ এসে উকিলবাবুকে জানাত, মক্কেলবাবুদের ভাল করে বসিয়ে এসেছি।
কিন্তু কাঁথির এই উকিলবাবুর বাড়িতে রমেশের বেশিদিন কাজ করা সম্ভব হয়নি। উকিলবাবুর এক মক্কেলের মামলায় হেরে গিয়ে ছয় মাস জেল হয়, কী একটা মারামারির মামলা ছিল সেটা। মক্কেলটাও ছিল খুব মারকুটে। ছয়মাস কারাবাসের পর জেল থেকে বেরিয়েই সে উকিলবাবুর খোঁজে আসে। উকিলবাবুর ভাগ্য ভাল যে ঠিক সেই সময় বাসায় ছিলেন না। কিন্তু জেলখাটা মক্কেলটির কোপ গিয়ে পড়ে রমেশের উপর। রমেশ যথারীতি যখন ঝাড়ন দিয়ে চেয়ার পরিষ্কার করে মক্কেলটিকে বসাতে গেছে এবং ঘোষণা করেছে যে উকিলবাবু বাড়ি নেই, একটু অপেক্ষা করতে হবে–সেই মুহূর্তে লোকটি রমেশের হাত থেকে কাপড়ের ঝাড়নটি কেড়ে নিয়ে তাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেলে এবং জুনপুটে বা দিঘায় নিয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে বলে ক্রুদ্ধ ইচ্ছা জ্ঞাপন করে। রমেশের হাত বাঁধা ছিল, কিন্তু মুখ বাঁধা ছিল না, সে প্রাণভয়ে যথাসাধ্য চেঁচাতে থাকে।
রমেশের চিৎকারে রাস্তা থেকে লোকজন এবং পাড়া-প্রতিবেশী ছুটে এসে বিপজ্জনক মক্কেলটিকে ধরে ফেলে, তারপর পুলিশ এসে তাকে হাজতে চালান দেয়। তারপর আবার ফৌজদারি মামলা।
কী এক অজ্ঞাত, অবোধ্য কারণে এবারেও এই মারকুটে অধোম্মাদ লোকটি রমেশের উকিলবাবুকে তার মামলায় নিযুক্ত করে। ফলে যদিও রমেশই ভুক্তভোগী, উকিলবাবুর প্ররোচনায় রমেশ মামলার দিন আদালতে সাক্ষ্য দিতে যায় না। কিন্তু পাড়া-প্রতিবেশী ও রাস্তার লোকজনের সাক্ষ্যে এবং বিশেষ করে এই কারণে যে লোকটি জেল থেকে ছাড়া পেয়েই আবার গোলমাল করেছে সেই দিনই, এই সব বিবেচনা করে মহামান্য আদালত এই দাগি আসামিকে আবার ছয় মাসের জেল দেন। রমেশের উকিলবাবু বহু ধরাধরি, অনুনয়, বিনয়, যুক্তিতর্ক দিয়েও লোকটির জেলখাটা আটকাতে পারলেন না। রোষ কষায়িত লোচনে লোকটি উকিলবাবুর দিকে তাকাতে তাকাতে পুলিশের সঙ্গে আবার জেলে চলে গেল।
লোকটির জেল হয়েছে এই খবর শোনার পরে রমেশ খুবই আতঙ্কিত বোধ করতে লাগল এবং ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার সপ্তাহখানেক আগেই উকিলবাবুর গৃহ তথা কথি থেকে পালাল।
গাঁয়ে গিয়ে দু-এক মাস থাকার পর সে অন্য এক গ্রামবাসীর সঙ্গে অতঃপর কলকাতায় এল। সেই ব্যক্তি কলকাতায় এক ডাক্তারবাবুর বাড়িতে রান্নার কাজ করে, সেই বাড়িতেই রমেশের জন্য একটা ফাঁইফরমাস খাটার কাজ জুটল।
চাকরের কাজে যে হতভাগ্য বালকের জীবন শুরু তার যে ভাগ্য ভাল নয় সে কথা বলার অবকাশ রাখে না। তারই মধ্যে কারও কারও ভাগ্য একটু কম খারাপ হয়। রমেশের ভাগ্য কিন্তু খুবই খারাপ।
রমেশ যে ডাক্তারবাবুর বাড়িতে এসেছে সেই ডাক্তাবাবু মনস্তত্ত্ববিদ অর্থাৎ দুই কথায় পাগলের ডাক্তার। ঠিক রাস্তার ন্যাংটো পাগল বা উন্মাদ, বদ্ধ পাগল নয়, রোগীদের প্রত্যেকেরই মাথায় অল্পবিস্তর গোলমাল। প্রায় প্রত্যেকেই সুবেশ ও মার্জিত রুচির। কিন্তু এদের সকলের চোখের মধ্যে একটা ঘোলাটে ভাব আছে যে ভাবটা কাথির সেই উকিলবাবুর মক্কেলের চোখে মার খাওয়ার মুহূর্তে রমেশ দেখতে পেয়েছিল।
প্রথমে কিন্তু গোলমালটা বাধল অন্যভাবে। রমেশ কাঁথির কাজ থেকে শিখে এসেছে বাইরের লোক যারা আসে তারা হল মক্কেল। তার কাজ পড়েছিল সকাল-সন্ধ্যায় বাইরের ঘরের চেম্বারে রোগী এলে বসিয়ে ডাক্তারবাবুকে ভিতরে খবর দেয়া। সে এখানেও চেয়ার ঝেড়েঝুড়ে রোগীকে বসাত, বলত, বসুন মর্কেলবাবু। তারপর ভিতরে গিয়ে খবর দিত, একজন মক্কেল এসেছে।
