অবশেষে সমস্ত সমস্যা হৃদয়ঙ্গম করে এক শুভানুধ্যায়ী একটি সুপরামর্শ দিলেন। জগৎহরিবাবুকে উইল করতে বলুন। অনেক সময় দেখা যায় মুমুর্ষ ব্যক্তি উইল করার পরেই মারা যান। উইল করার সঙ্গে সঙ্গে বাঁচবার ইচ্ছে সম্পূর্ণ দূরীভূত হয়। সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা মনোমতো ভাবে করে তিনি শান্তিতে দ্রুত পরলোকে গমন করেন। পরামর্শটা পেয়েছিল বড় ভাই প্রশান্ত। সে এসে অশান্ত এবং সুশান্তকে বলে। হাবেভাবে শান্তকেও ব্যাপারটা যথাসাধ্য বোঝানো হয়। তার পরে চার ভাই দল বেঁধে মা নিরুপমাকে বোঝাতে গিয়ে দেখল তারও কোনও আপত্তি নেই। তিনি আগে থেকে মন শক্ত করে বসে আছেন। তা ছাড়া তিনি হরিমোহিনী দেবীর কীর্তনের অত্যন্ত ভক্ত। হরিমোহিনী দেবীর কীর্তনই যদি না হল তা হলে তাঁর বিধবা হয়ে লাভ কী?
যথাসময়ে আলিপুর আদালতে পারিবারিক উকিল রামতনু ঘোষকে খবর দেওয়া হয়েছিল। আজ ২৪ এপ্রিল রবিবার সকালে তিনি উইল করতে এসেছেন।
জগহরিবাবু আগে থেকে কিছু জানেন না। তিনি রামতনুবাবুকে দেখে ভেবেছেন, পুরনো পরিচিত লোক, হয়তো তার শারীরিক অবস্থার কথা শুনে দেখতে এসেছেন।
সুতরাং যখন রামতনুবাবু বললেন যে, তিনি তাঁর উইল করতে এসেছেন। জগৎহরিবাবু একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন। উইল? আমি কেন উইল করতে যাব? জগৎহরিবাবু আইন কিছু কম জানেন না, তিনি বললেন, আমি মারা গেলে আমার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর বিষয়সম্পত্তি আমার স্ত্রী আর চার ছেলে সমান ভাগে পাবে। এর জন্যে আবার উইল করতে যাব কেন? রামতনুবাবু পুরনো, ঝানু উকিল। তিনি বললেন, উইল করা ভাল। তা হলে পরে আর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে গোলমাল হয় না। কিছুটা কথাবার্তার পর জগহরিবাবু উইল করতে নিমরাজি হলেন। ততক্ষণে চার ছেলে এবং বিরাট ঘোমটা টেনে নিরুপমাদেবীও জগৎহরিবাবুর শয্যার পাশে এসে গেছেন।
জগৎহরিবাবুর খাটের সামনে একটা নিচু তক্তাপোশ রয়েছে, সেটায় বাড়ির সবাই বসলেন। পাশে একটা কাঠের চেয়ারে রামতনুবাবু। রামতনুবাবুর মুহুরিও সঙ্গে এসেছে, সে মেঝেতে কাগজ কলম নিয়ে বসল। তার নাম সহদেব।
সজ্ঞানে, সুস্থ শরীরে ইত্যাদি প্রথা ও আইন মাফিক বয়ান শেষ হওয়ার পরে জগহরিবাবু বললেন, যোধপুর পার্কে আমার পাঁচ কাঠা জমি রয়েছে, সেই জমি আমি আমার সতীসাধ্বী স্ত্রী। শ্রীযুক্তা নিরুপমা দেবীকে দিলাম।
সঙ্গে সঙ্গে নিরুপমা দেবী ঘোমটার আড়াল থেকে কাংস্য কণ্ঠে প্রতিবাদ করলেন, দ্যাখো কাণ্ড! আমি বুড়ি মানুষ, বিধবা হতে যাচ্ছি, খালি জমি দিয়ে আমি কী করব?
নিরুপমা দেবীর প্রতিবাদ শুনে একটু থমকিয়ে গেলেন জগৎহরি। মুখে বললেন, ঠিক আছে ওটা পরে দেখছি। সহদেব মুহুরিও চতুর লোক, যোধপুর পার্কের জমির লাইনটা যেটা সে এইমাত্র লিখেছিল সেটার গায়ে একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন লাগিয়ে দিল।
এবার জগহরিবাবু বললেন, আমার ক্যামাক স্ট্রিটের ফ্ল্যাটটা আমার বড় ছেলে প্রশান্তকে দেব।
সঙ্গে সঙ্গে বাধা দিলেন নিরুপমা দেবী, না। না। ও ফ্ল্যাটটা অশান্তকে দাও। ও একটু সাহেবি মেজাজের। তা ছাড়া ওর যা কাজ করবার সেটা বাঙালিপাড়ায় নিরাপদ নয়।
ঢোক গিললেন জগৎহরিবাবু, রামতনুবাবু। মেঝেতে সহদেব মুহুরিও সদ্য সমাপ্ত পংক্তিটির পাশে আবার একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিল।
কিছুক্ষণ গুম হয়ে থেকে জগৎহরি বললেন, আমার চেতলা বাজারে মশারির ব্যবসাটা তৃতীয় ছেলে সুশান্ত দেখাশোনা করে ওটা তাকেই দিয়ে যাব।
বাক্য শেষ হওয়ার আগেই আবার নিরুপমার আপত্তি, এই তোমার বুদ্ধি? তুমি মরে গেলে মশারির ব্যবসা করবে নাকি কেউও? ওটা প্রশান্তকে দাও। চেতলা বাজারে অত ভাল জায়গা, ওখানে প্রশান্ত যাত্রা কোম্পানির অফিস করবে।
আবার কিঞ্চিৎ নীরবতা এবং সহদেব মুহুরির প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
ভিতরে ভিতরে উত্তেজিত হচ্ছিলেন জগৎহরি, তিনি এবারে অনেকদিন পরে খাটের ওপরে উঠে বসলেন, বললেন, আমি যদি শান্তিনিকেতনের নিরিবিলি বাড়িটা এই বোবা কালা ছেলে শান্তকে দিই, ওর মতো ও শান্তিতে থাকতে পারবে, তাতে নিশ্চয় তোমাদের কোনও আপত্তির কারণ নেই।
নিরুপমা বললেন, নিশ্চয় আপত্তি করব। তোমার বুদ্ধিসুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে। শান্তিনিকেতনে শান্তকে দেখবে কে। সেটা হল গানবাজনার জায়গা। কালাবোবার সেখানে কোনও ঠাই নেই।
আর সহ্য করতে পারলেন না জগৎহরি। যাঁর চিত হয়ে খাটে শুয়ে শ্মশানে যাওয়ার কথা, তিনি তড়াক করে খাট থেকে মেঝের ওপর নেমে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। সহদেব মুহুরি আর একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিতে যাচ্ছিল, জগৎহরিবাবুর ডান পাটা তার ডান হাতের ওপর পড়ায় সে একটু কোঁক করে উঠল।
ঘোমটা টানা নিরুপমার মুখপানে তাকিয়ে জগহরি গর্জে উঠলেন, বলি উইলটা কার? আমার, না তোমার? বলি মারা যাচ্ছে কে? আমি, না তুমি?
বলা বাহুল্য এ গল্প এখানেই শেষ। পুরনো দিনের পাঠকেরা যারা গল্পের শেষে একটা পরিণতি প্রত্যাশা করেন, তাঁদের অবগতির জন্যে তিনটি ঘটনা জানাচ্ছি। এক, জগহরিবাবু উইল করেননি। দুই, জগৎহরিবাবু এখনও মারা যাননি। তিন, জগৎহরিবাবু একটা নতুন সিনেমা প্রযোজনায় হাত দিয়েছেন, কাহিনির নাম, যতক্ষণ শ্বাস।
খদ্দের
ওই বসে রয়েছে রমেশ। একটা ভাঙা সুটকেস, সেটা নারকেলের দড়ি দিয়ে বাঁধা, তার মধ্যে দুটো ছেঁড়া পুরনো জামা প্যান্ট। পরনে একটা হাফপ্যান্ট, দু সাইজ বড় ময়লা হাওয়াই শার্ট। পায়ের হাওয়াই চটিজোড়া অবশ্য নতুন, শেষ সম্বল মাইনের টাকা থেকে আজকে সকালেই কিনেছে।
