এসব বই দুর্বল অশ্রুগ্রন্থি বাঙালি মধ্যবিত্ত দর্শক লুফে নিয়েছিল। তারাই তখনকার সিনেমার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। কান্নাহাসির দোল-দোলানো পৌষফাল্গুনের পালা চিরদিনই বাঙালি দর্শকের অতি প্রিয়।
যথেষ্ট পয়সা করেছিলেন জগহরিবাবু, মশারির ব্যবসায় এর চেয়ে বেশি উপার্জন হওয়া সম্ভব ছিল না। তা ছাড়া চেতলার মশারির দোকানটা ছোট করে ভালই চলছিল, দোকানটা থেকে সংসার খরচা মোটামুটি চলে যেত। সিনেমার লাইনে যেমন হয় জগৎহরিবাবুর কিন্তু চরিত্রদোষ ছিল না, সে বড় খরচার ব্যাপার।
ফলে সিনেমা করে যেটুকু লাভ হয়েছিল প্রায় পুরো টাকাটাই জগৎহরি নানাভাবে বিনিয়োগ করেছিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পারিবারিক বিষয়বুদ্ধি এ ব্যাপারে তাকে সাহায্য করেছিল।
যোধপুর পার্কে পাঁচ কাঠা জমি কিনেছিলেন, ক্যামাক স্ট্রিটে একটা বড়সড় ফ্ল্যাট। শান্তিনিকেতনে বাড়ি করলেন এক বিঘে জমির ওপরে। এ ছাড়া পোস্টাফিসে ক্যাশ সার্টিফিকেট কিনলেন প্রায় দু লাখ টাকার মতো, যা ডবল হয়ে হয়ে এখন আটলাখে দাঁড়িয়েছে।
তবে জগৎহরি ব্যবসায়ের পথ সবটাই যে কুসুমাস্তীর্ণ ছিল তা নয়। একবার খ্যাতির লোভে আর্ট ফিল্ম করে বেশ কয়েক লাখ টাকা গচ্চা দিয়েছিলেন, তবে এই সুযোগে একবার লাক্সেমবার্গে ঘুরে এসেছিলেন। সেখানে তার প্রযোজিত বই ঘাম ও রক্ততৃতীয় বিশ্বের চিত্রমেলায় প্রদর্শিত হয়েছিল। ব্যস ওই পর্যন্তই, তার পরে আর এ ব্যাপারে কোনও খবর পাওয়া যায়নি। প্রদর্শনের সময় আন্ডারগ্রাউন্ড ঘুপচি হলে দেড়শো সিটের মধ্যে মাত্র বারোটি সিট পূর্ণ ছিল, তার মধ্যে তিনটেতে ছিলেন তিনি, তার পরিচালক কাবুল মল্লিক এবং শ্রীমতী কাবুল।
শ্ৰীমতী ও শ্রীমান কাবুল মল্লিক অত্যন্ত তুখোড় দম্পতি। ঘাম ও রক্ত ছিল জোতদার বর্গাদার সম্পর্ক নিয়ে একটি আর্থ-সামাজিক প্রতিবেদন। বইটি এক পয়সাও ফেরত দেয়নি, কলকাতায় একদিনও চলেনি। তবে বড় বড় কাগজে, বৈদ্যুতিক প্রচার মাধ্যমে প্রচুর বাহবা পেয়েছিল। তবে সেসবের পিছনেও ছিল পাঁচতারা হোটেলে পার্টি, অবশ্য জগৎহরির পয়সায়।
সেই জগৎহরি এখন মরতে বসেছেন। কিংবা সঠিক করে বলা উচিত আগে মরতে বসেছিলেন, এখন বাঁচতে বসেছেন।
কিন্তু তার বোধহয় বাঁচা হবে না। তার বোধহয় আর বাঁচা হবে না, অন্ততপক্ষে বাঁচা উচিত হবে না।
এভাবে বলা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু কী ভাবেই বা বলা যায়? ব্যাপারটা গোলমেলে।
জগৎহরিবাবুর কোনও মেয়ে নেই, পর পর চার ছেলে। ছেলেরা এখন লায়েক হয়েছে, সিনেমা প্রযোজকের ছেলেদের যতটা বখে যাওয়া সম্ভব, তার চেয়ে কিছু কম বখে যায়নি তারা।
তাই বলে তারা যে কেউ পিতৃভক্ত নয়, তা নয়। জগৎহরির মৃত্যু নিশ্চিত জেনে তারা একেকজন নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেয়।
বড় ছেলেটি প্রশান্ত, বাবার টাকায় যাত্রাদল করেছে, যাত্রা-উর্বশী আইভরি দাশের সঙ্গে আগামী দুসপ্তাহ তার উত্তরবঙ্গ সফরের প্রোগ্রাম ছিল। বাবার জন্যে সেটা ক্যানসেল করেছে।
দ্বিতীয়টি অশান্ত। চিটফান্ড কোম্পানি করেছে। এক বছরে টাকা ডবল করে দেয়। তার বাবা, জগহরি, তাকে বিশ্বাস করতেন না। তিনি বাড়িতেই বছর বছর টাকা ডবল হওয়ার সুবিধে আছে জেনেও পোস্টাপিসে টাকা জমিয়েছিলেন ছয় বছরের মেয়াদে।
তৃতীয়টি সুশান্ত। সে পারিবারিক ব্যবসা চেতলার হাটে মশারির ব্যবসাটা দেখে। সে বেশ সব্যবস্থ। দোকানের আয় থেকে সংসার খরচের জন্য দৈনিকই দুশো-আড়াইশো টাকা তার মা নিরুপমার হাতে দেয়। লোক-লৌকিকতা, পুজো, নববর্ষ ইত্যাদির মোটা টাকার দায়ও সে বহন করে।
এই তিনজনই বিবাহিত। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, শ্বশুরবাড়ি ইত্যাদি আছে। চতুর্থটির বিয়ে হয়নি, সে বোবা। সঙ্গত কারণেই তার নাম শান্ত। তার বিশেষ কোনও দোষ বা গুণ নেই। শুধু সন্ধ্যাবেলা কালীঘাট বাজারে গিয়ে দু পাইট দুনম্বর বাংলা মদ না খেলে তার রাতে ঘুম আসে না।
ভালই চলছিল সব। গোল বাধিয়েছেন জগৎহরিবাবু নিজে। তিনি কিছুতেই মারা যাচ্ছেন না।
সব রকম বিধি বন্দোবস্ত করা আছে। গঙ্গাজল, তামা, তুলসী। দৈনিক চেতলা বাজার থেকে এক টাকায় আস্ত তুলসীগাছ কিনে আনা হচ্ছে। বড়বাজার থেকে এক কেজি খাঁটি তিল এনে পুজোর ঘরে রাখা হয়েছে। এক বালতি খুচরো পয়সা জমানো হয়েছে, সেইসঙ্গে এক টিন খই। শবযাত্রার সময়ে ছিটোতে হবে।
ডাক্তাররা তো দিনক্ষণ বলেই দিয়েছিলেন। কিন্তু জগহরি ডাক্তারি নির্দেশ অমান্য করে বেঁচে রয়েছেন।
সবচেয়ে সমস্যা দাঁড়িয়েছে হরিমোহিনী দেবীকে নিয়ে। আগাম ১০ হাজার টাকা দিয়ে তাঁকে শ্রাদ্ধবাসরে কীর্তন গাওয়ার জন্যে বুক করা হয়েছে। জগৎহরিবাবুর মতো কৃতবিদ্য ব্যক্তির শ্রাদ্ধবাসরে যেখানে চিত্রজগতের দিকপালেরা, নট-নটিরা অবশ্যই আসবেন সেখানে হরিমোহিনী দেবী ছাড়া আর কাউকে দিয়ে কীর্তন গাওয়ানো একেবারেই ঠিক হবে না। মোটেই সম্মানজনক হবে না জগৎহরিবাবুর পুত্রদের পক্ষে।
এদিকে, হরিমোহিনী দেবী স্টেটসে চলে যাচ্ছেন সাতই মে। নিউ জার্সিতে, বস্টনে, লস এঞ্জেলসে তাঁর কীর্তন গানের চুক্তি। টিকিট, প্রোগ্রাম সব ফাঁইনাল। শ্রাদ্ধ হবে মৃত্যুর পরে এগারো দিনে, বড় জোর সাতই মে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা সম্ভব।
