এ ঘটনা দীর্ঘ চার বছর আগেকার।
তারপর কলকাতার রাজপথে অনেক জনস্রোত বয়ে গেছে। সে জনস্রোতে আজকাল কদাচিৎ মহিমাময়ের সঙ্গে জয়দেবের দেখা হয়। স্রোতের স্বতন্ত্র পথে নিজ নিজ ধান্দায় দুজনে দু ধারায় প্রবাহিত হন।
শহরটা তেমন বড় নয়। তাই তবুও কখনও কখনও এখানে সেখানে দেখা যায়। জয়দেবকে দেখে খুশি হন মহিমাময়। মহিমাময়কে দেখে খুশি হন জয়দেব।
জয়দেবকে মহিমাময় আমন্ত্রণ জানান, বলেন, আয় জয়দেব, বাসায় যাই। সেই কালমেঘ এখনও শিশিতে অনেকটা রয়েছে। চল, বাসায় গিয়ে একটু জিন খাই।
জয়দেব আপত্তি করেন, ধ্যুৎ, জিন পুরুষমানুষে খায় নাকি, ও তো মেয়েলি পানীয়। আর তোর ওই কালমেঘ, ওয়াক, থুঃ! কুইনিন জলে গুলে খাবি, নিমপাতা চিবিয়ে খাবি, সজনোটা উচ্ছে কাঁচা খাবি। অনেক স্বাদ পাবি।
ক্ষুণ্ণ মনে মহিমাময় বাড়ি চলে আসেন। তিন কোনাচে বাইরের ঘরের পুরনো বেতের চেয়ারে বসে পা দোলাতে দোলাতে সামনের দেয়ালে তাকের উপরে চোখ রাখেন। ওখানে কালমেঘের শিশিটা রয়েছে। এখনও ওই শিশিটার মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কালমেঘ আছে। অন্তত পাঁচ টাকার জিনিস। এই দুর্দিনে জিনিসটা নষ্ট করতে মন চায় না।
কিন্তু শিশিটা কিছুতেই ফুরোচ্ছে না। গেলাসে এক-দুই ফোঁটা, এক বোতলে পনেরো পেগ, পনেরো গেলাস। পনেরো গেলাসে পনেরো থেকে তিরিশ ফোঁটা।
গত চার বছরে কত গেলাসের পর গেলাস, বোতলের পর বোতল জিন শেষ হয়ে গেল, কিন্তু ওই কালমেঘের শিশি সদ্য গলা পর্যন্ত নেমেছে।
কালমেঘের জন্যে জিন, নাকি জিনের জন্যে কালমেঘ? একটা কঠিন ধাঁধায় পড়ে যান মহিমাময়। তারপর কাগজ-পেনসিল টেনে নিয়ে সমান কঠিন একটা অঙ্ক কষতে থাকেন।
সপ্তাহে দু বোতল জিন, একশো ষাট টাকা বছরে আট সাড়ে আট হাজার টাকা।এই চার বছরে সে অন্তত ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা হবে।
এখনও বাকি যা কালমেঘ আছে তাতে আরও হাজার সত্তর টাকার জিন খেয়ে যেতে হবে। আর আট বচ্ছর–মোটমাট এক লাখ টাকার ধাক্কা!
প্রৌঢ় মহিমাময় করুণ চোখে কালমেঘের শিশিটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ভাবেন, একটা ছোট একতলা বাড়ি হয়ে যেত। ভাবতে ভাবতে পাঞ্জাবি গলিয়ে পথে বেরিয়ে পড়েন আরেক বোতল জিন আনতে।
কে মারা যাচ্ছে?
আজ চব্বিশ এপ্রিল।
আর হাতে তিন দিন রয়েছে, মাত্র তিন দিন। এই বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে যদি জগৎহরি মারা না যান তবে কেলেঙ্কারি হবে।
এই গল্পের নায়ক জগহরি, শ্রীযুক্ত জগৎহরি মুখোপাধ্যায় এই কয়েকদিন আগেও মৃত্যুমুখী ছিলেন। চৈত্রমাসের প্রথমে সেই এক শনিবার বিকেলে বাড়ির কাছে পার্কে বেড়াতে যাওয়ার পথে হঠাৎ অকাল বর্ষণে প্রচণ্ড ভিজে গিয়েছিলেন জগৎহরি।
সেই ঠান্ডা লেগে বুকে জল জমা, শ্বাস কষ্ট। বুড়ো বয়েসে এসব অসুখ মারাত্মক।
তা ছাড়া জগৎহরিবাবুর বয়েস তো আর কিছু কম হয়নি। তিরাশি পূর্ণ হয়ে চুরাশিতে পা দিয়েছেন গত বৌষ মাসে। সে তুলনায় শরীর-স্বাস্থ্য ভালই ছিল, কিন্তু এ বয়েসে আচমকা অসুখ খুব বিপজ্জনক।
জগৎহরিবাবু মৃত্যুর মুখে চলে গিয়েছিলেন। ডাক্তাররা জবাব দিয়ে দিয়েছিল। গত সোমবার তো মনে হয়েছিল আজকের রাত্রিটা কাটে কি না কাটে।
সুখের কথা শুধু সেই সোমবারের রাত্রি নয় তারও পরে আরও পাঁচ-পাঁচটা রাত্রি বহাল তবিয়তে কাটিয়ে দিয়েছেন শ্রীযুক্ত জগৎহরি, নামের পূর্বে শ্রীর বদলে চন্দ্রবিন্দু বসানোয়, স্বর্গীয় জগৎহরি হওয়ায়, তার তেমন বিশেষ কোনও উৎসাহ দেখা যায়নি।
ওইখানেই হয়েছে বিপদ।
শ্রীযুক্ত জগৎহরি মুখোপাধ্যায় কোনও সামান্য লোক নন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার প্রবাদসিদ্ধ এক মুখুজ্যে বংশের তিনি মুখোজ্জ্বলকারী উত্তরপুরুষ। পিতৃপুরুষদের বিশাল পারিবারিক ব্যবসা ছিল চেতলা হাটে। মশারি আর মাছ মারার জালের পাইকারি কারবার। সেই ব্যবসা ধীরেসুস্থে অনেকটা গুটিয়ে নিয়ে তিনি চলচ্চিত্রে প্রযোজনায় মনোনিবেশ করেন।
জগৎহরি বিশ-পঁচিশ বছর আগে চিত্রজগতে রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত নোক ছিলেন। নীতিশ মুখার্জির ভাইপোর বিয়েতে তিনি বরযাত্রী হয়েছিলেন, মলিনা দেবী তাঁকে ভাইফোঁটা দিতেন, এমনকী স্বয়ং উত্তমকুমার তাকে জগদা বলতেন। বাড়িতে কড়া করে ইলিশ মাছ ভেজে, বিমানযাত্রী পেলে, জগৎবাবু গীতা দত্তকে বোম্বাইতে পাঠাতেন। কলকাতায় কালেভদ্রে রাজকাপুর এলে তিনি ঘি-গরমমশলা দেওয়া পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া পাঁঠার মাংসের ঝোল রাজকাপুরকে হোটেলে পাঠাতেন। রাজকাপুর যাওয়ার সময়ে তাঁর কলকাতার এজেন্টকে বলে যেতেন। তাঁর হোটেলের ঘরে কয়েক বোতল স্কচ হুইস্কির বোতলে সব সময়েই যথেষ্ট অবশিষ্টাংশ পড়ে থাকত, কারণ তিনি নতুন বোতল না খুলে খেতেন না এবং প্রচুরই খেতেন, সেই বোতলগুলো জগত্তরিকে এজেন্ট সাহেব পাঠিয়ে দিতেন। এবং সেই প্রসাদ পেয়ে জগৎহরিবাবু ধন্য বোধ করতেন। লোকজনকে ডেকে ডেকে খাওয়াতেন, বলতেন, এটা রাজকাপুরের স্কচ।
জগৎহরি অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করেছিলেন শরৎচন্দ্রের গল্পের সিনেমা করে। গল্পটা শরৎচন্দ্রের। কিন্তু একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে রচনা করে, কপিরাইট না কিনে অন্য নামে চলচ্চিত্রায়ণ করতেন, যেমন গৃহদাহ তার সুবাদে হয়েছিল মনের আগুন, চরিত্রহীন হয়েছিল পথে বিপথে। চিত্রনাট্যকারের নাম থাকত না, তাকে এজন্যে কিছু বেশি পয়সা দেয়া হত। বইয়ের টাইটেলে লেখা থাকত কাহিনি ও চিত্রনাট্য ছদ্মবেশী।
