মহিমাময় একটু ভেবে বললেন, কিন্তু তোর কি ভাঙের নেশা এখনও কেটেছে? চোখ তো জবাফুলের মতো লাল দেখছি।
জয়দেব বললেন, আরে ধ্যুৎ, ভাঙে আবার নেশা হয় নাকি! চোখ লাল হয়েছে বেশি ঘুমিয়ে। তারপর একটু থেমে নিয়ে বললেন, বাড়িতে কিছু আছে?
মহিমাময় বললেন, বাড়িতে একটু আধটু তলানি পড়ে আছে। সেসবে হবে না। আর আজ বিয়ার খাওয়ার দিন। আবহাওয়া দেখছিস না, বসন্তকালের দুপুরে বিয়ার ছাড়া খাওয়া যায়?
জয়দেব গম্ভীর হয়ে বললেন, মহিমা, তোর বয়েস কত হল?
প্রশ্নের গতিক দেখে একটু হকচকিয়ে গিয়ে মহিমাময় বললেন, কেন, এই অঘ্রানে বেয়াল্লিশ পূর্ণ হল!
জয়দেব বললেন, তা হলে তোর থেকে আমি আড়াই বছরের বড়, আমার বয়েস হল সাড়ে চুয়াল্লিশ। তারপর একটু থেমে থেকে বেশ বড় রকমের একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে জয়দেব এগিয়ে এসে মহিমাময়ের কাঁধে হাত রাখলেন, অবশেষে বললেন, আমাদের কি আর বয়েস আছে রে বিয়ার খাওয়ার? আমরা তো বুড়ো হয়ে গেছি। বিয়ার খাবে তো বাচ্চা ছেলেরা।
এরকম আশ্চর্য কথা শুনে মহিমাময় কিছু বুঝতে না পেরে বললেন, বাচ্চা ছেলেরা খাবে মায়ের বুকের দুধ, ফিডিং বোতলের দুধ, নিদেনপক্ষে গোরুর দুধ গেলাসে বা কাপে করে। তারা বিয়ার খাবে কেন?
জয়দেব মধুর হেসে বললেন, আরে না না, অত বাচ্চা নয়। অন্নপ্রাশনের কুড়ি বছর পর থেকে চল্লিশ বছর পর্যন্ত গাঁজা, ভাং, চুরুট, দোক্তা, বিয়ার, তাড়ি যা তোক একটা লোক খাক, খেয়ে যাক, কিছু আসে যায় না। কিন্তু যেই মানে মানে চল্লিশ পার হয়ে গেলি, তখন তোকে মানে মানে। ভেবেচিন্তে চলতে হবে। এমনকী সর্ষেবাটা সজনোটা চিবনোর আগে ভেবে নিতে হবে কটা উঁটা চিবনো ঠিক হবে।
জয়দেবের এরকম বয়সোচিত বক্তৃতা শুনে মহিমাময় অধৈর্য হয়ে পড়লেন, জয়দেবকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, স্টপ জয়দেব! অলরাইট, বিয়ার নয়, একটু আগে বাড়িতে দেখে এসেছি বউ চা করছে। চল দুজনে গিয়ে দু পেয়ালা চা খাই। এরপর থেমে গিয়ে মহিমাময় দুটি দন্তপাটি কিড়মিড় করে স্বগতোক্তি করলেন, এমন সুন্দর দিনটা জলে গেল! এবং সঙ্গে সঙ্গে তার খেয়াল হল, জলে নয়, বিনা জলে গেল!
ততক্ষণে জয়দেব মহিমাময়কে স্বগতোক্তি করা থেকে নিবৃত্ত করেছেন, তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, এই ভরদুপুরে চা খাবে কোন শালা? আমার সঙ্গে চল, এক বোতল জিন কিনে আনি।
মহিমাময় এই অবস্থায়ও রফা করার চেষ্টা করলেন, জিন খাওয়া যাবে না। বিটারস ফুরিয়ে গেছে।
জয়দেব এখন রীতিমতো উত্তেজিত, বললেন তুই একেবারে সাহেব হয়ে গেছিস মহিমা, বিটারস দিয়ে কী হবে? আর বিটারসের কী দাম জানিস?
বলা বাহুল্য, এত তর্কাতর্কির মধ্যেও জয়দেব এবং মহিমাময় ইতিমধ্যে বড় রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজেদের অজান্তে গড়িয়াহাটের চৌমাথায় মদের দোকানের সামনে এসে গেছেন। এবার জয়দেব নির্দেশ দিলেন, মহিমা, তুই এক কাজ কর, সামনের ওষুধের দোকান থেকে তুই এক বোতল কালমেঘ নিয়ে আয়। ততক্ষণে আমি এখান থেকে জিনটা কিনে ফেলছি।
কিছুই অনুধাবন করতে না পেরে মহিমাময় সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে ভিক্টোরিয়া ফার্মেসি থেকে সাড়ে সাত টাকা দিয়ে এক শিশি কালমেঘ কিনে আনলেন, ততক্ষণে জয়দেব জিনের বোতল কিনে ফুটপাথে নেমে এসেছেন।
দুজনে মিলে বাড়িমুখো হাঁটতে হাঁটতে মহিমাময় জয়দেবের কাছে জানতে চাইলেন, কালমেঘ দিয়ে কী হবে? তোর কি লিভার খারাপ হয়েছে? তারপর বেশ ভেবে নিয়ে বললেন, লিভার খারাপ হলে মদ খাবি কেন? শুধু শুধু কালমেঘ খেয়ে কি সুরাহা হবে?
জয়দেব এবার চটে গেলেন, লিভার খারাপ হবে কেন আমার? আমার লিভার পাথরের মতো শক্ত। কালমেঘ লিভারের জন্যে নয়, ওটা নেওয়া হল জিন খাওয়ার জন্যে।
মহিমাময় বেশ অবাক হলেন, এই তেতোর তেতো কালমেঘ দিয়ে জিন! এর থেকে কুইনিন মিক্সচার খাওয়া ভাল!
এতক্ষণে ওঁরা দুজনে মহিমাময়ের বাড়ির দরজায় পৌঁছে গেছেন। ঘরে ঢুকে মহিমাময় তাড়াতাড়ি বাড়ির মধ্যে গিয়ে এক বোতল ঠান্ডা জল আর দুটো গেলাস নিয়ে এলেন।
এবার ঢালাঢলির পালা জয়দেবের। তিনি জিনের বোতলটা খুলে দু গেলাসে দু আঙুল পরিমাণ নিয়ে তার মধ্যে জল মেশালেন, তারপর সত্যি সত্যি ওই কালমেঘের শিশিটা খুলে দু গেলাসে দু ফোঁটা ঢেলে দিলেন। তারপর এক গেলাস মহিমাময়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, নে, খেয়ে দ্যাখ, মধুর মতো লাগবে।
মধুর মতো কালমেঘ? তুই কি একেবারে পাগল হয়ে গেলি জয়দেব? কাল রাতে কয় লোটা ভাং খেয়েছিস বল তো? হাতে গেলাস ধরে মহিমাময় জিজ্ঞাসা করলেন।
পরম আয়েস ও তৃপ্তির সঙ্গে একটা লম্বা চুমুকে গেলাসটা প্রায় অর্ধেক ফাঁক করে দিয়ে জয়দেব বললেন, দ্যাখ মহিমা, কালমেঘ হল দিশি বিটারস। বিলিতি বিটারসের চেয়ে ডবল ভাল। আর বিলিতি বিটারসও তেতো একটা গাছের রস। মদের মধ্যে দু ফোঁটা দিলেই এর স্বাদ বদলিয়ে যায়। আমার বড় জামাইবাবু আমেরিকায় এক ডজন সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল। যাদের যাদের দিয়েছিল, তারা এখনও চিঠি লেখে, খোঁজ নেয়।
এবার মহিমাময় সন্তর্পণে তার হাতে ধরা গেলাসটা জিবে ছোঁয়ালেন। সত্যিই তো, সামান্য কালমেঘের জাদুর পরশে ঝজালো ড্রাই জিনে অমৃতের স্বাদ এসেছে।
