রোববার ফাল্গুন মাস শেষ সপ্তাহ, সকাল সাড়ে দশটা।
বাইরের তিন কোনাচে ঘরে পুরনো বেতের চেয়ারে বসে পা দোলাতে দোলাতে মহিমাময় দেয়ালঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
এ বছর দোল পড়েছে মাসের দ্বিতীয় শনিবারে। একটা চমৎকার ছুটি বেঘোরে মারা গেল। শুধু তাই নয়, রোববারের আড়াটাও মারা পড়েছে। বন্ধুবান্ধব, জানাশোনা সবাই গেছে শান্তিনিকেতনে, বসন্ত উৎসবে। কেউ কাল সকালের আগে ফিরছে না। অথচ সুন্দর ফাল্গুন মাস। হালকা ফিকে রসুনের মতো একটু একটু ঠান্ডার আস্তরণ এখনও দিনের গায়ে জড়ানো আছে। আর সেই সঙ্গে সেই বিখ্যাত দক্ষিণের ফুরফুরে বাতাস, এই তো কলকাতার সবচেয়ে ভাল সময়।
এই সময়ে কেউ কলকাতা ছেড়ে বাইরে যায়! তাও আবার এই বুড়ো বয়সে শান্তিনিকেতনের বসন্ত মেলায়! মনে মনে তিনবার বন্ধুদের ধিক্কার দিলেন মহিমাময়।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিবটা কেমন যেন খরখর করছে, গলা থেকে তালু পর্যন্ত মুখটা শুকিয়ে যাচ্ছে। বাড়ির মধ্য থেকে মহিমাময়ের স্ত্রী ভেতরের দরজার পর্দা তুলে স্বামীকে একা বসে ঘন ঘন পা দোলাতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, এক পেয়ালা চা খাবে নাকি? তাড়াতাড়ি বলল, উনুনে জল বসাচ্ছি
চায়ের কথাটা শুনে মহিমাময়ের মাথাটা বেশ গরম হয়ে গেল। বেশি বাক্যবিনিময়ে না গিয়ে তিনি শুধু সংক্ষিপ্ত ও সুগম্ভীর জবাব দিলেন না।
নিরাসক্তের মতো আর একবার দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালেন মহিমাময়। এগারোটা বাজতে চলল। বাইরে নতুন এক টাকার কয়েনের মতো ঝকঝকে রোদ, দূরে ত্রিকোণ পার্কে না কি কোনও বাড়িতে একটা পোষা কোকিল ভোর থেকে ডাকছে তো ডাকছেই। নবীন বসন্তের মনোরম উষ্ণতায় চারদিক মেতে উঠেছে। এইরকম সুন্দর ছুটির দিনে কোনও ভদ্রলোক দুপুরবেলায় বাড়িতে বসে চা খায়! কোথাও গাছের ছায়ায় ফুরফুরে বাতাসে বসে বিয়ারের সোনালি তরলতায় চুমুক দিতে দিতে আজ হল নব বসন্তকে অভ্যর্থনা জানানোর দিন।
পাজামার উপরে গায়ে একটা পাঞ্জাবি চাপিয়ে ধুত্তোরি বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন মহিমাময়। কিন্তু একা একা আর কতদূর কোথায় যাবেন? আর সবচেয়ে বড় কথা, রাস্তাঘাট এখনও তেমন নিরাপদ হয়নি। আজ কয়েক বছর হল বড়বাজারওয়ালারা উঠে এসেছে দক্ষিণ কলকাতার বহুতল বাড়িগুলিতে। সেখানে হিন্দুস্থানি আর রাজস্থানিদের হোলি হো, হোলি হ্যায়, এখনও পুরোদমে চলেছে। কোথায় কোন অলিন্দ কি গবাক্ষ থেকে চপলা তরুণী রাজপথের অসহায় পদাতিকের গায়ে ফাগ কিংবা ইনডেলিবল কুমকুম ছুঁড়ে মারবে তা বলা যায় না।
ইতস্তত গলির মোড়ের দিকে এগোতে এগোতে সহসা মহিমাময় দেখলেন খুব চেনা একটা লোক তার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বড় রাস্তা থেকে এগিয়ে আসছে।
আগন্তুকের চুলে-মুখে নানারঙের আবির, গায়ের হাওয়াই শার্ট আর ফুল প্যান্টও বহুবর্ণরঞ্জিত, উজ্জ্বল রঙে এমন ঢাকা পড়ে গেছে অবয়ব ও গঠন যে বেশ কাছে না আসা পর্যন্ত মহিমাময় বুঝতে পারলেন না–তার বন্ধু জয়দেব আসছেন।
জয়দেবকে দেখে মহিমাময় যুগপৎ খুশি ও বিস্মিত হলেন। তাহলে যে শুনেছিলেন জয়দেব শান্তিনিকেতনে গেছে, গিয়েছিল হয়তো, আজই ফিরছে!
কাছে আসতে জয়দেবকে মহিমাময় জিজ্ঞাসা করলেন, তুই শুনলাম শান্তিনিকেতনে গিয়েছিস?
জয়দেব বললেন, কী করে যাব? পরশুদিন রাত থেকে আমি কেজরিওয়ালের বাড়িতে আটকে আছি!
মহিমাময় কেজরিওয়ালকে চেনেন না, জয়দেবের সমস্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির খবর রাখা কারও সাধ্য নয়। সুতরাং মহিমাময় প্রশ্ন করলেন, কেজরিওয়াল কে?
তিনরঙের আবির মাখা ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে জয়দেব বললেন, তুই চিনবি না। বড় ব্যবসা করে, বলপেনের রিফিল বানানোর যন্ত্র তৈরির মেশিনের পাইকারি কারবার করে। তা ছাড়া…
ঠিক আছে, যথেষ্ট হয়েছে, আর লাগবে না কেজরিওয়ালের অন্য ব্যবসা সম্পর্কে উৎসাহ না দেখিয়ে জয়দেবকে মধ্যপথে থামিয়ে দিয়ে মহিমাময় বললেন, তা এরকম রং খেললি কোথায়? কেজরিওয়ালের বাড়িতে?
জয়দেব করুণ কণ্ঠে বললেন, আরে না! ওই কেজরিওয়ালদের ওখানে কাল দুপুরে গানবাজনা, খাওয়া-দাওয়া হল। অল্পস্বল্প আবির ছিল, কিন্তু আসল গোলমালটা হল রাতে।
মহিমাময় বললেন, রাতে কী হল?
জয়দেব লজ্জিত ভঙ্গিতে বললেন, সে মহা বেকায়দা। সন্ধ্যাবেলা আমি ওদের বাড়িতে বাইরের ঘরে ঘুমোচ্ছি, কেজরিওয়ালার আত্মীয়স্বজন কাঁদের বাড়িতে যেন গেছে। আমি ঘুম ভেঙে উঠে দেখি ওদের আউট হাউসে চাকর ড্রাইভারেরা বড় বড় পিতলের লোটায় কী সব খাচ্ছে। আমি চোখ কচলাতে কচলাতে সেখানে গিয়ে বসলাম। চমৎকার ভাঙের শরবত, সবাই খুশি হয়ে আমাকে খাওয়াতে লাগল। তারপরে অল্প অল্প মনে পড়ছে–হই-হুঁল্লোড়, নাচগান, রং। একটা মোটামতন
টিকি মাথায় লোক আমাকে কাঁধে নিয়ে অনেকক্ষণ বেরিলিকা বাজারমে… গাইতে গাইতে খুব নাচল। তারপর ভাল মনে পড়ছে না। এই আধ ঘণ্টা আগে ঘুম ভেঙে দেখি দারোয়ানদের ঘরের পাশে একটা দড়ির খাঁটিয়ায় ডুমুর গাছের নীচে শুয়ে আছি, গায়ে-মাথায়, জামা কাপড়ে রং মাখা।
আর বেশি বলার দরকার ছিল না। মহিমাময় ব্যাপারটা অনেকখানিই বুঝলেন। এবার প্রশ্ন করলেন, তা এরকম ভূতের মতো বেশে কোথায় যাচ্ছিস?
জয়দেব বললেন, কেন, তোর ওখানে? চল, একটু বসা যাক!
