ভয়ংকর বিপদ। প্রথম পিরিয়ডে ইংরেজির ক্লাস। সব ছাত্র হোম ওয়ার্কের খাতা জমা দিল, শুধু শশাঙ্কবাবু বাদ। তিনি যে স্কুলেই আসতে পারেননি, হোম টাস্ক কী ছিল তাই জানতেন না। এদিকে ইংরেজির মাস্টারমশাই ছিলেন একজন পার্টটাইম গুণ্ডা। জ্বর হয়েছে, তাই আসতে পারিনি এই সব কোনও কথাই তিনি বিশ্বাস করলেন না। সদ্য রোগমুক্ত শশাঙ্ককে তিনি বেধড়ক পেটালেন।
কী করে শশাঙ্ক যেন বুঝে গেলেন সত্যি কথায় কাজ হবে না। বানিয়ে বিশ্বাসযোগ্য বিচিত্র কারণ দেখাতে হবে। মাস দুয়েক মামার বাড়িতে মাসির বিয়েতে দিন দশেক কাটিয়ে স্কুলে ফিরতেই আবার সেই ইংরেজি মাস্টারের হাতে পড়লেন শশাঙ্কবাবু।
কিন্তু এবার ব্যাখ্যা প্রস্তুত ছিল। মামার বাড়ি তিনি গিয়েছিলেন তবে সেটা মাসির বিয়েতে, তা বললেন না। বদলে যা বললেন, সেটা হল তার দাদু মানে মাতামহ আমলকী গাছ থেকে আমলকী পাড়তে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে হাত-পা ভেঙে ফেলেছেন, সেই সংবাদ পেয়ে তিনি তার মাকে সঙ্গে করে মামার বাড়িতে গিয়েছিলেন, অবস্থা গুরুতর দেখে এ কয়দিন তাকে মায়ের সঙ্গে মামার বাড়িতে থাকতে হয়।
ছাত্রের এই কথা শুনে মারকুটে মাস্টার পর্যন্ত উদ্যত চড় থামিয়ে জিজ্ঞাসা করতে বাধ্য হলেন, দাদু, মানে তোমার মার বাবা?
শশাঙ্ক বলেছিলেন, আজ্ঞে হ্যাঁ।
মাস্টারমশায় তখন আবার প্রশ্ন করেন, বয়েস নিশ্চয় অনেক হয়েছে।
শশাঙ্ক জানিয়েছিলেন, বেশি নয়, এই সদ্য বাহাত্তর হয়েছে।
মাস্টারমশায় স্তম্ভিত হয়ে বললেন, বাহাত্তর বছর কম বয়েস নাকি? এই বয়েসে তোমার দাদু গাছে উঠে ফল পাড়েন।
শশাঙ্ক জানিয়েছিলেন, শুধু আমলকী নয়, আম, লিচু এমনকী দাদু তরতর করে নারকেল গাছের মাথায় উঠে গিয়ে ডাব-নারকেল পেড়ে আনেন।
হতবাক মাস্টারমশায় সেদিন শশাঙ্ককে মারেননি। পরে নিয়মিত সেই কল্পিত দাদুর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। মাস তিনেক পরে যখন তিনি জানলেন যে সেই বৃদ্ধ সুস্থ হয়ে উঠেছেন এবং আবার গাছে উঠে ফল পাড়া আরম্ভ করেছেন, তখন তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বাঁচলেন।
ছাত্রজীবনের পরে শশাঙ্কবাবুর চাকুরি জীবনের কথা বলতে হয়। বাইশ বছর বয়সে একটা সরকারি অফিসে কেরানির চাকরিতে তিনি প্রবেশ করেন। এ বয়েসটায় চাকরি করতে ভাল লাগে না। শশাঙ্কবাবু রাত জেগে চুটিয়ে আড্ডা দিতেন। ফলে মাঝেমধ্যেই অফিসে কাজের সময় ঘুমিয়ে পড়তেন।
শশাঙ্কবাবু দুর্ভাগ্যক্রমে রমলা পাল নামে এক মহিলা বড়বাবুর অধীনে কাজ করতেন। অবিবাহিতা, মধ্যবয়সিনী কুমারী রমলা পাল ভারি খিটখিটে স্বভাবের ছিলেন। তা ছাড়া খুব খোঁচা দিয়ে কথা বলতেন।
একদিন শশাঙ্কবাবু প্রায় সারারাত আড্ডা দিয়ে সকালে স্নান-খাওয়া করে অফিস যাওয়ার আগে বিছানায় একটু গা এলিয়ে শুয়েছিলেন। ওই অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েন। ফলে অফিসে আসতে দেরি হয়ে যায়।
বড়বাবু মানে রমলা পালকে তিনি নিজে থেকেই জানান যে বাসায় খাওয়া-দাওয়ার পরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তাই এই বিলম্ব। তার ব্যাখ্যা শুনে রমলা পাল কাষ্ঠহাসি হেসে জানতে চান, সে কী আপনি বাড়িতেও ঘুমোন নাকি?
এর পরে যে মাস ছয়েক চাকরিতে ছিলেন, শশাঙ্কবাবু আর রমলা পালকে একটিও সত্যি কথা বলেননি। একবার বন্ধুর বিয়েতে বরযাত্রী গিয়ে পরের দিন বরযাত্রীর সাজে সিল্কের পাঞ্জাবি আর কোঁচানো ধুতি পরে বেশি দেরি করে কনের বাড়ি ডোমজুড় থেকে অফিসে এসে পৌঁছলেন।
বলা বাহুল্য, একে দেরি, তার ওপরে এই সাজপোশাক দেখে রমলা পাল কটাক্ষ করেছিলেন। তখন শশাঙ্কবাবু বললেন, আমার বড় পিসিমার বিয়ে ছিল ম্যাডাম।
রমলা পাল বিস্মিত হয়ে বললেন, আপনার বড় পিসিমার বিয়ে?
শশাঙ্কবাবু বললেন, তেমন বয়েস হয়নি। এই আর্লি ফিফটি। আমারই এক বন্ধুকে বিয়ে করলেন।
রমলা পাল বললেন, আপনার বড় পিসিমা আপনার বন্ধুকে বিয়ে করলেন, আর্লি ফিফটিতে?
ইয়েস ম্যাডাম, শশাঙ্কবাবু বললেন, আপনার চেয়ে অন্তত দশ বছরের বড় হবেন।
এরপর থেকে রমলা পাল কেমন সলজ্জ দৃষ্টিতে শশাঙ্কবাবুর দিকে তাকাতেন। তাঁকে দেখলেই শাড়ির আঁচলটা দিয়ে গলা ঢাকা দিতেন কিংবা অন্যমনস্কভাবে হাতের আঙুলে জড়াতেন।
ইতিমধ্যে শশাঙ্কবাবু বুঝে গেছেন যদি ঠিকমত মিথ্যার বেসাতি করা যায় তাহলে তার থেকে লাভজনক আর কিছু নেই।
স্ত্রীকে, বাবাকে, অফিসের ওপরওলাকে, বাড়িওলাকে, প্রেমিকাকে–পাড়ার মাস্তানকে, সবাইকে কত কারণে কতরকম ব্যাখ্যা দিতে হয়। সেই ব্যাখ্যা যদি চমকপ্রদ অথচ বিশ্বাসযোগ্য হয়, তবেই কাজ চলে, না হলে বিপদ অনিবার্য।
প্রথম প্রথম শৌখিনভাবে একে-ওকে চেনা-জানাদের পরামর্শ দিতেন শশাঙ্ক রায়চৌধুরী। এখন ক্রমশ তার নাম ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, না ছেড়ে উপায়ও ছিল না। শেষের। দিকে রমলা পাল বড়ইব্রীড়াপরায়ণা হয়ে উঠেছিলেন, তাঁকে দেখলেই কেমন ডগমগ হয়ে উঠতেন।
চাকরি ছেড়ে অবশ্য শশাঙ্ক রায়চৌধুরীর কোনও ক্ষতি হয়নি। কাণ্ড-কারখানার এখন রমরমা চলছে। প্রতি সন্ধ্যায় হাজার খানেক টাকা আয় হয়।
বিশেষ জরুরি প্রয়োজনে আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট না করেও যাওয়া যায়। পুজোসংখ্যার জন্যে যে লেখা ১ জুন দেয়ার কথা ছিল সেটা এই যে আমি এই ভাদ্রশেষেও লিখছি তা সম্ভব হয়েছে শশাঙ্কবাবুর কৃপায়। তারই পরামর্শে হাতের বুড়ো আঙুলে একটা মিথ্যে ব্যান্ডেজ বেঁধে সম্পাদকদের দেখিয়েছি, ঘুমের মধ্যে টিকটিকিতে কামড়িয়ে দিয়েছে বলে। তারা যে আমার কথা অবিশ্বাস করেননি, আমার জন্যে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন, এই লেখা ছাপা হওয়াই তার প্রমাণ।
কালমেঘ
বঙ্গাব্দ তেরোশো ছিয়াশি।
