ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করার পরে একশো সত্তর টাকার বিনিময়ে শশাঙ্কবাবুর পরামর্শ পেলেন।
শশাঙ্কবাবু ধনঞ্জয়বাবুর কথা শুনে বললেন, রদ্দি পুরনো বস্তাপচা ব্যাখ্যায় এ যাত্রা পার পাবেন। আপনাকে নতুন কৌশল নিতে হবে।
নতুন কৌশলগুলির অবশ্য রকমফের আছে। এবং তা আগেই লিখে সাইক্লোস্টাইল করে রাখা আছে। শশাঙ্কবাবু তার টেবিলের বাঁ পাশে গাদা করে রাখা ফাঁইলের মধ্য থেকে একটা ফাইল খুঁজে বার করলেন, ফাঁইলের গায়ে লেখা গৃহশান্তি।
গৃহশান্তি শীর্ষক নথিটি খুলে তার মধ্যে থেকে একটি নির্দেশাবলী বার করলেন তিনি, তারপর সেটা ধনঞ্জয়বাবুকে দিলেন।
নির্দেশাবলী অতি দীর্ঘ ও বিস্তৃত, বেশ কয়েক শিট মুদ্রিত পৃষ্ঠা। তার মধ্য থেকে কয়েকটি বাছাই করে সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করছি।
(১) আপনার যদি টাকা থাকে ও সাহস থাকে, এখান থেকে সরাসরি বেহালা ফ্লাইং ক্লাবে চলে যান। একটা বিমান ভাড়া করে সেই বিমান থেকে প্যারাসুটে করে নিজের বাড়ির ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ুন। শুধু আপনার গৃহিণী কেন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই এত চমৎকৃত হবেন যে দেরি করে আসার প্রশ্নই উঠবে না।
(২) বুকে ব্যথা করছে বলে যেকোনও নার্সিংহোমে ভরতি হয়ে যান, সেখান থেকে বাড়িতে খবর পাঠান।
(৩) যেকোনও ট্রাফিক পুলিশের হুইসেল বা ছাতা কেড়ে নিন। এক ঘণ্টা পরে থানার হাজত থেকে বাসায় খবর পাঠান।
এইরকম আরও অনেক আছে। পুরো ব্যবস্থাপত্রটি খুঁটিয়ে পড়ার পর ধনঞ্জয়বাবু বলেছিলেন, এর কোনওটাই তার পক্ষে সম্ভব নয়। তখন টেবিলের ওপর থেকে খবরের কাগজের কাটিং লেখা একটি নথি তুলে নিয়ে সেটা খুলে কয়েকটা কাটিং পর্যালোচনা করে শশাঙ্কবাবু বললেন, বাগবাজারের ঘাটে চলে যান। সন্ধ্যার দিকে ইলিশ উঠছে, দুটো বড় দেখে মাছ কিনুন। তারপর সেখান থেকে দৌড়ে বাড়ি চলে যান, ঘামে জামাকাপড় ভিজে জবজবে হয়ে যাবে, বাসায় প্রবেশ করে ধপ করে বসে পড়ুন, এক গেলাস জল চান। তারপর বলুন, বসনিয়ায় গণহত্যার প্রতিবাদে ঘুঘুডাঙায় পথ অবরোধ চলেছে। এই রোদ্দুরে এতটা পথ হাঁটতে হাঁটতে আসছি। আঃ আরেক গেলাস জল।
সৎ পরামর্শ পেয়ে ধনঞ্জয়বাবু খুশি মনে জোড়া ইলিশ হাতে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন।
এই তো আজ এখন শশাঙ্কবাবুর সামনে বসে রয়েছে নতুনবাজার থানার বড় দারোগা রমজান খান সাহেব।
খান সাহেব মহা বেকায়দায় পড়েছেন। তিনি বছর দেড়েক আগে নতুনবাজার থানার পোস্টিং নিলামে তিন লাখ টাকায় ডেকে নিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে নিলামের ডাকে হেরে গিয়ে তাঁর পুরনো ব্যাচমেট তথা প্রতিদ্বন্দ্বী জগা মাইতি দুর্নীতি প্রতিরোধ দপ্তরে ইনসপেক্টর হয়ে চলে যায়। সেই জগা এখন তার পিছনে লেগেছে।
বালিগঞ্জ লেকে, লেক গার্ডেনে, লেক টাউনে, সল্টলেকে, কলকাতার মধ্যে, আশেপাশে যতরকম লেকের ব্যাপার আছে সব জায়গায় খান সাহেবের বাড়ি বা ফ্ল্যাট আছে। লেকের ওপর খুব ঝোঁক তার। এ ছাড়া বেনামিতে সতেরোটা ট্রাক, বারোটা বাস মিনিবাস, গোটা তিনেক ট্যাকসি, শখানেক রিকশা তার হয়েছে। আর সেই অনুযায়ী ধনসম্পদ বিভিন্ন ব্যাঙ্কের বিভিন্ন শাখায় অ্যাকাউন্ট এবং লকার। প্রায় সবই ধরে ফেলেছে জগা।
ঘোর বিপদে পড়ে খান সাহেব কাণ্ড-কারখানায় এসেছেন। তার সমস্ত কথা শুনে শশাঙ্কবাবু সম্পত্তি রক্ষা শীর্ষক একটি নথি খুলে একটা ব্যবস্থাপত্র রমজান খানের হাতে দিলেন। সেটা একবার চোখ বুলিয়ে রমজান খান বললেন, দাদা, সবই ট্রাই করেছি, এই বিয়ের সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে যৌতুক পেয়েছি, নানান সম্পত্তি, চাচার সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে, দান সূত্রে পেয়েছি, লটারিতে টাকা পেয়ে করেছি কিন্তু কিছুই ধোপে টিকছে না। জগা বড় ধূর্ত।
তখন শশাঙ্ক বললেন, আমি আপনাকে নতুন একটা পরামর্শ দিচ্ছি, এটাই লেটেস্ট চলছে। আপনি যেকোনও বড় নেতা, মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এমনকী লাটসাহেব বা বিচারপতির নাম বলুন, একটা গ্রহণযোগ্য নাম ভেবেচিন্তে বলবেন, তাঁর সঙ্গে কার্যকারণ কোনও সূত্রে আপনার যোগাযোগ আছে বা কখনও ছিল। তারপর বলুন এসব সম্পত্তি, টাকা পয়সা, সোনাদানা সবই তার, আপনার বেনামে তিনিই এসব করেছেন। নিজের নামে করতে অসুবিধে আছে কিনা তাই। দরকার হলে এফিডেবিট করে বলে দিন।
রমজান খান হাজার হলেও পুলিশের লোক, আদালতকে এখনও ভয় পান। তিনি বললেন, আদালতে এফিডেবিট করে এসব কথা বলা যাবে?
শশাঙ্কবাবু বললেন, কলকাতায় এফিডেবিট করতে না চান, সুইজারল্যান্ড লন্ডন বা নিদেন পক্ষে ঢাকায় চলে যান। সেখানে নিশ্চয় আপনার আত্মীয়স্বজন আছেন, সেখানে গিয়ে এফিডেবিট করিয়ে ফিরে আসুন।
আশা করি ইতিমধ্যেই পাঠক-পাঠিকা ধরে ফেলেছেন, কাণ্ডকারখানা কোম্পানির কাজকর্ম কী।
এই কোম্পানির একজনই লোক। এই শশাঙ্ক রায়চৌধুরী। তিনি কীভাবে এই কোম্পানির পরিকল্পনা করলেন সেটা অনুধাবনের জন্যে শশাঙ্কবাবুর অতীত ইতিহাস একটু সংক্ষেপে আলোচনা করছি।
০২. অতীত
হে অতীত তুমি গোপনে গোপনে
–রবীন্দ্রনাথ
শশাঙ্ক রায়চৌধুরীর অতীত জীবনের মাত্র দুটো ঘটনা বলব।
প্রথমে তার স্কুল জীবনের একটা দুঃখজনক ঘটনার কথা বলি। তখন তিনি বিদ্যালয়ের মাঝারি ক্লাসে এই সিক্স-সেভেনে পড়েন। একবার পর পর কয়েকদিন জ্বরে ভুগে প্রায় সপ্তাহখানেক কামাই করে প্রথম যেদিন অন্নপথ্য করে স্কুলে ফিরলেন সেদিনই পড়লেন বিপদে।
