এসব কথা ঠিক আছে। কিন্তু আমাদের গল্প এই প্রাচীন বাড়ির দোতলায় সিঁড়ির ডান পাশের একটি ছোট কিউবিকলের ব্যানার নিয়ে। কারণ এর ব্যাপারটা একটু অন্যরকম।
নীচে কাঠের সিঁড়ির পাশে একটা ডাকবাক্সে এবং উপরোক্ত ছোট কিউবিকলের গায়ে ইংরেজিতে কোম্পানির নাম লেখা আছে। দুই শব্দের নাম কিন্তু চট করে উচ্চারণ করা বেশ কঠিন। ইংরাজি ভাষায় লেখা হলেও যেকোনও সামান্য ইংরেজি জানা লোক বুঝতে পারে এই কোম্পানির নামের শব্দ দুটো মোটেই ইংরেজি নয়। কেউ কেউ এমনও ভাবতে পারে, ফরাসি বা ইতালীয় কোম্পানি এটা।
বাগাড়ম্বর না বাড়িয়ে ওই কোম্পানির নামটা আপাতত জানিয়ে রাখছি। তবে সাদা বাংলায় জানালে বিষয়টা বোধগম্য হবে না। তাই লেটার বাক্সে সাইনবোর্ডে যেমন আছে তাই জানাচ্ছি।
KANDA-KARKHANAA
যাঁদের এরপরেও বুঝতে কোনও অসুবিধে হচ্ছে তাদের সুবিধের জন্যে নামটা সাদা বাংলায় পড়ে দিচ্ছি,
কাণ্ডকারখানা
কারও কারও মনে কৌতূহল জাগতে পারে এরকম অদ্ভুত নামের কোনও কোম্পানি হতে পারে কিনা? না, পারে না, মাত্র এই একটিই আজ পর্যন্ত হয়েছে।
এর পরেই অবশ্য প্রশ্ন উঠবে এই রকম বেগতিক নামের কোম্পানি, কারখানা বা অফিসে কী কাজ হয়, কেন এই কাণ্ডকারখানা?
এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদের ওই ইংরেজিতে নাম লেখা কিউবিকলের মধ্যে, কাণ্ডকারখানার মধ্যে প্রবেশ করতে হবে।
কাণ্ডকারখানার ভেতরটা অবিকল ডাক্তারের চেম্বারের মতো, বোধহয় এককালে তাই ছিল কারণ পার্টিশনের কাঠের দরজার গায়ে একটা পুরনো দিনের গ্ল্যাক্সো বেবির ছবি, তার নীচে একটা। দুই কাঁটাওয়ালা নকল প্লাস্টিকের ঘড়ি, যার কাটা দুটো হাত দিয়ে ঘোরানো যায় এবং যার উপরে লেখা আছে ডাক্তারবাবুর জন্যে ঘড়ির সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
চেম্বারটি দুই অংশে বিভক্ত। ঘরের প্রথম আধাআধি অংশ ভিজিটরস রুম। সেখানে কয়েকটি পুরনো সোফা, বাড়তি দুটো কাঠের চেয়ার, একটা লম্বা নিচু টেবিলে অনেক রকম ইংরেজি বাংলা পত্র-পত্রিকা রয়েছে। সেগুলো প্রায় সবই ময়লা, ছেঁড়া। একটা সিনেমা পত্রিকার প্রচ্ছদে দেখা যাচ্ছে, একটি প্রশ্নমূলক প্রবন্ধের অবতারণা। উত্তমকুমার কি বোম্বাই চলে যাচ্ছেন? আর একটি খেলাধুলার পত্রে ছেঁড়া পাতায় বড় বড় অক্ষরে ঘোষণা রয়েছে পতৌদি এবার অবসর নিচ্ছেন। এই আদ্যিযুগের কাগজগুলো বোধহয় সেই ডাক্তারের চেম্বার থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া।
ভিজিটরস রুমের পরেই দরজা বন্ধ প্রকৃত চেম্বার। তার মধ্যে টেবিল-চেয়ার। সেক্রেটারিয়েট টেবিলের এক পাশে একটা গদিমোড়া চেয়ার, সামনে দুটো হাতলওলা সাবেকি কাঠের চেয়ার।
ওই গদিমোড়া চেয়ারটায় বসেন শশাঙ্ক রায়চৌধুরী, এই কাণ্ড-কারখানার প্রাণপুরুষ, উদ্ভাবক ও পরিচালক। সামনের চেয়ার দুটো কাণ্ডকারখানার মক্কেলদের জন্যে। অধিকাংশই গোপন ব্যাপার। অনেকে একা আসেন। অনেকে আবার স্ত্রী কিংবা কোনও অন্তরঙ্গ বন্ধুবান্ধবকে সঙ্গে আনেন।
কাণ্ডকারখানায় কী ধরনের কাজ হয় সেটা বোঝনোর জন্যে দু-একটা উদাহরণ দিচ্ছি।
তার আগে একটু ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।
মনে করুন আপনি সারা সন্ধ্যা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, তাস পিটিয়ে হই হই করে কাটিয়েছেন, এখন চোরের মতো বাড়ি ফিরছেন, আপনার স্ত্রী হাতা কিংবা খুন্তি হাতে আপনার জন্য। অধীর প্রতীক্ষা করেছেন। ঘড়িতে এগারোটা বাজে।
এই অবস্থায় আপনি নিশ্চয় আপনার স্ত্রীকে বলবেন না এত রাত পর্যন্ত তাস খেলেছেন, আড্ডা দিয়েছেন। আপনাকে বলতে হবে আপনার অফিসের এক সহকর্মী হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। তাকে ডাক্তার দেখিয়ে শহরের অপর প্রান্তে তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসতে দেরি হয়ে গিয়েছিল, কিংবা মানিব্যাগ পকেটমার হওয়ার আপনি অফিস থেকে বাড়ি পর্যন্ত এগারো মাইল পথ হাঁটতে হাঁটতে আসছেন।
বলা বাহুল্য, এই দুটোর কোনওটাই তেমন বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং এর ফলে আপনাকে হয়তো আপনার স্ত্রীর হাতে আরও বেশি মার খেতে হবে।
কিন্তু আপনি যদি কাণ্ডকারখানায় এসে মাত্র দশ জেম অর্থাৎ একশো সত্তর টাকা ফি দিয়ে শশাঙ্ক রায়চৌধুরীর কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন তা হলে এমন হত না।
ঠিক এই রকম একটা কেস কাল বিকেলেই শশাঙ্কবাবুর কাছে এসেছিল। বরানগরের ধনঞ্জয়বাবু বাড়িতে কুটুম এসেছে বলে দমদম বাজারে গিয়েছিলেন ভাল মাছ কিনতে। কিন্তু গলির মোড়েই আটকে গিয়েছিলেন একটা তিন তাসের ঠেকে। সকাল গড়িয়ে দুপুর, বেলা চারটে পর্যন্ত চলল সেই জুয়াখেলা। বাজারের ব্যাগ পড়ে রইল ধনঞ্জয়বাবুর পায়ের কাছে।
বিকেল চারটেয় যখন ক্লান্ত জুয়াড়িরা যে যার মতো পাততাড়ি গোটাল, তখন ধনঞ্জয়বাবুর প্রতি ভাগ্যদেবী শ্রীযুক্ত জুয়া ঠাকুরানি খুবই প্রসন্না। তিনি প্রায় হাজার বারোশো টাকা জিতেছেন।
বাজারের ব্যাগটা পায়ের কাছ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে ঠেক থেকে বেরিয়ে ধনঞ্জয়বাবু ভাদ্র মাসের বিকেলবেলার কড়া রোদে হুশ ফিরে পেলেন। বাড়িতে কুটুম, রীতিমতো বড় কুটুম, স্ত্রীর বড় ভাই, তারই জন্যে ভাল মাছ কিনতে বার হয়ে তারপর এই কাণ্ড।
কিন্তু ধনঞ্জয়বাবু নানাসূত্রে কাণ্ডকারখানার খবর জানতেন। ভাসা ভাসা ভাবে কোথায় কাণ্ডকারখানার অফিসটা সেটারও ধারণা ছিল। সঙ্গে সঙ্গে একটা ট্যাক্সি নিয়ে সাহেব পাড়ায় এসে খুঁজে খুঁজে কাণ্ড কারখানায় পৌঁছে গেলেন।
