তখন বড় দারোগা রামগতিবাবুসম্বিৎ হারাননি, তিনি হনুমানের উদ্দেশ্যে হেঁকে উঠলেন, এই এখানে কী? ভাগ এখান থেকে?
হনুমান ঘরের মধ্যখানে এসে গেছে। সে কটমট করে রামগতিবাবুর দিকে তাকাল, সেও ইতিমধ্যে ধূম্রলোচন হয়ে গেছে, সে দৃষ্টি বড় ভয়ংকর।
জমাদার শুকদেও যাদব বড় দারোগার পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি বললেন, সাহেব হিন্দিমে বলিয়ে বজরঙ্গবলি বাংলা সমঝায় না।
উপস্থিত জনতার মধ্যেও অনেকে বলল, স্যার হনুমান বাংলা কি বুঝবে, ওর সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলুন।
কিন্তু, দুঃখের বিষয়, হিন্দি বা বাংলা কোনও ভাষাই ব্যবহার করার সুযোগ পেলেন না রামগতিবাবু। তার আগেই হনুমান এক লাফে টেবিলে উঠে সটান এক চড় কষাল রামগতিবাবুর গালে।
একাত্তর চুমুক কারণ সুধার পরে এই রকম একটা মত্ত হনুমানের চড়ে রামগতিবাবু চোখ উলটিয়ে মেঝেতে টলে পড়লেন।
হইহই কাণ্ড। চোখে মুখে জল ছিটাও, ডাক্তার ডাকো।
বীর হনুমান কিন্তু নির্বিকার। সে ধীরে-সুস্থে টেবিলের ওপর বসে খালি ড্রয়ারের মধ্যে হাত গলিয়ে প্রথমে বড় দারোগার পাথরের গেলাসটা বার করে অবশিষ্ট বাহাত্তরতম চুমুকটি শেষ করল।
জিনিসটা তার ভালই লাগল। এবার সে শ্বেতপাথরের গেলাসটা মেঝেতে ছুঁড়ে ভেঙে ফেলে দিল। তারপর নিতাইমাস্টারের কাঁচের গেলাসটায় ভ্যাট ঊনসত্তুরের বোতল থেকে মূল্যবান পানীয় ঢেলে ঢেলে খেতে লাগল।
এতক্ষণে তার দৃষ্টি পড়ল টেবিলের ওপর স্থাপিত পেপার-ওয়েট নির্ভর পকেট কালীটার দিকে। মা কালীর পদপ্রান্তের সিঁদুর সাবধানে সাবধানে একটা আঙুলে ছুঁইয়ে নিজের নোমশ কপালে মাখল, তার আগে অবশ্য অল্প একটু সিঁদুর জিব দিয়ে চেটে পরীক্ষা করেও দেখেছিল।
এরপর যেটুকু করার বাকি ছিল সেটুকুও করল। একটি ছোট লাফ দিয়ে বড়বাবুর সদ্য পরিত্যক্ত সামনের চেয়ারে গিয়ে বসল।
এদিকে ধরাধরি করে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে মুখে চোখে জল ছিটোতে একটু পরে রামগতিবাবুর জ্ঞান ফিরল। জ্ঞান ফিরতেই তিনি প্রথম আদেশ দিলেন, ওই বানর হারামজাদাকে গুলি করে মার।
আদেশ শুনে হনুমানভক্ত জমাদার শুকদেও যাদব শিউরে উঠলেন। জিব কেটে, চোখ বুজে, কানে আঙুল দিলেন। তারপর ধাতস্থ হয়ে বীরের মতো জানালেন, তিনি তার শরীরে প্রাণ থাকতে বজরঙ্গবলির ওপর গুলি চালাতে দেবেন না। জনতার মধ্যেও অনেক সমস্বরে শুকদেওজিকে সমর্থন জানাল।
ব্যাপার সুবিধের নয় বুঝে, ভঙ্গ নেশা নিয়ে রণে ভঙ্গ দিয়ে রামগতিবাবু কোয়ার্টারে ফিরে গেলেন।
পরের দিন সকালবেলায় হনুমানটাকে কাঁঠালহাটির কোথাও দেখা গেল না। সবাই, বিশেষ করে রামগতিবাবু এবং নিতাইমাস্টার হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
কিন্তু ভর সন্ধ্যায় কোথা থেকে যে ফিরে এল হনুমান। প্রথমে চুল্লুর ঠেকে এবং পরে থানায় আক্রমণ চালাল। যথাক্রমে নিতাইমাস্টার এবং রামগতিবাবু নির্যাতিত হলেন।
তারপর থেকে আজ দশদিন একনাগাড়ে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়ে চলেছে।
দিনমানে বীর হনুমানের টিকিটিও দেখতে পাওয়া যায় না। অন্ধকার ঘন হতেই তার হামলা শুরু হয়।
দ্বিতীয় দিন চড় খাওয়ার পরেই নিতাইমাস্টার ঠেকে আসা এবং চুলু খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন।
তৃতীয় দিন থেকে রামগতিবাবু সন্ধ্যাবেলা থানায় না বসে নিজের কোয়ার্টারেই ধূম্রলোচনার সাধনা করেছিলেন। কিন্তু চতুর্থ দিনেই গন্ধে গন্ধে হনুমান সেখানে হাজির।
বন দপ্তরকে রামগতিবাবু খবর দিয়েছিলেন, তাঁরা বলেছেন দিনের বেলায় হনুমান বেরোলে জানাবেন। আমাদের লোক গিয়ে ধরে আনবে। রাতের বেলায় সম্ভব হবে না, কর্মীদের তা হলে ওভারটাইম দিতে হবে।
ফায়ার ব্রিগেড অনেক সময় এ ধরনের কাজ করে। মহকুমা সদরে গিয়ে দমকল দপ্তরে কথা বলে এসেছেন। কিন্তু তারা নারাজ। আগুন না লাগলে তারা নড়বেন না।
.
কাঁঠালহাটি থানার বড় বিপদ।
রামগতিবাবু স্থির করেছেন একদিন সন্ধ্যায় গোপনে থানায় আগুন ধরিয়ে দেবেন।
কাণ্ড-কারখানা
০১. বর্তমান
এখন যাঁরা বর্তমানে আছেন মর্ত্যলোকে
– রবীন্দ্রনাথ
পার্ক স্ট্রিটের পাশের একটি গলির মধ্যে অফিস। একটা পুরনো বাড়ির দোতলায়, সিঁড়িটা কাঠের। ঘরের দরজা জানলাগুলো অতিকায় আকারের, নয় ফুট বাই পাঁচ ফুট, ছাদের সিলিং প্রায় চৌদ্দ ফুট উঁচুতে।
এসব বাড়িতে এককালে সাহেবসুবোরা, সিভিলিয়ান বা ব্যারিস্টাররা থাকতেন। তাঁরা প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে বিদায় নিয়েছেন। তারপরে বেহাত, বেদখল হতে হতে এখন কে যে মালিক সেটা বোঝাই কঠিন।
বাড়ির মেরামত নেই, চুনকাম নেই। তবে সামনের লন-এ পুরনো দিনের দু-চারটে চাঁপা, গন্ধরাজ, কামিনী ফুলের গাছ রয়েছে। সময়ে-অসময়ে সেসব গাছে ফুল ফোটে, সেই ফুলের গন্ধ। একেকদিন অকারণে আচ্ছন্ন করে তোলে পুরনো সাহেবপাড়ার জরাজীর্ণ বাড়ির চারপাশ।
বাড়িটার নীচে-ওপরে ফুটবল খেলার মাঠের মতো লম্বা-চওড়া বড় বড় ঘরগুলোকে নানা কায়দায় পার্টিশন করে ছোট ছোট ঘর বানানো হয়েছে। এই যাকে বলে কিউবিকল।
এইসব কিউবিকলের অধিকাংশই ডাক্তারের চেম্বার। কিছু কিছু ঘরে নতুন যুগের ধোপদুরস্ত জোচ্চোর প্রমোটর, ডেভলপার কোম্পানি বানিয়েছে। তা ছাড়া রয়েছে কমপিউটার কারবার, হরেকরকম ব্যবসার প্রতিষ্ঠান। এবং একটি বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠান, যাদের মডেল সুন্দরীরা এতই জনপ্রিয় যে দিনের বেলায় কখনও আসেন না। তাদের প্রবেশ ঘটে সন্ধে গড়িয়ে রাতে।
