লাল্লুসাহেব পুরনো দাগি আসামি, পুলিশের খাতায় তাঁর সাড়ে তিনপাতা রেকর্ড। তা ছাড়া জামিন টপকেছেন। মাননীয় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে দুদফায় তার আড়াই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হল।
মধ্য থেকে বেকায়দায় পড়লেন রঞ্জনবাবু। তিনি জগুকে যোগাযোগ করলেন। কিন্তু লাল্লুসাহেবের করুণ পরিণতি থেকে শিক্ষালাভ করে জগু আর ক্রীড়া-পরিচালনার লাইনে আসতে চাইল না।
এমতাবস্থায় রঞ্জনবাবুর আর কী-ই বা করণীয় ছিল? তিনি যা যুক্তিসঙ্গত তাই সিদ্ধান্ত নিলেন। লাল্লু যদি পারে আমি কেন পারব না, আমিও তো বিপ্লবী কবি। দু-চার ঘা মার খেলে আমার কী ক্ষতি হবে?
অতঃপর কবি রঞ্জন চক্রবর্তী হাফপ্যান্ট ইত্যাদি পরিধান করে মুখে হুইসিল নিয়ে নিজেই একদিন মাঠে নামলেন। তারপর যা হওয়া স্বাভাবিক তাই হল, প্রটেস্ট-ফি এবং কাউন্টার প্রটেস্ট-ফিয়ের লোভে খেলা আরম্ভের পনেরো মিনিটের মাথায় একটি অন্যায় পেনাল্টি দিলেন।
যে পক্ষের বিরুদ্ধে এই রায় দিলেন তাদের নামটা খেয়াল রাখলে তিনি এই মারাত্মক ভুল করতেন না।
সেই পক্ষ বা ক্লাবের নাম রক্তরাঙা শিবির। এর পরের ঘটনা না লেখাই ভাল। শ্ৰীযুক্ত রঞ্জন চক্রবর্তীর এই কাহিনি পাঠ করে যদি কোনও কোমলহৃদয়া পাঠিকার মনে সামান্য। অনুকম্পাও দেখা দেয় তিনি দয়া করে বাঙ্গুর হাসপাতালের সার্জিকাল ওয়ার্ডে দুশো বত্রিশ নম্বর বেডে তাঁকে দেখতে যাবেন। ভদ্রলোক আজ আড়াই মাস কোমর এবং ঘাড় ভেঙে শয্যাশায়ী হয়ে আছেন।
হিতোপদেশ
ক্ষুদ্র একটি ভ্রম নিরসনের জন্য এই শেষ পর্বটিতে হাত দিতে হল।
ভ্রমটি আর কিছুই নয়, এই সামান্য কাহিনির নাম কবিতা ও ফুটবল না দিয়ে আমার উচিত ছিল কাহিনিটির একটি সর্বজন গ্রাহ্য এবং পরিচ্ছন্ন নাম দেয়া।
স্বধর্মে নিধনং শ্রেয় নাম কেমন হত কে জানে? কিন্তু শ্রেয় বানানে বিসর্গ দিতে হবে কি না ঠিক করতে না পেরে কবিতা ও ফুটবল নামই রাখতে হল।
কাঁঠালহাটির গল্প
এই গল্পের নাম পাঠ করেই সকল বুদ্ধিমান পাঠক এবং অনুরূপ বুদ্ধিমতী পাঠিকা বুঝতে পেরেছেন যে এই গল্পটা কাঁঠালহাটি নামে একটা গ্রামের ব্যাপার নিয়ে।
সর্বশ্রী পাঠকগণ ও সর্বশ্রীমতী পাঠিকাগণ ঠিকই ধরেছেন।
কিন্তু একটা গোলমাল আছে।
গ্রামের নাম কাঁঠালহাটি শুনে আপনারা কেউ যদি ভেবে থাকেন, এই গাঁয়ে প্রচুর কাঁঠাল হয়, গ্রামের ভিতরে বা পাশে সেই কঁঠালের হাট বসে সেই কারণে এমন নামকরণ, তা হলে কিন্তু ভুল করেছেন।
কাঁঠালহাটিতে কাঁঠালগাছ নেই তা নয় কিন্তু সে হাট বসানোর মতো ব্যাপার নয়।
তা ছাড়া কাঁঠালহাটিতে কোনও হাট নেই। নিকটতম হাট এখান থেকে চার কিলোমিটার দক্ষিণে মোল্লারপাড়ায়। সেখানে তরিতরকারি, মাছ-মাংস, চাল-ডাল, মরশুমি ফল এইসব পাওয়া যায়। কাঠালের মরশুমে দু-চারটে কাঁঠালও পাওয়া যায়, তবে তাকে কঁঠালের হাট বলা যায় না।
কাঁঠালহাটিতে হাট না থাকলেও বেশ বড় বাজার আছে। গ্রামের সামনের দিকে হাইওয়ের পাশে নতুনবাজার, সেখানে সুপার মার্কেট হবে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। গ্রামের ভিতরের দিকে রয়েছে পুরনো বাজার।
কাঁঠালহাটিকে অবশ্য গ্রাম বলা অনুচিত হচ্ছে। কাঁঠালহাটিতে পঞ্চায়েত অফিস আছে, থানা আছে। বিডিও অফিস থেকে ভিডিও হল সবই আছে। উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল আছে। হাইওয়ের পেট্রল পাম্পের পাশে বাসস্টপ থেকে এক্সপ্রেস বাস ধরলে সাড়ে তিন ঘণ্টায় কলকাতার ময়দানে পৌঁছে দেয়।
বছর তিরিশ চল্লিশ আগে কাঁঠালহাটিকে হয়তো বলা যেত গ্রাম, গণ্ডগ্রাম। কিন্তু এখন জায়গাটি পুরো গ্রাম্যতা বিসর্জন না দিলেও আধাআধি শহর হয়ে উঠেছে।
কাঁঠালহাটি গ্রামের মাঝখানে পুরনো বাজারের উলটো দিকে রয়েছে পঞ্চায়েত ও বিডিও অফিস। ডাকঘর আর থানা।
কাঁঠালহাটি থানার বড় বিপদ।
না। পাঠক-পাঠিকা চট করে ভুল ভেবে নেবেন না।
এখানে প্রতিদিন দিনে-রাতে ডাকাতি-রাহাজানি হচ্ছে, তা নয়, খুন-ধর্ষণ খুব বেড়ে গেছে তাও বলা যাবে না। এত বড় একটা থানা এলাকায় মাসে-দুমাসে দুয়েকটি খুন, দুয়েকটি ধর্ষণ, দু-চারটি ডাকাতি-রাহাজানি, দু-দশটি চুরি বাটপারি এসব তো থাকবেই। যতদিন চন্দ্রসূর্য আছে, জোয়ার ভাটা আছে এসব তো ঘটবেই। মানুষের চরিত্র কি কখনও বদল হবে?
কিন্তু এসব কোনও সমস্যা নয়। এসব তো চিরদিনের মামুলি ঝামেলা। কাঁঠালহাটি থানার বিপদ হয়েছে একটি হনুমানকে নিয়ে। হনুমান না বলে বীর হনুমান বলাই ভাল।
বিপুল আকার ও আয়তনের এই হনুমানটিকে গ্রামের লোকেরা ভালবেসে নাম দিয়েছে বীর হনুমান। কৃত্তিবাসের রামায়ণে অঙ্গদ রায় পরে (লঙ্কাকাণ্ডের প্রায় প্রথমেই যে বিশাল বানরের কথা বলা আছে, তার বর্ণনা এই হনুমানের সঙ্গে বেশ মেলে।
এই বীর হনুমানটির সঙ্গে আজ প্রায় দশ-এগারো দিন হয়ে গেল বিরোধ বেধেছে কাঁঠালহাটি থানার বীরবিক্রম বড়বাবুর।
কোনও এক অজ্ঞাত কারণে অধিকাংশ পুলিশ থানারই ও. সি. বা বড় দারোগা হলেন সদব্রাহ্মণ। কারণটা কেউ জানে না, বোধ হয় সরকার বাহাদুরও অবহিত নন।
কাঁঠালহাটি থানার ও. সি. হলেন রামগতি গঙ্গোপাধ্যায়। ত্রিসন্ধ্যা আহ্নিক করেন। একাদশী-অমাবস্যায় উপোস করেন। বস্তুত গাঙ্গুলিমশায় এই আজকের দিনেও এক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ। বর্ণহিন্দু ভিন্ন অন্য কোনও আসামিকে পেটালে কিংবা চড়-চাপড় দিলেও জামাকাপড় ছেড়ে গঙ্গাস্নান করেন। বেজাত কুজাতের বাড়িতে কিংবা নিষিদ্ধ পল্লিতে তল্লাশি বা ধরপাকড় করতে গেলে গলার পইতে, হাতের পলা বসানো মন্ত্রসিদ্ধ রুপোর আংটি একটা টিনের কৌটোয় ভরে থানার সিন্দুকে রেখে যান।
