অপর দিকে রামগতিবাবুর মতো দোর্দণ্ডপ্রতাপ বড় দারোগা আজকাল বিরল। তাঁর প্রতাপে সরকার পক্ষীয় এবং সরকার বিরোধী স্থানীয় পানাসক্ত নেতারা একই ঠেকে চুল্লু খায়, কখনও কোনও গোলমাল হয় না।
যাঁরা ঠেকের ব্যাপারটা জানেন, বুঝতে পারছেন, মুরশিদকুলি খাঁর আমলে বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খাওয়ার পরে এরকম ঘটনা আকছার ঘটে না।
প্রবল প্রতাপান্বিত রামগতিবাবুর শাসনে এই কাঁঠালহাটি অঞ্চলে মোটামুটি স্বাভাবিক অবস্থাই ছিল। চুরি-ডাকাতি ইত্যাদি মধ্যে মধ্যে হয়, দু-চারজন দোষী ধরা পড়ে ঘুষ দেয়, খালাস হয়। আবার চুরি-ডাকাতি করে। সব কিছু বেশ চক্রাকারে চলছিল। গোলমাল শুরু হল নিতাইমাস্টারকে দিয়ে। তিনি একজন স্থানীয় নেতা।
এই নিতাইমাস্টার গত দশ বছরে ছয়বার দল পালটেছেন। তিন পাত্র পেটে পড়ার পর তার আর মনে থাকে না তিনি এখন কোন দলে আছেন।
ঠেকের চারচালা ঘরের এক প্রান্তে একটা নড়বড়ে টুলে শালখুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে একাই কখনও গান্ধীর সঙ্গে, কখনও ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে, কখনও সুভাষ বসুর সঙ্গে, কখনও ডাঙ্গেনাম্বুদ্রিপাদ বা চারু মজুমদারের সঙ্গে আপন মনে ঝগড়া করেন।
নিতাইমাস্টার হিসেবি মানুষ। ইচ্ছে করেই নড়বড়ে টুলটায় বসেন। একটু এদিক ওদিক হলেই টুলটা দুলতে থাকে, ভ্রম হয় খুব বেশি নেশা হয়েছে। দু-পাত্র পানীয় কম খেলে চলে।
বীর হনুমানের হাতে প্রথম নির্যাতিত হন এই নিতাইবাবু।
সেদিন সকাল থেকে ছিল বৃষ্টি বৃষ্টি, মেঘলা। সন্ধ্যার পর থেকে ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছিল। নিতাইমাস্টার যে শালখুঁটিটায় হেলান দিয়ে নড়বড়ে টুলে বসেন তার পাশেই একটা গরাদহীন জানলা।
অনিবার্য কারণেই এইসব চুল্লু বা চোলাই মদের স্বাধীন ঠেকগুলিতে জানলায় গরাদ থাকে না। সমস্ত প্রতিষেধক ব্যবস্থা নেওয়ার পরেও আবগারি ও পুলিশের কর্তারা রুটিনমাফিক হানা দেন অকুস্থলে। দরজায় দাঁড়িয়ে খুব হম্বিতম্বি করেন। সেই সময়ে মাননীয় খদ্দেররা অনর্গল জানলাপথে নিষ্ক্রান্ত হন। খদ্দেরদের এটুকু না দেখলে তারা পড়ে থাকবে কেন, চারপাশে তো ঠেকের অভাব নেই।
সেই বৃষ্টির সন্ধ্যায় সেই খোলা জানলা দিয়ে শীতল বাতাস এবং গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুড়িখানার ঘরের মধ্যে ঢুকছিল। নিতাইমাস্টার বেশ উপভোগ করছিলেন পরিবেশটা।
আজকের চুল্লু বেশ কড়া আঁঝের। দু গেলাস খেতেই বেশ গোলাপি নেশা হয়েছে।
ঠেকে গেলাস দেয় না। এখানে মাটির ভড়। কিন্তু মাটির ভাঁড়ে মদ খেতে নিতাই মাস্টারের আত্মসম্মানে লাগে। তিনি একটা ছোট কাঁচের গেলাস তাঁর পাঞ্জাবির পকেটে রাখেন।
দ্বিতীয় গেলাসটি শেষ করে সবে তৃতীয় গেলাসটি পূর্ণ করেছেন। বাইরে ঝিঁঝি ডাকছে। কোথায় একটা কামিনী ফুলের গাছ থেকে জলে ভেজা সুঘ্রাণ ভেসে আসছে। ঘরের সামনের দিকে। ঝোলানো স্তিমিতপ্রায় একটা হ্যারিকেন লণ্ঠনের হলুদ আলোয় সব কিছুই কেমন ছায়া-ছায়া। খুব মৌজে ছিলেন নিতাইমাস্টার।
আজ ভাগ্য খারাপ ছিল স্বর্গীয় ইন্দিরা গান্ধীর। সন্ধ্যা থেকে তাকে তুলোধোনা করেছেন নিতাইমাস্টার। শুধু তাকে নয়, তার বাপ-ঠাকুরদা জহরলাল-মতিলালকে নিয়ে পড়লেন তিনি তৃতীয় পাত্রে ছোট একটি চুমুক দিয়ে।
সেই মুহূর্তে একটি অভাবিত ঘটনা ঘটল। আধো অন্ধকার ঘরে, নিতাইমাস্টার কিংবা অন্য কেউ কিছু বুঝবার আগে শীর্ণ অথচ ক্ষিপ্র ও সবল, একটি লোমশ হাতের থাপ্পড় খেলেন নিতাইমাস্টার। ডান গালে সটান এক চড়।
সেই সঙ্গে সেই লোমশ হাতের মালিক এক ঝটকায় কেড়ে নিল নিতাইবাবুর হাতের চুল্লুর গেলাস। দুই দমে সে সেটা শূন্য করে দিল।
ইতিমধ্যে নিতাইবাবুর আর্ত চিৎকারে পুরো ঠেক নেশার আমেজ ছিঁড়ে সচেতন হয়ে উঠেছে।
লণ্ঠনের আলোয় কিছু বোঝা যাচ্ছিল না। কী হচ্ছে? কেন মাস্টার চেঁচাচ্ছেন?
একজন কারও হাতে একটা টর্চলাইট ছিল। সে তাড়াতাড়ি টর্চটা জ্বেলে আলো ফেলতে গেলাস হাতে কে যেন খোলা জানলা দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল।
এই ক্ষণিক দৃশ্য সেইসঙ্গে নিতাইমাস্টারের আর্তনাদ, এ দুটো মিলিয়ে সবাই বুঝতে পারল যে জানলা দিয়ে কেউ ঠেকের মধ্যে ঢুকে নিতাইমাস্টারের হাত থেকে মদের গেলাস কেড়ে নিয়ে চলে গেল।
এরকম অসম্ভব ঘটনা এই ঠেকের ইতিহাসে কখনও হয়নি। ঘোর নকশাল আমলে নকশালেরা একবার এসে মালিক আর খদ্দেরদের লাঠিপেটা করে, মদ ঢেলে ফেলে দিয়ে, কাঠের বেঞ্চি ভেঙে ঠেক তুলে দিয়েছিল।
আরেকবার আবগারির এক গান্ধীবাদী বড়সাহেব স্বয়ং সেপাই নিয়ে এসে ঠেক তছনছ করে মালিক সহ জনাপাঁচেক খদ্দেরকে পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে জেলা সদরে নিয়ে যান।
কিন্তু এরকম অতর্কিতে জানলা দিয়ে ঢুকে সম্মানিত খদ্দেরের হাত থেকে পানীয়ের গেলাস। কেড়ে নিয়ে যাবে–এ তো ভাবা যায় না। কাঁঠালহাটিতে এমন কখনও ঘটেনি।
মাতালেরা সবাই প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠতে না উঠতে সেই জানলার মধ্য দিয়ে বীর হনুমান একটি হুম শব্দ করে ঠেকে প্রবেশ করলেন।
তার হাতে তখনও নিতাইবাবুর কাঁচের গেলাসটি ধরা রয়েছে, চুল্লুর স্বাদ হনুমানজির খুব পছন্দ হয়েছে। তিনি আরেক পাত্র পানীয় নিতে এসেছেন।
কাঁঠালহাটি ঠিক রামরাজ্যের এলাকা নয়। এ অঞ্চলে বানর-হনুমান খুব সুলভ নয়।
তদুপরি বীর হনুমান ঘরে ঢুকেই চোখে টর্চের আলো পড়তে যেরকম দাঁত খিচোলেন আর সঙ্গে সঙ্গে কিঞ্চিৎ আগের চড় খাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে নিতাইমাস্টার যেরকম ওরে বাবারে, গেছি রে বলে চেঁচিয়ে লাফ দিলেন–তাতে হুলুস্থুল পড়ে গেল।
