আজকাল কেবলমাত্র রঞ্জন টুর্নামেন্টের খেলা নয়, কাছে দূরে বারাসাত, আরামবাগ কাকদ্বীপ থেকে ডাক আসতে শুরু করেছে লাল্লুসাহেবের। প্রচণ্ড গোলমালের মধ্যে এমন অসমসাহসী, স্থিতধী রেফারি আর দেখা যায় না। আর তা ছাড়া, সব জায়গায় তো আর রঞ্জন টুর্নামেন্টের মতো প্রটেস্ট-ফি এবং কাউন্টার-ফি-এর লোভে গোলমেলে সিদ্ধান্ত দিয়ে মারামারি বাধিয়ে দেয়া দরকার পড়ে না, ফলে রঞ্জন টুর্নামেন্টের বাইরে যদি কোনও খেলায় লাল্লুসাহেব যান মার খাওয়ার ভয় কম থাকে।
ধীরে ধীরে লোকমুখ থেকে খবরের কাগজের পৃষ্ঠায় লাগ্লসাহেবের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। খেলার কাগজগুলি প্রশংসামুখর হয়ে উঠল লাল্লুসাহেবের সুনিপুণ পরিচালনার একের পর এক বর্ণনায়।
রবীন্দ্রসরোবর স্টেডিয়ামে একটা জুনিয়ার ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ খেলায় গ্যালারি থেকে ছুটে আসা আধলা থানইটের আঘাতে মাথা ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল লাল্লুসাহেবের, তবু অদমিত, অকম্পিত লাল্লুসাহেব খেলা চালিয়ে যেতে লাগলেন।
ময়দানের এক খোলা মাঠের দুই কলেজ টিমের খেলায় চূড়ান্ত বোমাবাজির মধ্যে অবিচল লাল্লুসাহেব কলকাতার ফুটবল মাঠের অরাজক পটভূমিকায় নিজ সাহসে ভাস্বর হয়ে উঠলেন।
স্টেটসম্যানের মতো সাহেবি খবরের কাগজে শ্রীযুক্ত শ্যামসুন্দর ঘোষ মিস্টার লাল্লুকে ভ্যালিয়ান্ট স্মল ম্যান (Valiant small man) নামে অভিহিত করে সাহসের প্রতিমূর্তি বলে বর্ণনা করলেন। আনন্দবাজার পত্রিকায় খ্যাতনামা ক্রীড়াসাংবাদিক মতি নন্দী মহোদয় লাল্লুসাহেবকে কলকাতার ময়দানের ঘনান্ধকার গগনে উজ্জ্বল রূপালি চমক বলে স্বাগত জানালেন। আর আজকাল কাগজে বিখ্যাত অশোক দাশগুপ্ত পাকা আড়াই কলম জীবনীও লেখার কথা ভেবেছিলেন কিন্তু সঙ্গত কারণেই কিছুটা জানার পরে পিছিয়ে গেলেন।
এর মধ্যে একদিন ডাক এল বার্নপুর স্টেডিয়াম থেকে। তারপরে জামসেদপুর, শিলিগুড়ি। শোনা যাচ্ছে আই এফ এ শিল্ড, ফেডারেশন কাপ, এমনকী এশিয়ান কাপ পর্যন্ত লাল্লুসাহেবের খ্যাতি পৌঁছে গেছে। শিগগিরই তার ডাক আসবে এইসব চমকপ্রদ খেলা পরিচালনা করার জন্যে।
লাল্লুসাহেব এখন মনেপ্রাণে প্রস্তুত যেকোনও ধরনের যত দামি, যত উঁচু খেলাই হোক তার রেফারিত্ব করতে। তিনি কলম্বো, এমনকী কুয়ালালামপুর বা কুয়োয়েতে গিয়ে খেলাতেও রাজি। আমন্ত্রণ আসতে এখন যেটুকু বাকি শুধু তারই অপেক্ষা।
রঞ্জনবাবু হাজার হলেও একদা কবি ছিলেন, তারই মানসপুত্র লাল্লুসাহেবের এই উন্নতিতে তিনি মোটেই ঈর্ষান্বিত নন। বরং নিজেকেও সঙ্গে সঙ্গে গৌরবান্বিত বোধ করেন। দু-একটা কাগজে মিস্টার লাল্লু সংক্রান্ত সচিত্র প্রতিবেদনে শ্রীযুক্ত রঞ্জন চক্রবর্তীর ছবিও ছাপা হয়েছে নবযুগের অকুতোভয়, লৌহশরীর মহৎ রেফারির আবিষ্কর্তা হিসেব।
রঞ্জনবাবুর মাথায় চিন্তা ঢুকেছিল যদি লাল্লুসাহেব সত্যি সত্যি কলকাতার বাইরে চলে যান তা হলে রঞ্জন টুর্নামেন্টের কী গতি হবে?
সে সমস্যা লাল্লুসাহেব স্বয়ং সমাধান করে দিয়েছেন। তারই এক পুরনো বন্ধু জগুকে নিয়ে। এসেছেন তিনি। জগু আরও বেঁটে, আরও কালো, আরও রোগা। দাতে দাঁত আটকিয়ে মার খেতে আরও ওস্তাদ। সেও ময়দানের এক বড় ক্লাবের ফুটবল ফ্যান, ফুটবল খেলার অ-আ ক-খ মোটামুটি জানে। তা ছাড়া বুদ্ধি, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ইত্যাদির তার অভাব নেই। লাসাহেবের মতো সেও যথাস্থানে প্ররোচনামূলক ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে যথেষ্ট গোলমাল বাধিয়ে দিতে পারবে, মার খেয়ে টু-শব্দটি করবে না। তাকে দিয়েও লাল্লুসাহেবের মতোই রঞ্জনবাবুর দুবারে দুটো খেলার প্রটেস্ট-ফি, কাউন্টার প্রটেস্ট-ফি বাবদ অনায়াসেই শ দেড়েক টাকা দৈনিক সকালে আসবে।
জগু প্রথমে একটু ইতস্তত করেছিল, তার বহু সাধের পুরনো পেশা ছেড়ে চলে আসতে। কিন্তু এক হাজার টাকা মাইনে এবং তৎসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধার কথা শুনে সে রাজি হয়েছে।
উপসংহার
এই কাহিনির উপসংহার বড় দুঃখজনক। লিখতে কলম সরছে না। তবু লিখতে তো হবেই।
লাল্লুসাহেবের কলম্বো বা কুয়ালালামপুর কোথাও যাওয়া হয়নি। তার প্রাক্তন পকেটমার জীবনে একটি হাতসাফাইয়ের মামলায় তিনি জামিনে খালাস ছিলেন এবং যথারীতি জামিন ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন। কিন্তু অফিসক্লাবের একটি খেলায় তার মতো বুদ্ধিমান লোকের কিঞ্চিৎ মতিভ্রম হয়। তার সেই খেলাটি আদতে পরিচালনা করতে যাওয়াই উচিত হয়নি।
খেলাটি ছিল গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে আবগারি পুলিশের। গোয়েন্দা পুলিশ টিমের স্টপারকে প্রথম থেকেই লাল্লুসাহেবের কেমন চেনা চেনা মনে হচ্ছিল। কিন্তু খেলাচলাকালীন উত্তেজনায় বুদ্ধিভ্রংশ হয়ে লাল্লুসাহেব স্টপারটিকে লাল কার্ড দেখালেন। স্টপার ভদ্রলোকেরও অনেকক্ষণ ধরে রেফারিকে কেমন চেনা চেনা মনে হচ্ছিল। হঠাৎ মোক্ষম মুহূর্তে তিনি চিনে ফেললেন। এই তো সেই হাওড়া ধর্মতলা ট্রামের লাল্লু ওস্তাদ, হুইসিল মুখে হাফপ্যান্টে জার্সিতে চেনাই যাচ্ছিল না। সর্বনাশ! জামিন পালিয়ে রেফারি হয়েছে!স্টপার ভদ্রলোক গোয়েন্দা দফতরের পকেটমার শাখার ছোট দারোগা। তিনি মাঠ থেকে বেরোনোর মুখে লাল্লুসাহেবের জামার কলার ধরে হিড়হিড় করে টেনে বাইরে অপেক্ষারত একটি পুলিশের গাড়িতে তুলে নিলেন।
