অসুবিধা হয়েছে অন্য জায়গায়। লাল্লুসাহেবেরা চার পুরুষের পকেটমার। তাঁর পূর্বপুরুষেরা সুদূর বিহারের আরা জেলার একটা গোহাটে বহুশতাব্দী প্রতিদ্বন্দ্বী গাঁটকাটা ছিলেন। শতাধিক বৎসর পূর্বে, সিপাহি যুদ্ধের কিছুদিন বাদে লাল্লুসাহেবের প্রপিতামহ দেহাত পরিত্যাগ করে এই কলকাতা শহরে জীবিকার অন্বেষণে আসেন। সেই কবে গ্যাসের আলোর রোমাঞ্চকর যুগে ঘোড়ার টানা ট্রামে তিনি হাতসাফাই আরম্ভ করেছিলেন, তারপর পুত্রপৌত্রাদিক্রমে ধীরে ধীরে বহু বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গাঁটকাটা থেকে কাছাকাটা, কাছাকাটা থেকে জোব্বাকাটা, জোব্বাকাটা থেকে পিরানকাটা ইত্যাদি বহু বিচিত্র এবং জটিল স্তর পাড়ি দিয়ে অবশেষে লাল্লুসাহেব এসে পৌঁছেছে সেই পাইয়োনিয়ার পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকারে।
এবং সত্যি সত্যি লাল্লুসাহেবের হাতে এই উত্তরাধিকার মর্যাদা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয়নি।
কিন্তু রেফারি হিসেবে লাসাহেব যত বিখ্যাত এবং সুপরিচিত হতে লাগলেন ততই তার পকেটমার ব্যবসায় ভাটা পড়তে লাগল। হয়তো ট্রামে উঠে পাদানির এককালে ভিড়লগ্ন হয়ে তিনি গভীর অভিনিবেশ সহকারে সম্ভাব্য শিকারকে পর্যবেক্ষণ করছেন, শেষ মুহূর্ত হয়তো সমাগত, তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের মধ্যে আধলা ব্লেডের ভগ্নাংশ নিপুণ ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ধরে নির্বাচিত পকেটটির দিকে অত্যন্ত সতর্কভাবে এগোচ্ছেন–
সেই মুহূর্তে ভিড়ের মধ্য থেকে কে একজন বলল, গুড মর্নিং, লাল্লুসাহেব। আজ খেলা নেই?
সঙ্গে সঙ্গে ধ্যানভঙ্গ হল। এইরকম অবস্থায় আর যাই করা যাক, পকেটমার বা পকেটকাটা নিশ্চয়ই কারও পক্ষে সম্ভব নয়।
কিন্তু সদাসর্বদা হাত নিশপিশ করে লাল্লুসাহেবের। রেফারির জীবিকায় যথেষ্ট উত্তেজনা আছে, পয়সাও ভালই দিচ্ছেন রঞ্জন চক্রবর্তী, কিন্তু দিনে দু-একটা পকেট না কাটতে পারলে মনে হয়। জীবনটাই বরবাদ।
এই কবিতা লেখা কমে গিয়েছে কিন্তু রঞ্জনবাবু যথেষ্ট সংবেদনশীল এবং প্রকৃতই কবিপ্রাণ। তিনি লাল্লুসাহেবের মনোবেদনা যে বুঝতে পারেন না তা নয়। কিন্তু তিনি নিজেই লাল্লুসাহেবকে মানা করেছেন রাস্তাঘাটে, ট্রামেবাসে পকেট কাটতে। লোকে যদি ধরে ফেলে, লোকে যদি চিনে ফেলে এই সেই রঞ্জন টুর্নামেন্টের মৃত্যুঞ্জয় রেফারি মিস্টার লাল্লু, তা হলে সমূহ সর্বনাশ, একেবারে ধনে-প্রাণে বিনাশ হতে হবে।
লাল্লুসাহেব বোকা নন। এ সমস্যা বুঝতে তার মোটেই দেরি হয়নি। পকেটমার জীবনের উত্তেজনা আনন্দ যতই থাকুক, তিনি ধীরে ধীরে নিজের রেফারিজীবন উপভোগ করতে শিখেছেন। লোকেরা গালাগালি করুক, ছাতাপেটা করুক–সব ঠিক আছে, একটু দম খিচে শুধু সহ্য করতে হবে কিন্তু একটি সবুজ মাঠে, সহস্র দর্শকের চোখের সামনে বাইশজন চনচনে খেলোয়াড়কে অঙ্গুলিহেলনে শাসনে রাখা, প্রয়োজনে যে কোনও প্রতিবাদ, প্রতিরোধের সামনে উন্নতশির হয়ে উপস্থিত হওয়া, এর মধ্যে যে গৌরব যে মর্যাদা আছে লাল্লুসাহেবের ঊর্ধ্বতন গাঁটকাটা চোদ্দোপুরুষ তা কোনওদিন অনুভব করেননি। এমনকী খেলা পরিচালনা করতে গিয়ে প্রহৃত হওয়ার মধ্যেও যে রীতিমতো গৌরব ও মর্যাদার ব্যাপার আছে এবং সেটা যে পকেটমার হিসেবে মার খাওয়ার চেয়ে অনেক মহৎ ব্যাপার সেটাও লাল্লুসাহেব ভালই বোঝেন।
তবে লাল্লুসাহেব একটা কায়দা আবিষ্কার করেছেন, রেফারি হয়ে ইচ্ছাকৃত ভুল এবং গোলমেলে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ফলে যখন উত্তেজিত টিমের সমর্থকেরা তাঁর উপর মারমুখী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন তিনি তার সহজাত প্রতিভাবলে আক্রমণকারীদের মধ্যে থেকে শাঁসালো ব্যক্তি নির্দিষ্ট করে ওই ভিড় ঠেলাঠেলির মধ্যে হাতসাফাই করেন। ঘড়ি, কলম, মানিব্যাগ যেদিন যেমন পারেন অনায়াস দক্ষতায় হস্তগত করে মাঠের উপরে ফেলে দেন, তারপর সেই অপহৃত দ্রব্যের উপরে নিজের শরীর চাপা দিয়ে কোঁ-কোঁ করতে করতে উলটিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। তারপর শোয়া অবস্থায় সময়মতো অপহৃত দ্রব্যটি তুলে গেঞ্জির নীচে লুকিয়ে ফেলা একজন প্রাক্তন দক্ষ হাতসাফাইকারের পক্ষে এমন আর কঠিন কী?
অন্যদিকে যাদের জিনিস গেল তারা ঘৃণাক্ষরেও সন্দেহ করতে পারে না যে রেফারি সাহেবের এই কীর্তি। তারা ধরে নেয়, ধস্তাধস্তি হাতাহাতির সময় তাদের জিনিস কোথাও ছিটকিয়ে পড়ে হারিয়ে গেছে। যাকে তারা প্রহার করছিল সেই যে তাদের ঘড়ি, কলম বা মানিব্যাগ গণ্ডগোলের সুযোগে হাতিয়ে নিয়েছে এরকম কিছু চিন্তা করার অবকাশ কোথায়।
রেফারির কাজের সঙ্গে পকেটমার কাজ সংমিশ্রণ করতে পেরে লাল্লুসাহেব মোটামুটি আত্মতৃপ্ত ভাবেই দিন কাটাচ্ছিলেন। রাত্রিও ভালই কাটছিল রঞ্জনবাবুর বাইরের ঘরে।
অবসর এবং ইচ্ছামতো একটু-আধটু সাট্টা খেলা, সন্ধ্যার দিকে খালাসিটোলা বা বারদোয়ারিতে গিয়ে কিঞ্চিৎ বাংলা মদ্যপান অথবা আরও কোনও কুস্থান গমন। আবার একেকদিন রাতে রঞ্জনবাবুর সঙ্গে বসে থ্রি-এক্স রাম পান, সঙ্গে হাজরার মোড় থেকে কিনে আনা মাংসের রোল। কোনও কোনও দিন আরও কেউ থাকে, ফুটবল খেলার ভূত-ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা, রঞ্জন টুর্নামেন্টের সমস্যা ও সাফল্য বিচার গবেষণা।
দিন ভালই যাচ্ছিল লাল্লুসাহেবের। রঞ্জনবাবুর হৃদয়ে তবু কিছু বেদনা ছিল তার অপূর্ণ কবিজীবন নিয়ে, কিন্তু লাল্লুসাহেব ক্রমশ বিগত পকেটকাটা জীবন সম্পর্কে উদাসীন হয়ে উঠলেন। জুতো, মোজা, হাফপ্যান্ট, রেফারির পোশাক, দামি হুইসিলে ফুঁ দিতে দিতে যখন টগবগ করে লাল্লুসাহেব মাঠে গিয়ে নামেন তখন তাঁর মনেই পড়ে না অনতিদূর অতীত জীবনের কথা।
