তদুপরি কাহিনিকারের পক্ষেও বিপদটা হয়তো অনেক কম হত। কিন্তু গল্পকে এখানে শেষ করা সম্ভব নয়। কারণ এর পরে যা ঘটেছে সেটা না লিখলে অন্যায় হবে এবং লাল্লুর প্রতি নিতান্ত অবিচার করা হবে।
অকবির প্রতিভা
রঞ্জন টুর্নামেন্টের প্রতিযোগিতা ইতিমধ্যে তিন দফা হয়ে গেছে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সারা বছর ধরে জমজমাট খেলার আসর। দক্ষিণ কলকাতার ফুটবল প্রেমিক কিশোররা তো বটেই, এমনকী তাদের অভিভাবকদের কাছেও রঞ্জন টুর্নামেন্টের খ্যাতি যথেষ্ট প্রচারিত হয়েছে।
কবি রঞ্জন চক্রবর্তী আজকাল আর কবিতা লেখার বিশেষ সময় পান না, প্রয়োজনও বোধ করেন। না। একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট পরিচালনা করা যতটা অর্থকরী এবং উত্তেজনাপ্রদ, কবিতা লেখা তার ধারেকাছে আসে না।
তা ছাড়া ফুটবল মারফত তার যথেষ্ট সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিও হয়েছে। উত্তর টালিগঞ্জ বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় রঞ্জন চক্রবর্তী সভাপতি হয়ে রৌপ্যপদক বিজয়ীদের গলায় পরিয়ে দিলেন। আবার আন্তঃ বেহালা কাবাডি প্রতিযোগিতায় তিনি প্রধান অতিথি হয়ে দেড় ঘণ্টা কাবাডির ঐতিহ্য নিয়ে সুললিত বক্তৃতা করলেন।
মোট কথা, রঞ্জনবাবু এখন মহানগরীর দক্ষিণাঞ্চলের ক্রীড়াসংসারে রীতিমতো মান্যগণ্য ব্যক্তি। শোনা যাচ্ছে, কী সব সূত্রে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল, ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ইত্যাদি সব কেউকেটা প্রতিষ্ঠানেও তিনি ঠাই করে নিতে চলেছেন।
আজকাল আর রঞ্জনবাবু যাদবপুরের সেই দেড়তলার ঘরে থাকেন না। কালীঘাটের একটা পুরনো বাড়ির দুটো একতলার ঘরে এখন তাঁর আবাস, সেই সঙ্গে সেটা রঞ্জন টুর্নামেন্টের হেড কোয়ার্টার্স। প্রত্যেকদিন সকালবেলা ক্রীড়ারসিক এবং নবীন খেলোয়াড়ের ভিড়ে গমগম করে। রঞ্জনবাবুর বাইরের ঘর।
রঞ্জনবাবুর জীবনযাত্রার ধারাও রীতিমতো পালটিয়ে গিয়েছে। তিনি একটু পুরনো একটা মোটরবাইক ক্রয় করেছেন। সেটা অবশ্য যাতায়াতের পথে একটু অস্বাভাবিক শব্দ করে, শব্দ শুনে। মনে হয় যেন কোনও আগ্নেয়গিরি অগ্নি উদগিরণের আগে গর্জন করছে।
কালীঘাট পাড়ার কুকুরদের কোনওকালেই মোটরবাইক জিনিসটা পছন্দ নয়। চিরকালই তারা রাস্তায় চলমান মোটরবাইকের পিছনে তাড়া করে আনন্দ পায়। রঞ্জনবাবুর গাড়িতে বীভৎস শব্দের ফলে তাঁর প্রতি কুকুরদের ক্রোধ আরও বেশি। বহু দূর থেকে রঞ্জনবাবুর গাড়ির আওয়াজ পেয়ে কুকুরেরা সম্মিলতভাবে তেড়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। প্রতিদিন রাতে রঞ্জনবাবু যতক্ষণ পর্যন্ত বাড়ি না ফেরেন, পাড়ার কুকুরেরা বিনিদ্র প্রতীক্ষা করে তাকে গর্জনমুখর সংবর্ধনা জানানোর জন্যে।
রঞ্জনবাবুর সঙ্গে বাইকের পিছনের সিটে প্রায় প্রতিদিন এক ব্যক্তি যাতায়াত করে। ব্যক্তিটি বেঁটে, কালো, তার চুল ছোট করে ছাটা, গায়ে চকরাবকরা রঙিন জামা, লাল প্যান্ট।
কুকুরেরা সাধারণত চেষ্টা করে পশ্চাতের এই ব্যক্তিটিকে কামড়ানোর। কিন্তু সে সুকৌশলে পা দুটো এমনভাবে গুটিয়ে রাখে যে কুকুরেরা চলন্ত অবস্থায় তাকে কিছু করতে পারে না। তবে মজার কথা এই যে মোটরবাইক থেমে গেলেই কুকুরেরা একদম চুপ, যে যার মতো মুখ ঘুরিয়ে যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গি করে কেটে পড়ে।
সে যা হোক, রঞ্জন চক্রবর্তীর বাইকের পিছনের ওই ব্যক্তিটি আর কেউ নয়, স্বনামধন্য লাল্লু।
স্বনামধন্য কথাটা যে এখানে ব্যবহার করলাম সেটা রসিকতা করে নয়। লাল্লুর আজকাল যথেষ্ট নামডাক। এখন আর সে লাল্লু নয়, ক্রীড়ামোদিরা তাকে মিস্টার লাল্লু অথবা লাল্লুসাহেব বলে ডাকে। ফুটবলের আলোচনায় অত্যন্ত সম্ভ্রমের সঙ্গে তার নাম উচ্চারিত হয়।
ঘটনার যা গতিক তাতে এখন থেকে আমরাও তাকে লাল্লুসাহেব বলে বলব এবং আপনি বলে মর্যাদা দেব।
বিবেকানন্দ পার্কের মাঠে লাল্লুসাহেবের জীবনপণ, অসমসাহসী রেফারিয়ানা অতি অল্পদিনের মধ্যে জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। হাজার মার খেয়েও যে রেফারি দমিত হয় না, আত্মবিশ্বাস হারায় না, তাকে তো সবাই শ্রদ্ধা করবেই।
লাল্লুসাহেবের খেলা পরিচালনা যারাই দেখেছে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেছে। ভুল দু-চারটে সব রেফারিই করে থাকেন, রেফারি তো আর ভগবান নন। অফসাইড, ফাউল, হ্যান্ডবল–এগুলো অনেক সময়েই খুব কাছে থেকেও সঠিক বিচার করা যায় না–সেটা বড় কথা নয়।
বড় কথা হল লাল্লুসাহেবের মার খাওয়ার ক্ষমতা। টু শব্দটি উচ্চারণ না করে ছাতা পেটা হওয়া, লাথি খাওয়া, কখনও কখনও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া–তারপর কয়েক মুহূর্তের মধ্যে লাফ দিয়ে উঠে আবার হুইসিল বাজিয়ে খেলা আরম্ভ করা–লাল্লুসাহেবের এই সব অসাধারণ যোগ্যতা ধীরে ধীরে চারিদিকে লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ল।
অবশ্য লাল্লুসাহেবের তরফ থেকে বলা যায় এসব মার তার কাছে তুচ্ছ, লোকে যাকে বলে নস্যি ঠিক তাই। তার প্রাক্তন পকেটমার জীবনে যেসব প্রহার তাঁকে খেতে হয়েছে, যেসব গণধোলাইয়ের তিনি বারংবার সম্মুখীন হয়েছেন, তার কাছে ফুটবল খেলার মাঠে রেফারি হয়ে মার খাওয়া ছেলেখেলা।
আজকাল সকালবেলা সাতটায় একবার আর সাড়ে আটটায় একবার এই দু দফা রঞ্জন টুর্নামেন্টের খেলা হয়। উভয় খেলারই পরিচালনার দায়িত্ব লাল্লুসাহেবের। অবশ্য একটার জায়গায় দৈনিক দুটো খেলা খেলানোর জন্যে রঞ্জনবাবু লাল্লুসাহেবের বেতন বাড়িয়ে এক হাজার টাকা পুরোপুরি করে দিয়েছেন। তা ছাড়া রাত্তিরে রঞ্জন টুর্নামেন্টের হেডকোয়ার্টারে অর্থাৎ রঞ্জনবাবুর বর্তমান বাড়ির বাইরের ঘরে একটা সোফা কাম বেডে তিনি শুতেও পান।
